Image description

সময়টা ছিল ২০২০ সাল, করোনাভাইরাস মহামারির প্রথম ধাপ। লকডাউনের সময় পুরান ঢাকার আদালত চত্বর থেকে এক টেলিভিশন সাংবাদিক যখন সরাসরি খবর দিচ্ছিলেন, তখন মারুফ নামের এক পথশিশু ক্যামেরার সামনে এসে বলে ওঠে, ‘মন্ত্রী লকডাউন দিছে। এইগুলা ভুয়া।’

এ ঘটনায় মারধরের শিকার হয় সেই শিশু। মারধরের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে ‘সহমর্মিতা ফাউন্ডেশন’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থা ও পুলিশের সহায়তায় মারুফের পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়। তাকে বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

মারুফ থাকত পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে। আজও সেখানে অন্তত ৪০ জন গৃহহীন ও ছিন্নমূল শিশুর যাতায়াত দেখা যায়। কিন্তু তাদের কারও পরিবারের সন্ধান বের করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সেখানকার ১৩ বছর বয়সী এক মেয়ের জন্ম শরীয়তপুরে। মাত্র সাত বছর বয়সে তার ঠিকানা হয় এই পার্ক।

মেয়েটি জানায়, সে যখন খুব ছোট, তখনই তার বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যান। সংসার চালাতে গিয়ে মায়ের হিমশিম অবস্থা হওয়ায় তাকে পাঠানো হয় ফুফুর বাড়িতে। সেখানে অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। কোথায়ও যাওয়ার জায়গা না পেয়ে সে এক লঞ্চে চেপে বসে। ঢাকায় পৌঁছানোর পর এই পার্কই হয়ে ওঠে তার ‘ঘর’।

আনুমানিক ১০ বছর বয়সী আরেক ছেলে শিশু জানেই না তার জন্ম কোথায়। শুধু এটুকু মনে আছে—কিছুদিন আগে ক্ষুধার তাড়নায় সদরঘাটে এক যাত্রীর ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়ে পালিয়েছিল সে। ধরা পড়ার পর তাকে এমন নির্মমভাবে পেটানো হয় যে, তার কপাল ফেটে যায়। সেলাইয়ের সেই দাগ এখনো স্পষ্ট ভেসে আছে।

এই নির্মম গল্পগুলো শুধু তিন শিশুর নয়, এমনকি তিন লাখ শিশুরও নয়। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে অন্তত ৩৪ লাখ পথশিশু রয়েছে। আর জীবনযুদ্ধের এই চরম নির্মমতা যে একদিন তাদের অসামাজিক কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দিতে পারে, সে আশঙ্কা একেবারেই অমূলক নয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন এসব শিশু টিকে থাকার লড়াই কিংবা অপরাধী চক্রের প্ররোচনায় চুরি, ছিনতাই, ভিক্ষাবৃত্তিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু মারুফদের মতো শিশুদের পরিবারের সন্ধান বের করার মতো উদ্যোগ কেবল তখনই চোখে পড়ে, যখন কোনো ঘটনা গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার বলেন, কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই লাখ লাখ পথশিশু সমাজের জন্য এক ধরনের ‘টাইম বোমা’ হয়ে উঠতে পারে।

তিনি টাইমসকে বলেন, ‘পরিচয়, সামাজিক সুরক্ষা ও আশ্রয়ের সংকটে থাকা এই শিশুরা খুব সহজেই অপরাধীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। কেউ নিজে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, আবার কাউকে অপরাধীরা ব্যবহার করছে।’

আন্তর্জাতিক এনজিও কারিতাসের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির বাইরে রয়েছে বাংলাদেশের ৯৪ শতাংশ পথশিশু। আর ৫৮ শতাংশ শিশুর জন্ম নিবন্ধন নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মো. তৌহিদুল হক টাইমস’কে বলেন, সুবিধা বঞ্চিত ও পথসংলগ্ন শিশুরা মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ লক্ষ্যবস্তু। কারণ তাদের প্রতিরোধ-ক্ষমতা প্রায় নেই।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন টাইমস’কে জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাধারণত ছোট শিশুদের সন্দেহ কম করে। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অপরাধী চক্রগুলো শিশুদের মাদক ও অস্ত্র বহনে ব্যবহার করে।

 

সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে বসবাসকারী আট বছরের এক শিশু আগে বোতল কুড়াত ও কুলি হিসেবে কাজ করত। কৌতুহলের বশে সে সমবয়সী মাদকাসক্ত শিশুদের সঙ্গে ‘ডান্ডি’ খাওয়া শুরু করে। জুতা তৈরিতে ব্যবহৃত আঠা বা সলিউশন পলিথিনে নিয়ে শ্বাস টেনে এই নেশা করা হয়।

পরবর্তী সময়ে সে এই নেশায় ভয়াবহভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে। নেশার টাকা জোগাতে সে অন্যদের সঙ্গে মিলে যাত্রীদের পকেট মারা এবং মোবাইল ও ব্যাগ ছিনতাই শুরু করে। একপর্যায়ে অপরাধী চক্রের ‘বড় ভাইদের’ নির্দেশে সে মাদকের চালান বহনের কাজও করতে থাকে।

টাইমসের কাছে তার অকপট স্বীকারোক্তি, ‘এই কাম করলে কিছু টাকা দেয়। সেই টাকা দিয়া একটু ডান্ডি টানা যায়, আর মাঝে মাঝে ভাত খাওয়া যায়।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, শহরজুড়ে ছিনতাই ও কিশোর অপরাধে এসব শিশুর সম্পৃক্ততা দিন দিন বাড়ছে। নির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী ঠিকানা না থাকা এবং এক এলাকায় থেকে অন্য এলাকায় অপরাধ সংগঠনের কারণে পুলিশি তদন্ত বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

আরেক এনজিও অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ জানায়, দেশে এখনো সমন্বিত শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য জাতীয় তথ্যভাণ্ডার, পর্যাপ্ত নগর শিশু কল্যাণ সেবা এবং প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দের অভাব রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নূরুল ইসলাম বলেন, সরকার ও এনজিওগুলোর কিছু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদী মজবুত সুরক্ষা কাঠামোর এখনো যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার মো. সারোয়ার টাইমস’কে জানান, পুলিশ পরিবার চিহ্নিতকরণ, শিশুদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর এবং পুনর্বাসনে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু লোকবলের সীমাবদ্ধতার কারণে একা এই বিশাল বোঝা টানা সম্ভব নয়।

তিনি মনে করেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, সরকারি শিশু সুরক্ষা সংস্থা, এনজিও এবং দাতা সংস্থাগুলোকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।

অবশ্য সরকারি উদ্যোগ যে একেবারেই নেই, তা নয়। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘পথকলি ট্রাস্ট’ ১৯৯২ সালে ‘শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট’ নামে পুনর্গঠিত হয়, যার মূল উদ্দেশ্য সুবিধাবঞ্চিত ও শ্রমজীবী শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া। বর্তমানে এটি দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ২০৫টি শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করছে।

এ ছাড়া সরকার জাতীয় শিশু নীতি ২০১১, শিশু আইন ২০১৩ এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ড্রপ-ইন সেন্টার, মুক্ত আশ্রয়কেন্দ্র, কাউন্সেলিং, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে চাহিদার তুলনায় এই সেবার আওতা অত্যন্ত সীমিত।

সরকারি ৮৫টি শিশু পরিবারে মোট ১০ হাজার ৩০০ জন এবং ৬টি ছোটমণি নিবাসে মাত্র ৬০০ জন শিশুর অনুমোদিত আসন রয়েছে।

অন্যদিকে, পথশিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত ৪২০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত পাঁচ বছর মেয়াদী একটি পুনর্বাসন প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যাটি শুধু আশ্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা কিংবা বাজেটের আকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুরা রাস্তায় নামার আগেই তাদের চিহ্নিত করা, জন্ম নিবন্ধনের আওতায় আনা, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা এবং মাদক ও অপরাধ চক্র থেকে রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।

অধ্যাপক সালমা আক্তার উল্লেখ করেন, স্বল্পমেয়াদী প্রকল্পগুলো সাধারণত অনুদান থাকা পর্যন্ত কার্যকর থাকে। প্রকল্প চলাকালীন শিশুদের প্রতি মনোযোগ থাকে, কিন্তু প্রকল্প শেষ হলে তাদের আর খোঁজখবর রাখা হয় না।

তিনি সিটি করপোরেশন, স্থানীয় প্রতিনিধি, পুলিশ, এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে যুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদী এলাকাভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।

 

‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর শিশু সুরক্ষা ও শিশু অধিকার বিভাগের প্রধান আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, জন্ম নিবন্ধন না থাকা শিশুরা মূলত সরকারি নথিপত্রের বাইরেই থেকে যায়।

তিনি পরামর্শ দেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর, সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসন যৌথভাবে তাদের চিহ্নিত করে জন্ম নিবন্ধন, টিকাদান, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের আওতায় আনার প্রস্তাবও দেন তিনি।

ইতোমধ্যে যারা পথজীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, তাদের জন্য বয়স ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভিন্ন ভিন্ন পুনর্বাসন পরিকল্পনা করার তাগিদ দেন আবদুল্লাহ আল মামুন। একইসঙ্গে তিনি সমাজসেবা অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে বড় শহরগুলোতে ওয়ার্ডভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব করেন।