Image description
অর্থনীতি নাজুক, পরিশোধে অক্ষমতায় নামতে পারে বিপদ

ক্রমেই সরকারের আয়ের খাতগুলো সংকুচিত হচ্ছে। রাজস্ব আদায় কমছে। নতুন বিনিয়োগ নেই। ফলে আয় বাড়বে, এ ধরনেরও সম্ভাবনা কম। কমছে সরকারি কোম্পানির মুনাফাও। বিপরীতে বাড়ছে সরকারের নানা ব্যয়। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ছে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা। এছাড়াও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) আসছে নতুন নতুন প্রকল্প। এই ব্যয় মেটাতে দেশি-বিদেশি ঋণই একমাত্র ভরসা। বিদায়ি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে নিয়েছে ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পেছনেও অন্যতম কারণ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্তপূরণ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ইতোমধ্যে দেশ এক ধরনের ঋণের ফাঁদে পড়েছে। ফলে বাজেটে ঋণ পরিশোধ এখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়ের খাত। এছাড়াও ২০২৭ সালে আরও কিছু ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে। এ অবস্থায় ঋণ আরও বাড়লে পরিস্থিতি ভয়ংকর হবে। তাদের মতে, ঋণ নেওয়া সমস্যা নয়। পরিশোধের অক্ষমতা বড় বিপদ।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভয়াবহ খারাপ। বিনিয়োগ স্থবির, জ্বালানি সংকট, সরকারের আয় কমছে এবং খেলাপি ঋণ বাড়ছে। তবে এর জন্য এই সরকার দায়ী নয়। শেখ হাসিনার আমল থেকে এই অধোগতি শুরু হয়। তিনি বলেন, বর্তমানে সরকারের আয় বাড়ছে না; কিন্তু খরচ করতে হচ্ছে। ফলে আমার বিবেচনায় ইতোমধ্যে দেশ ঋণের ফাঁদে পড়ে গেছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে।

অধ্যাপক আবু আহমেদ আরও বলেন, ঋণ পরিশোধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখছি না। সাম্প্রতিক সময়ে আরও খারাপ অবস্থা দেখা যাচ্ছে। যেমন মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না। কিন্তু মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। অর্থনীতির জন্য এটি ভয়ংকর। কারণ, এর ফলে দরিদ্র বাড়ে, বৈষম্য সৃষ্টি হয় এবং বেকারত্ব বাড়ে। পরিস্থিতির উন্নয়নে দ্রুত কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে যমুনা সেতুর শেয়ার বিক্রি, চট্টগ্রাম বন্দর এবং বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের মতো বড় প্রকল্প ইজারা দিতে হবে। এতে সরকারের হাতে কিছু টাকা আসবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাবে, বর্তমানে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি ২২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশি ঋণ ১২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশের মানুষের মাথাপিছু সরকারি ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বৈদেশিক ঋণের একটি বড় অংশ নেওয়া হয়েছে বড় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে। বৈদেশিক ঋণের সুবিধা হলো, তুলনামূলকভাবে কিছুটা সহজ শর্তে পাওয়া যায়। কিন্তু ঋণ পরিশোধ করতে হয় বৈদেশিক মুদ্রায়। ফলে রপ্তানি, প্রবাসী আয় এবং অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঋণ নেওয়া সমস্যা নয়। পরিশোধের সক্ষমতা হারানো বড় বিপদ। কারণ, সরকারের ঋণ কত, এর চেয়ে বড় প্রশ্ন-এই ঋণের অর্থ কতটা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার হচ্ছে। নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও রাজস্ব আয়ে প্রভাব পড়ছে কি না। বাস্তবতা বলছে, সব প্রশ্নের উত্তরই নেতিবাচক।

সরকারের উচ্চঋণের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করেছে। বিপরীতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে দেশি ও বিদেশি ঋণ নিতে হবে সরকারকে। বিশেষ করে এডিপি বাস্তবায়নে ঋণের ওপর নির্ভরতা বেশি। চলতি বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ৩ লাখ কোটি টাকা। বাজেটের হিসাবে রাজস্ব দিয়ে নিয়মিত ব্যয় মেটানোর পর উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশই ঋণের মাধ্যমে জোগান দিতে হবে।

সরকারি সূত্র বলছে, বর্তমানে রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। বিদায়ি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বিপরীতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ৪৬ শতাংশ। কিন্তু দেশের অর্থনীতির বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ওই বছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও যা ৪৭ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা বেশি।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশি ঋণের সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

এই সুদ পরিশোধে যে অর্থ লাগবে, তা মোট বাজেটের প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা নিয়ে বরাবরই উদ্বেগ জানিয়ে আসছে আইএমএফ। সংস্থাটির সবশেষ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সরকারি ঋণ ও বৈদেশিক ঋণ দুটিই মাঝারি মানের ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে। সংস্থাটি আরও বলেছে, রাজস্ব আয় বাড়ানোই ঋণের চাপ কমানোর অন্যতম প্রধান পথ। এছাড়াও আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করা এবং বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

জানতে চাইলে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্ট্যাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে দেশের ঋণ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তবে এ পরিস্থিতি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিনে পুঞ্জীভূত হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো, আগে যেসব ঋণ নেওয়া হয়েছিল, তা সঠিক কাজে খরচ না করে লুটপাট ও অপচয় হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, সেখান থেকে উত্তরণের সহজ কোনো পথ নেই। পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। এটি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে না পারলে দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের তিনটি উপায় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সবার আগে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, আগামী দিনে শুধু উৎপাদনশীল খাত ছাড়া অন্য কোনো খাতে (যেমন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন) নতুন ঋণ নেওয়া যাবে না। তৃতীয়ত, এখনো যেসব দুর্নীতির কথা বলা হচ্ছে, সেসব দুর্নীতি ও অর্থের অপচয় কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।

এদিকে প্রতিবছর বাজেটের ঘাটতি পূরণ করতে নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে। আবার আগের ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে সরকারের অর্থের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা এটিকে ঋণের ফাঁদ বলছেন। ২০২৭ থেকে কিস্তির চাপ বাড়বে। সরকারি হিসাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে পরিশোধ করতে হবে প্রায় ৪ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার। আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে এই পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৫ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। ২০২৮-২৯ অর্থবছরে তা ৭ দশমিক ৫৬৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ আগামী কয়েক বছরে শুধু বিদেশি ঋণ পরিশোধের জন্যই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হবে।

শ্রীলংকা একসময় বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও ঋণ সংকটে পড়েছিল। পরে আইএমএফ-এর সহায়তায় সমস্যা কেটেছে। আইএমএফ-এর বিশ্লেষণ বলছে, শ্রীলংকার সংকট থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে ঋণ পুনর্গঠন, আর্থিক শৃঙ্খলা ও অর্থনীতিতে সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আফ্রিকার দেশ ঘানাও বড় ঋণ সংকটে পড়েছিল। পরে দেশটি ঋণ পুনর্গঠন করে। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনে। রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা করে। আন্তর্জাতিক সহায়তাও নেয়।