রাজধানীর মেরুল বাড্ডা। মূল সড়ক ঘেঁষে ১১ একর জমি। যার বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নিজস্ব সম্পত্তি এটি। কিন্তু গত ২১ বছর এ মহামূল্যবান জমিটি জবরদখল করে রেখেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ দীর্ঘ সময়েও জমি উদ্ধারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। জমিটি দখলে রাখার জন্য করা হয়েছে পাঁচটি রিট মামলা। নির্লিপ্ত রাজউকের জমি উদ্ধারে তৎপরতা নেই, মামলাগুলো ফাইলবন্দি। অন্যদিকে সংস্থার ভেতরের কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর তৎপরতায় রাজউক যেন ঘুমে। ২১ বছরেও এ রিটগুলো নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
রাজউকের নির্লিপ্ততায় ওই জমিতে গড়ে উঠেছে কাঁচাবাজার, মাছ, মুরগি ও বাঁশের বিশাল আড়ত। ক্ষমতার পালাবদলে কেবল দখলদারদের মুখ বদলায়, কিন্তু এ অবৈধ বাণিজ্যের চাকা থামে না।
আইনি জটিলতা ও রাজউকের নিষ্ক্রিয়তাকে পুঁজি করে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’-র নামে চলছে আরেক প্রতারণা। স্থায়ী দোকানের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রায় ছয় হাজার মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি স্থায়ী ও অস্থায়ী ভিত্তিতে স্পটভাড়া বাবদ সংঘবদ্ধ চক্রটি প্রতিমাসে আয় করছে প্রায় ১৫ কোটি টাকা।
তথ্য বলছে, ১৯৬২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট (ডিআইটি) আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নে বাড্ডা মৌজায় সি এস দাগে ১১ একর জমি অধিগ্রহণ করে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের এল এ কেস নম্বর ১৩৮/৬১-৬২ আদেশের মাধ্যমে ১৯৬২ সালের ২৫ এপ্রিল জমি ডিআইটির কাছে দখল বুঝিয়ে দেয়। তৎকালীন টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩ এর ৯৩-এ ধারা অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়। আইনানুগভাবে সরকারি ক্ষমতা বলে জমি দখল গ্রহণ করে ডিআইটি। ডিআইটির অনুকূলে জমির ‘দখল হস্তান্তর সনদ’ দেওয়া হয়। ১৯৮৭ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে ডিআইটির নাম পরিবর্তন করে রাজউক রাখা হয়। এরপরও ২০০৫ সালে জমি দখলে রাখতে হাইকোর্টে রিট মামলা করেন এক ব্যক্তি। তার ধারাবাহিকতায় আরও কয়েকটি রিট মামলা করা হয়।
দেলোয়ার হোসেন ব্যাপারী ২০০৫ সালে রিট মামলা করেন, মামলা নম্বর ৫৬১০। ২০০৫ সালে মেরুল বাড্ডায় ১১ একর জমি দখলমুক্ত করতে রাজউকের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলে সংক্ষুব্ধরা উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে একই বছর হাইকোর্টে আরেকটি রিট মামলা করেন। মেরুল কাঁচাবাজার সমিতিও ২০০৭ সালে রিট মামলা করেছে, মামলা নম্বর ২১৪১। মেরুল বাড্ডার এই ১১ একর জমি দখলে রাখতে ধাপে ধাপে পাঁচটি রিট মামলা করা হয়েছে। প্রতিটি রিট মামলা রাজউকের বিরুদ্ধে করা হয়েছে। অন্যদিকে নথি-কাগজপত্র নিয়ে শক্তভাবে আইনিভাবে জমিটি উদ্ধারে কোনো সদিচ্ছা দেখা যায়নি রাজউকের।
রাজউকের সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকার বুকে যেখানে এক ইঞ্চি জমি খালি পেলেই মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় বহুতল ভবন, সেখানে যুগের পর যুগ ধরে মেরুল বাড্ডার মূল সড়কের পাশে ১১ একর জমি বেদখল হয়ে আছে, এ ব্যাপারে তাদের যেন কোনো আগ্রহ নেই। এত বছরেও রিট মামলার কোনো সুরাহা হয়নি। কারণ সেখানে মাছ, মুরাগ ও বাঁশের আড়ত গড়ে উঠেছে। এসব আড়ত থেকে মাসে যে টাকা ওঠে, তার ভাগ পাচ্ছেন রাজউকের কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী। ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’ হওয়ায় নিজের আয়ত্তে আনতে পারেনি সংস্থাটি।
সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর রামপুরা ব্রিজ থেকে কয়েক গজ দূরে মূল সড়ক ঘেঁষে বাঁশের আড়ত, মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে মাছ, মুরগির আড়ত ও বস্তি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভোরে মাছ, মুরগি ও বাঁশের ট্রাক এসে ভেড়ে আড়তে। সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খুচরা বিক্রেতাদের মাছ ও মুরগি সংগ্রহের হাঁকডাক বেড়ে যায়। সকালে পাইকারি বাজারটি সরগরম থাকলেও বাকি সময়ে থাকে নীরব। আবার অবিক্রীত পাইকারি মুরগি খুচরা বিক্রির জন্য টিন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী ঘর।
ছোট্টো একটা টিনের ঘরে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি ও মেরুল সোনার বাংলা মৎস্য আড়তের’ অফিস। আড়তের পাশে গড়ে উঠেছে বিশাল বস্তি। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বস্তিতে নেমে আসে মাদকের আড্ডা। অধিকাংশ সময়ে উঠতি বয়সের ছেলেদের আড্ডা দেখা গেছে। ১১ একর জমি ঘেঁষে ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও মেরুল বায়তুল জামে মসজিদ। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতার পালাবদলে জমি দখলের নেতৃত্ব পাল্টেছে। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতাকর্মী আড়ত থেকে টাকা ওঠায়।
সরেজমিন আরও দেখা গেছে, রাজউক জমির মালিকানা দাবি করলেও জমিটি ব্যক্তিমালিকানার দাবি করে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। ওই সাইনবোর্ডে জমির আমমোক্তার দেখানো হয়েছে- মোহাম্মদ শরীফ ভূইয়া ও বাবু চন্দ্র দাসকে। সাইনবোর্ডে জমির দাগ হিসেবে সিএস ও এসএ-১২৪৩, আরএস-৩০৩৯, সিটি-১৫০০৯ দেওয়া রয়েছে। যেখানে মোট জমির পরিমাণ ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে।
মেরুল বাড্ডায় ১১ একর জমি উদ্ধার ও রিট মামলা-সংক্রান্ত রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডে হতাশা ব্যক্ত করে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘রাজউকের বিরুদ্ধে এমন অসংখ্য রিট মামলা রয়েছে। মামলা চালানোর জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা আছে। রাজউকের বহু কর্মকর্তা আছেন, যারা কাজ করতে চান না। কারণ, তারা কাজ না করলেই তাদের লাভ। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাচ্ছি না।’
জানা গেছে, মেরুল বাড্ডার ১১ একর জমির আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেক ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রতারণা। যার শিকার হয়েছেন প্রায় ছয় হাজার সাধারণ মানুষ, আর তাদের জমানো প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হয়েছে হাওয়া। এই জমির ওপরে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির নামে ১ একর ৮৯ শতাংশ জমি বরাদ্দের সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। ১৯৮৮ সালে সমিতির যাত্রা শুরু হয়। ধাপে ধাপে ৬ হাজারের কাছাকাছি সমিতির সদস্য হয়। দীর্ঘ ৩৮ বছরে সমিতির প্রত্যেক সদস্য কমবেশি ৫ লাখ টাকা করে দিলে ৩০০ কোটি টাকা হয়। জমি বরাদ্দ পেতে সাধারণ ব্যবসায়ীদের ফান্ডের টাকায় রাজউকের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করার নামে ৫ কোটি টাকা ঘুষের লেনদেন ও নয়ছয় করা হয়েছে। সাধারণ ব্যবসায়ীদের টাকায় একদিকে ঘুষ বাণিজ্য চলেছে, অন্যদিকে নেতারা আখের গুছিয়েছেন।
জমির ওপরে গড়ে ওঠা এক মুদি দোকানদার জানান, মেরুল বাড্ডার এ জমির স্বত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সঙ্গে স্থানীয়দের বিরোধ ও টানাপোড়েন চলছে। জমিটি কাদের—এ আইনি অস্পষ্টতা ও জটিলতাকে পুঁজি করেই মাঠে নামে এক প্রভাবশালী চক্র। তারা গঠন করে ‘মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতি’। জমির অনিশ্চিত ভবিষ্যতকে পাশ কাটিয়ে সাধারণ মানুষের স্বপ্নের ওপর বাজি ধরে টাঙানো হয় চকচকে সাইনবোর্ড। ঘোষণা দেওয়া হয়, এখানে নির্মিত হবে আধুনিক কাঁচাবাজার ও মার্কেট, আর সেখানে স্বল্পমূল্যে দোকান পাবেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। বাস্তবে, যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেলেও সমিতির সদস্যদের কপালে দোকান মেলেনি। কিন্তু সমিতির সদস্যদের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন ওই সংঘবদ্ধচক্র।
২০১০ সালের ৮ মার্চে সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এ কে এম মিজানুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান মনির এবং অর্থ সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদের স্বাক্ষরিত এক নোটিশে দেখা গেছে, প্রত্যেক সদস্যকে সমিতির মামলা খরচ ও অন্যান্য বাবদ এক হাজার টাকা এককালীন পরিশোধ করতে হবে। এ ছাড়া যেসব সদস্য মারা গেছেন এবং অন্যত্রে চলে গেছেন, তাদের সদস্যপদ ওয়ারিশদের নামে কিংবা অন্যের নামে হস্তান্তর করার সুযোগ রয়েছে। এজন্য সমিতিকে দুই হাজার টাকা করে দিতে হবে। এভাবে বিভিন্ন সময়ে নোটিশ দিয়ে সদস্যদের কাছ থেকে বছরের পর বছর টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাজউকের কাছ থেকে মেরুল কাঁচাবাজার দোকান সমিতির নামে জমি বরাদ্দের দাবি করা হলেও রাজউক বলছে, সমিতির নামে কোনো জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
আশ্বাসের ফাঁদে ৩০০ কোটি টাকার তহবিল: স্থায়ী একটি দোকান পাওয়ার আশায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের হাজার হাজার মানুষ তাদের জীবনের শেষ সম্বল তুলে দেন সমিতির হাতে। কেউ জমানো সঞ্চয়, কেউ বা ভিটেমাটি বিক্রি করে আবার কেউ চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সমিতির ফান্ডে টাকা জমা দিতে থাকেন। এভাবে রসিদের মাধ্যমে ও নানা অজুহাতে সদস্যদের কাছ থেকে দফায় দফায় তুলে নেওয়া হয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। সাধারণ মানুষ ভেবেছিলেন, আজ না হোক কাল তারা স্বাবলম্বী হওয়ার একটি আশ্রয় পাবেন। কিন্তু সেই আশা ধীরে ধীরে অমাবস্যার অন্ধকারে তলিয়ে গেছে।
রাজউকের অভিযান ও কৌশলী রূপবদল: ২০০৫ সালের দিকে রাজউক ওই বিতর্কিত জমিতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ায় ও উচ্ছেদ অভিযানের মুখে থমকে দাঁড়ায় সমিতির কার্যক্রম। আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সাধারণ সদস্যরা, বন্ধ হয়ে যায় অনেকের চাঁদা দেওয়া। কিন্তু চতুর সমিতি চক্র দমে যায়নি। কাঁচাবাজারের জমি হাতছাড়া হলেও প্রতারণার ফাঁদ গুটিয়ে নেয়নি তারা। মেরুল বাড্ডা থেকে কার্যালয় সরিয়ে রাতারাতি নিয়ে যাওয়া হয় মতিঝিলে। নতুন রূপে, নতুন আশ্বাস নিয়ে মতিঝিলের অস্থায়ী কার্যালয় থেকে শুরু হয় নতুন খেলা। রাজউকের আইনি জটিলতা কেটে যাবে—এমন ভুয়া আশ্বাস দিয়ে রসিদের মাধ্যমে ফের চাঁদা ও কিস্তির টাকা আদায় শুরু হয়। আস্থার সংকট কাটাতে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন আইনি ও প্রশাসনিক ফাঁকফোকর। সাধারণ সদস্যরাও রসিদের মায়ায় পড়ে একের পর এক কিস্তি শোধ করে যান।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা দীর্ঘশ্বাস: যুগের পর যুগ পার হয়েছে। না গড়ে উঠেছে কোনো কাঁচাবাজার, না কেউ পেয়েছেন তার স্বপ্নের দোকান। আর যে ৩০০ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছিল, তার কোনো হদিস মিলছে না এখন। সমিতি পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষ ব্যক্তিরা টাকার পাহাড় গড়ে গা ঢাকা দিয়েছেন। অনেকে এড়িয়ে চলছেন দায়দায়িত্ব। সবচেয়ে করুণ দৃশ্য ফুটে উঠে সদস্যদের জীবনের দিকে তাকালে। দীর্ঘ বছরের এ মিথ্যা আশার পেছনে ছুটতে ছুটতে অনেক মূল সদস্য এরই নমধ্যে বার্ধক্যে কিংবা বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। কিন্তু প্রতারকদের প্রতারণা তাদের পরিবারের অন্য সদস্যদেরও ছাড়েনি। বাবার অসমাপ্ত স্বপ্ন আর জমানো টাকা উদ্ধারের আশায় বর্তমানে তাদের উত্তরসূরিরাও সমিতির পেছনে ঘুরে চলেছেন, শোধ করে গেছেন বকেয়া টাকা।
আইনি সুরাহা ও তদন্তের দাবি: ভুক্তভোগীদের আক্ষেপ—রাজউকের চোখের সামনে কীভাবে একটি ভুয়া সমিতি যুগের পর যুগ এভাবে প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষের ৩০০ কোটি টাকা লুট করে নিয়ে গেল। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে রাজপথে বা আইনি দ্বারে কড়া নাড়ছে। তাদের দাবি, অবিলম্বে এই ভুয়া ‘দোকানদার সমিতি’র নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী চক্রকে আইনের আওতায় এনে কড়া শাস্তি দিতে হবে, এবং হারিয়ে যাওয়া ৩০০ কোটি টাকার হিসাব উদ্ধার করে ক্ষতিগ্রস্ত ও তাদের উত্তরসূরিদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য মো. হুমায়ুন কবির কালবেলাকে বলেন, মেরুল বাড্ডার মতো এলাকায় নিজের একটা দোকান হবে, সেই আশায় সমিতির সদস্য হয়েছি। মাসে মাসে টাকা পরিশোধ করেছি। দীর্ঘ ১৬ বছরেও দোকান মেলেনি। উল্টো সমিতিতে সদস্যদের টাকা লুট হয়েছে। সমিতির পাঁচ হাজার সদস্যের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা উধাও। হুমায়ুন কবিরের মতোই সমিতির আরেক সদস্য মো. রবিউল ইসলাম (সুজন) বলেন, একটি দুষ্টচক্রের খপ্পরে পড়ে মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির সদস্য হয়েছি। দীর্ঘ ২০ বছরে সমিতিতে প্রায় ৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছি। দোকান পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, এজন্য সমিতিতে কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। তবে, আমার জমানো টাকার হদিস নেই সমিতিতে।
মেরুল কাঁচাবাজার দোকানদার সমিতির দীর্ঘ ১৭ বছর সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন শাহীন। তিনি এখন সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বে আছেন। তিনি বলেন, ১৯৮৮ সালে সমিতি যাত্রা শুরু হয়েছিল। একটানা ৩০ বছর পর্যন্ত সমিতির সদস্যরা চাঁদা দিয়েছেন। কিন্তু, তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে গত ১০ বছর সমিতির সমস্ত কার্যক্রম সম্পূর্ণ থমকে আছে। এর পেছনে মূল কারণ—আমাদের সমিতিতে ঘটে যাওয়া অনিয়ম এবং কোটি কোটি টাকা লুটপাট।
শাহীন আরও বলেন, একসময় আমাদের এ সমিতিতে ছয় হাজারের বেশি সদস্য ছিলেন। কষ্টার্জিত আয় থেকে সমিতিতে নিয়মিত চাঁদা দিয়েছেন। সমিতির সাবেক সভাপতি রফিকুল এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনির—দুজনই আজ প্রয়াত, কিন্তু তারা সাধারণ ব্যবসায়ীদের ফান্ডের টাকা চরমভাবে তছরুপ ও আত্মসাৎ করে গেছেন। শত শত সাধারণ সদস্যের ঘাম ঝরানো টাকায় নিজেদের পকেট ভারী করা হয়েছে। যার কারণে আজ হাজার হাজার সদস্য তাদের অধিকার হারিয়েছেন, আর সমিতির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফাঁকা হয়ে গেছে। সদস্যদের কোটি কোটি টাকা এভাবে গায়েব করে দেওয়া কোনো সাধারণ অনিয়ম নয়, এটি সরাসরি প্রতারণা।
তিনি বলেন, সমিতির সাইনবোর্ড দেওয়া জমি রাজউকের। রাজউকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার পরও ‘শংকর’ নামের একপক্ষ জমির দাবি তুলে মামলা ঝুলিয়ে রেখেছে। রাজউক বলছে, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সমিতিকে জমি বুঝিয়ে দেবে না। আমরা রাজউকের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই করেছি-২০০৫ সালে রাজউকের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট রোকন উদ-দৌলার উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে ২৫ কোটি টাকার মামলা করা হয়েছে।