মূলত বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই চলে সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নূর ইসলামের মদের ব্যবসা। সাধারণ একটি রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স নিয়ে তিনি চালান দেশের সবচেয়ে বড় মদের বার আইরিশ পাব। আর বিষয়টি উঠে আসে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক অভিযানে। আর এ অভিযান করেই বিপাকে পড়েন শুল্ক কর্মকর্তারা। ফৌজদারি মামলা হুট করে চলে যায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কাছে। পরবর্তী সময়ে এই মামলা আসে পুলিশের সিআইডিতে। তবু চাপ প্রয়োগ করে নিজেদের পক্ষে প্রতিবেদন নেন আইরিশ পাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ নূর ইসলাম। শুধু তাই নয়, কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানির লাইসেন্সের আড়ালে বারের মদ থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতি ও ফার্নিচার আমদানি করতেন নূর ইসলাম। যার কারণে পণ্যগুলো জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা। যদিও পরবর্তী সময় তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হাজার হাজার লিটার বিদেশি মদ বিক্রি করলেও বৈধ কোনো নথিপত্র নেই আইরিশ পাবের। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্ত্রী থেকে শুরু করে শ্বশুর-শাশুড়ির গোটা পরিবারের সবাই মদের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। যদিও তাদের দাবি, তারা দেশের আইন মেনে বৈধভাবে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে কীভাবে সরকারের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে অবৈধভাবে মদের ব্যবসা চালিয়ে আসছিলেন তার কিছুটা প্রমাণ মেলে ২০২১ সালে রাজধানীর নিউ জুরাইনে আইরিশ পাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট লিমিটেডে অভিযানের পর। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে আইরিশ পাবে অভিযান চালায় শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের একটি টিম।
এতে স্কটল্যান্ড ও লন্ডন থেকে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ ইম্পেরিয়াল হুইস্কি থেকে শুরু করে দামি ব্র্যান্ডের ভদকাসহ বিদেশি মদ পায়। এই মদ আমদানির কোনো বৈধ নথিপত্রও শুল্ক কর্মকর্তাদের দেখাতে পারেনি। ফলে এসব বিদেশি মদ জব্দ করেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তৎকালীন কর্মকর্তারা। পরবর্তী সময়ে এসব বিদেশি মদ পর্যটন করপোরেশন থেকে কেনা হয়েছে মর্মে জানান আইরিশ পাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। যদিও এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি তারা। অবৈধভাবে আমদানি করা এসব মদের জন্য রাজধানীর কদমতলী থানায় ফৌজদারি মামলাও করেন শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তারা। আরেকটি মজার বিষয় ছিল—পর্যটন করপোরেশন থেকে বিদেশি মদ কেনার ২০১৬ সালের নথিপত্র নিজেদের কাছে রেখে ২০১৯ সালে উৎপাদিত মদও বিক্রি করেছে আইরিশ পাব কর্তৃপক্ষ। এতে কর্মকর্তারা অবৈধ চোরাচালানের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সফিউর রহমান কালবেলাকে বলেন, আইরিশ পাবে একটি অভিযান হয়েছিল। বিষয়টি আমি শুনেছি। ওই সময়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অন্য কিছু থাকলে আমরা বিষয়টি দেখব। অনিয়মের বিষয়ে কোনো ছাড় হবে না বলেও জানান এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
সূত্র আরও জানায়, সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর ছিলেন এই আইরিশ পাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আর স্ত্রী শিলা ইসলাম ছিলেন এই আইরিশ পাবের চেয়ারম্যান। এ ছাড়া পরিচালক হিসেবে ছিলেন সালমান মুক্তাদিরের স্ত্রী দিশা ইসলাম। আইরিশ পাবের মোট শেয়ারের সিংহভাগ ছিল শেখ নূর ইসলাম পরিবারের। তার মধ্যে শেখ নূর ইসলামের নামে ছিল ৪ হাজার শেয়ার, শিলা ইসলামের নামে ৩ হাজার, দিশা ইসলাম ও তাসনীম ইসলামের নামে শেয়ার ছিল দেড় হাজার করে মোট তিন হাজার শেয়ার। সব মিলে নূর ইসলাম পরিবারের কাছে ছিল প্রতিষ্ঠানটির ১০ হাজার শেয়ার। এরই মধ্যে দেলওয়ার হোসেন ও সেলিমুজ্জামানের কাছে কৌশলে সব শেয়ার হস্তান্তর করে দেন শেখ নূর ইসলাম। শেয়ার ছেড়ে দিলেও মূলে ছিলেন এই নূর ইসলাম। শুধু রেস্টুরেন্টের একটি সাধারণ লাইসেন্স নিয়ে প্রথমে আইরিশ পাব অ্যান্ড বার লিমিটেড নামে শুরু করেন। আর কৌশলে এই রেস্টুরেন্টের কাছেই বুড়িগঙ্গার তীরের কাছেই তোলেন একটি ওয়্যারহাউস বা গুদাম। যার খুব কাছেই পানগাঁও কাস্টম হাউস।
অভিযোগ রয়েছে, অবৈধ মদের চালান আনতে তিনি এই পথকে বেছে নিতেন। কারণ হিসেবে একাধিক শুল্ক কর্মকর্তা কালবেলাকে জানিয়েছেন, পানগাঁও কাস্টম হাউসে নদীর প্রশস্ততা তুলনামূলক অনেক কম। কাস্টম হাউসের জেটিতে জাহাজ ভিড়লে পেছনের অংশ নদীর ওই পারের কাছাকাছি চলে যায়। এই সুযোগে একটি চক্র এ ধরনের বিদেশি মদের চালান খুব সহজে নিয়ে যায় এবং সহজেই গুদামজাত করে ফেলে। তবে এ নিয়ে যাওয়ার কোনো দালিলিক প্রমাণ দিতে পারেননি। তবে কোনো ধরনের আমদানি ছাড়া বিদেশি মদের এই বিশাল মজুত এবং বিক্রি কীভাবে সম্ভব তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে তিনি ডোমিনোজ পিৎজার আদলে ডোমিনাস লিমিটেড নামে একটি মদের বারের লাইসেন্স নেন। পরবর্তী সময়ে কোনো ধরনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে রেস্টুরেন্টের নামে নেওয়া লাইসেন্স বারের লাইসেন্সে পরিণত করেন।
এ বিষয়ে জানতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
আইরিশ পাবে অভিযান পরিচালনা করা এক শুল্ক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, আইরিশ পাবে অভিযান পরিচালনা করার পর থেকে দফায় দফায় নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছেন আইরিশ পাবের মালিকরা। বিদেশি মদ বিক্রি করার বিপরীতে কোনো বিল অব এন্ট্রির নথিপত্র ছিল না আইরিশ পাবের। আর পর্যটন করপোরেশন থেকে বিদেশি মদ কেনার ২০১৬ সালের একটি পুরাতন ইনভয়েস দেখিয়ে ২০১৯ এবং ২০২০ সালের উৎপাদিত মদ বিক্রির প্রমাণ আমরা পেয়েছি। এ ছাড়া যে লাইসেন্সে আমদানি করেছে বলে দাবি করেছে আইরিশ বারের মালিকরা, তা ছিল মূলত কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানির একটি লাইসেন্স।
যা দিয়ে বৈধভাবে মদ আমদানি করা অসম্ভব বলেও জানান এই কর্মকর্তা। এ ছাড়া ওই অভিযানে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) অনুমোদনবিহীন ৫৭ সেট ওয়াকিটকিও পান শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, আইরিশ পাবের সাবেক মালিকরা প্রভাব খাটিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত বাধাগ্রস্ত করেছেন। যার কারণে থানা থেকে মামলা প্রথমে পিবিআিই, পরবর্তী সময়ে সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়। ওই তদন্তে শেখ নূর ইসলামের পরিবারের কানাডার ব্যাংক লেনদেন থেকে শুরু করে বিভিন্ন তথ্য উঠে আসে। তবুও নূর ইসলামের পক্ষে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। যার কারণে অর্থপাচারের বিষয়টি আর আলোর মুখ দেখেনি বলেও অভিযোগ করেন তৎকালীন শুল্ক গোয়েন্দার কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ নূর ইসলাম কালবেলাকে বলেন, আইরিশ পাব অ্যান্ড বার অনেক আগেই আমি বিক্রি করে দিয়েছি। রেস্টুরেন্টের লাইসেন্স নিয়ে মদের বার চালানো এবং প্রভাব বিস্তার করে তদন্ত বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগের বিষয়টি কালবেলার কাছে অস্বীকার করেন তিনি। আর এখন তিনি এসব কিছুর সঙ্গে নেই বলেও জানান নূর ইসলাম।
সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুরের ফুঁ-ওয়াংসহ ৪ বারে অভিযান কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নূর ইসলামের ফুঁ-ওয়াং বোলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডসহ চার প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অ্যালকোহল ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের অবৈধ উৎস, শুল্ক-ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগে এ অভিযান চালায় সংস্থাটি। অভিযান চালানো অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো– রে-ক্যানভাস রেস্টুরেন্ট, হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনাল, মার্গারিটা লাউঞ্জ। গতকাল শনিবার কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) চারটি দলের নেতৃত্বে এ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে এনবিআরের আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট, সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স সেল (সিআইসি), মূসক নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকার (উত্তর) কর্মকর্তারা অংশ নেন।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকার বিভিন্ন বার, রেস্টুরেন্ট, ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও শুল্কমুক্ত দোকানে অবৈধ উৎস থেকে অ্যালকোহল বা অ্যালকোহলজাত পণ্য সংগ্রহের অভিযোগ পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে র-ক্যানভাস রেস্টুরেন্ট, হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনাল, মার্গারিটা লাউঞ্জ এবং ফু-ওয়াং বোলিং অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডে অভিযান চালানো হচ্ছে। অভিযানে প্রতিষ্ঠানগুলোর মজুতে থাকা অ্যালকোহল ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের উৎস, আমদানি ও ক্রয়-সংক্রান্ত দলিল, পণ্যের বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট শুল্ক-মূসক ও আয়কর পরিশোধের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। অভিযান চলাকালে নথিপত্র ও মজুত যাচাইয়ের পাশাপাশি অনিয়ম পাওয়া গেলে পণ্য আটকের কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব পণ্য অননুমোদিত গ্রাহকের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মজুত, আমদানি ও ক্রয়-সংক্রান্ত দলিল এবং কর-শুল্ক পরিশোধের তথ্য পর্যালোচনা করছেন। অভিযান শেষে বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানিয়েছে এনবিআর।