Image description

জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে আলোচনায় কয়েকজন সাংবাদিক এখনই উচ্চকক্ষ গঠন না করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের মতে, এককক্ষবিশিষ্ট বর্তমান সংসদ ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হয়ে ওঠেনি। এর মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন করলে রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি এর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। তবে জুলাই জাতীয় সনদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনে রাজনৈতিক ঐকমত্য হওয়ায় সরকার সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এগোতে চায় বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

তিনি বলেন, প্রস্তাবটি সংসদে উঠলে সরকারি দলসহ বিভিন্ন দল আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। এ সময় তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা নিয়ে আলোচনার তাগিদ দেন। একইসঙ্গে জুলাই সনদে বিএনপি যেসব বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, সেসব বিষয়ে বিরোধী দল প্রস্তাব দলে আলোচনা হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠকে এ আলোচনা হয়।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং কমিটির সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল।

গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন চরচা ডটকম সম্পাদক সোহরাব হাসান, আরটিভির বার্তাপ্রধান ইলিয়াস হোসেন, বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক ড. আবদুল হাই সিদ্দিক, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক মোস্তফা আকমল, যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম আহমেদ, টকশো ব্যক্তিত্ব ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্ত ও এটিএন বাংলার কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর একরামুল হক সায়েমসহ অনেকে। তারা বিরোধী দলের অংশগ্রহণে সংবিধান সংশোধন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্থায়ীকরণ, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, গণমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার বিষয়েও মতামত দেন।

বৈঠকে আলোচনার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের আদৌ বাংলাদেশের প্রয়োজন আছে কি না, আলোচনায় এমন প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ একক ও স্বাধীন-সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র এবং এখানে অঙ্গরাজ্যের ব্যবস্থা নেই-এ বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এ বিবেচনায় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যায় কি না, সে প্রস্তাব দিয়েছেন কেউ কেউ। তিনি বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদে আমরা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনে একমত হয়েছি। তাই সে অনুযায়ী এগোতে চাই। তবে তারা যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটা পার্লামেন্টে বিবেচিত হলে সরকারি দল ও বিভিন্ন দল তা বিবেচনা করবে।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কীভাবে গঠিত হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ সরকার গঠনের প্রক্রিয়া, কারা এতে থাকবেন এবং কোন কোন ধাপ অনুসরণ করা হবে, তা নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে কিছু বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে, আবার কিছু বিষয়ে ভিন্নমতও আছে। কোন প্রক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে, তা সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার একটি প্রস্তাব রয়েছে। তবে এ বিষয়ে আরও বিকল্প প্রস্তাব ও উন্মুক্ত আলোচনা প্রয়োজন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে সংবাদপত্রে আলোচনা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব প্রস্তাব জাতির জন্য উপযুক্ত মনে হবে, সেগুলো সংসদে বিবেচনা করা হবে।

বৈঠকে সংবিধানের প্রস্তাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আবারও আহ্বান জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি। তিনি বলেন, বিশেষ কমিটির আলোচনা সবার জন্য উন্মুক্ত। বিরোধী দলকে কমিটিতে প্রতিনিধি মনোনয়ন দিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপির দেওয়া ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্টের বিষয়ে অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে প্রণীত ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করতে চায়। তবে বিরোধী দল কোনো বিষয়ে সংশোধনের প্রস্তাব দিলে তা আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করা যেতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণের প্রস্তাবের বিষয়ে কমিটির সভাপতি বলেন, কেউ কেউ এটিকে গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থি বলে মত দিয়েছেন। তবে বিএনপি এ প্রস্তাব থেকে সরে আসেনি। দলের চেয়ারম্যান হিসাবে তারেক রহমান জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় এ প্রস্তাব দিয়েছিলেন। দলের নির্বাচনি ইশতেহারেও তা উল্লেখ করা হয়েছে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কোনো ব্যক্তি যাতে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রীর পদে থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন, সেই চিন্তা থেকেই এ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সংবিধান সংশোধনের প্রতিবেদন তৈরির আগে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হবে বলেও জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, বিচারক ও সাবেক বিচারক, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তিদের পাশাপাশি শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আহতদের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সদস্যদের সঙ্গেও বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তবে সেই আলোচনা হবে শেষের দিকে। সবার মতামত নেওয়ার পর কমিটি প্রতিবেদন তৈরি করবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংসদে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন করা হবে। সংসদের ভেতরে ও বাইরে আরও আলোচনার মধ্য দিয়ে গ্রহণযোগ্য সংশোধনী আনার চেষ্টা করা হবে।

বৈঠকের পর বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক ড. আবদুল হাই সিদ্দিক বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে অবশ্যই আলোচনায় রাখতে হবে। জুলাইয়ের চেতনায় বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। বিরোধী দলকে আলোচনায় এনে তাদের সম্মতি নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। তাহলেই সংশোধন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। এছাড়া সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

যমুনা টেলিভিশনের সিইও ফাহিম আহমেদ বলেন, সবাই বলেছেন, সংবিধান সংশোধন যেন দীর্ঘমেয়াদি হয় এবং বারবার পরিবর্তনের প্রয়োজন না পড়ে। জুলাই সনদে নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন এবং নোট অব ডিসেন্ট থাকা বিষয়গুলো রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।