Image description

বিশ্ব শিক্ষক দিবস আজ। এ দিবসে কেমন আছেন শিক্ষকরা। বাড়ি থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে চাকরি করেন নাজির হোসাইন। এনটিআরসিএ কর্তৃক প্রথম নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক তিনি। এমপিওভুক্ত শিক্ষক নাজিরের বেতন সামান্যই। এই শিক্ষকরা তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছেন বদলি কার্যক্রমের। বছরের পর বছর আন্দোলন, মানববন্ধনসহ নানানভাবে দাবি জানিয়ে আসছেন। বিএনপি সরকার আসার পর আশার আলো দেখেন তারা। কিন্তু সফটওয়্যারের মাধ্যমে তারা বদলির জন্য আবেদন করলেও অদৃশ্য কারণে আটকে আছে বদলির ফল। আরেক বদলিপ্রত্যাশী সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা দ্রুত ফল চাই। যারা ভুল করেছেন তাদের আপাতত বাদ দিয়ে হলেও ফল দেয়া উচিত। ১০ জনও যদি হয় তাই হোক। আমরা চাই বদলিপ্রক্রিয়াটা যাতে শুরু হয়।

জয়পুরা এস আর এম এস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরের প্রভাষক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, শিক্ষক দিবস আসে যায়, শিক্ষকদের মর্যাদা আদৌ কী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে আজ অবধি যে মানুষগুলো জ্ঞান বিতরণের মাধ্যমে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে তারা শিক্ষক। আমাদের দেশের শিক্ষকদের প্রতি সম্মানের বড় অভাব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায়ই শিক্ষকদের হেনস্তার খবর শুনি আমরা। যা নিতান্তই বেদনাদায়ক। এর বাইরেও শিক্ষদের সমস্যার শেষ নেই। মাসের পর মাস বেতন না পাওয়া কিংবা অনিয়মিত বেতন, পদোন্নতিজনিত সমস্যাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত শিক্ষক সমাজ। এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, যাদের দেখানে পথে সভ্যতা, যাদের আলোয় অজ্ঞতার অন্ধকার দূরীভূত হয়েছে; তাদের মর্যাদা আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সামাজিক, অর্থনৈতিকভাবে তার মানবেতর জীবনযাপন করছে। শিক্ষক দিবসে প্রত্যাশা, শিক্ষকদের যথাযথ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক।

মানুষ গড়ার কারিগর আমাদের শিক্ষকরা। তারা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন দেশ গঠনের নিমিত্তে। ২০২৪ সালের সরকারের হিসাব অনুযায়ী দেশে শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ। এর বাইরে বেসরকারি সেক্টরে আছেন আরও কয়েক লাখ শিক্ষক। আলোচনা-সমালোচনা, ভালো-মন্দ মিলিয়ে চলছে তাদের জীবন। প্রায়ই নাম লেখাতে হয় আন্দোলনে। রাজনৈতিক প্রভাবেও মাথা নত করতে হয়েছে তাদের। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর হাজারো শিক্ষককে প্রতিষ্ঠান ছাড়া হতে হয়েছে। তারা এখনো ফিরতে পারেননি প্রতিষ্ঠানে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যায়ন শেষে রংপুরের প্রত্যন্ত এলাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা করছেন আবিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমরা কার্যকর হতে পারছি না। আমার প্রতিষ্ঠানে অর্ধেক শিক্ষকই নেই। স্কুলে ৬টি পদ, কিন্তু শিক্ষক ৩ জন। এমনিতেই দুই গুণ কাজ করতে হচ্ছে। তার উপর কোনো শিক্ষক ছুটিতে থাকলে চাইলেও সব ক্লাস নেয়া সম্ভব হয় না। আবার পুরনো যেসব শিক্ষক আছেন তাদের রয়েছে ভয়াবহ জ্ঞানের স্বল্পতা। তাদের কম্পিউটার বা অনলাইনকেন্দ্রিক কোনো জ্ঞানই নেই। যার কারণে তরুণ শিক্ষকদের অনিচ্ছাকৃতভাবেই এসব বিষয়ও দেখতে হয়। তিনি বলেন, এখন প্রয়োজন শিক্ষকের সংকট দূর করা। আর শিক্ষকদের প্রোপার প্রশিক্ষণ দেয়া। আমি নিজেও প্রশিক্ষণ নিয়েছি। এসব আসলে কোনো প্রশিক্ষণই না। আমি পূর্বে থেকে ধারণা না থাকলে এই প্রশিক্ষণ দিয়ে কিছুই করতে পারতাম না। আর প্রধান শিক্ষক না থাকার কারণে কেউ ইচ্ছা করে দায়িত্ব নিতে চান না। যার কারণে স্কুলের অনেক উন্নয়নমূলক কাজ সম্ভব হয় না।

আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সরকার। ইউনেস্কোর উদ্যোগে ১৯৯৪ সাল থেকে প্রতি বছর এ দিনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়ে আসছে। এ বছরে শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য ‘স্ট্যান্ডিং উইথ টিচার্স: সিক্সটি ইয়ার্স অব প্রোটেকটিং দ্য প্রফেশন, অ্যাডভান্সিং ইটস স্ট্যাটাস, শেপিং আওয়ার ফিউচার্স’। এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও এই দিবস পালিত হবে। দিবসটি পালনের অংশ হিসেবে সোমবার দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ অনুষ্ঠিত হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত কেন্দ্রীয় উৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষকগণের হাতে নগদ ২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননা সনদ তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এ বছর প্রথমবারের মতো প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট ১০১ জন নির্বাচিত শিক্ষককে জাতীয় পর্যায়ে ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ প্রদান করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গুণী শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি ও পেশাগত স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে এ বছর জাতীয় সম্মাননার পরিধি ১২ জন থেকে বাড়িয়ে ১০১ জনে উন্নীত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক স্তরের (স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি) পর্যায়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তাদের বাছাই করা হয়।