Image description

দেশে কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গেই দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে অপতথ্য (ন্যারেটিভ) উৎপাদনকারী সংঘবদ্ধ চক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে দেয়। শুরু হয় মুহুর্মুহু শেয়ার। ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তৈরি করা হয় ভিডিও। যাচাই-বাছাইয়ের আগেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সেই বয়ান ছড়িয়ে পড়ছে হাজারো অ্যাকাউন্টে; জায়গা করে নিচ্ছে মূলধারার আলোচনায়। ঘটনা সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য জানার আগেই এসব অপতথ্য বুঝে কিংবা না বুঝে বিশ্বাস করে ফেলেন সাধারণ মানুষ। সেখান থেকেই তৈরি হয় নেতিবাচক জনমত।

প্রতিষ্ঠিত হয় একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ। এর মাধ্যমে কখনো সরকার, কখনো বিরোধী পক্ষকে ঘায়েল করা হচ্ছে। কুমিল্লায় কিশোর অপ্রতিম হত্যাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা, মধুর ক্যান্টিনকে ‘ইশারাত মঞ্জিল’ দাবি করা; কিংবা প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর নিয়ে ভিসা নিষেধাজ্ঞার অপপ্রচার সাম্প্র্রতিক তথ্যযুদ্ধের ভয়ংকর বাস্তবতা। অথচ এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো দর্শকের ভূমিকায় থাকে-‘দেখি কী হয়’ ধরনের অপেক্ষায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে একই। অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয় প্রতিক্রিয়া। আর পরিস্থিতি গড়ানোর পর টকশোতে আলোচনা হয়-কেন সরকার ব্যর্থ হলো, কেন শুরুতেই প্রতিরোধ করা গেল না। 

অর্থাৎ ঘটনা, অপতথ্য ছড়ানো, জনমত তৈরি এবং পরে সরকারের প্রতিক্রিয়া-প্রতিটি ধাপেই দৃশ্যমান হয় এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই তথ্যযুদ্ধে পিছিয়ে রয়েছে সরকার। শুরুতেই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে ঘটনার প্রকৃত চিত্র, যাচাই করা তথ্য ও প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা জনসমক্ষে তুলে ধরা হলে অপতথ্য তৈরির সুযোগ অনেকটাই কমে যায়। দ্রুত ও তথ্যভিত্তিক সরকারি যোগাযোগই পারে একটি ঘটনা ঘিরে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা ঠেকাতে। এসব অপতথ্যের জবাব পালটা স্লোগান বা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে নয়; বরং দ্রুত, নির্ভুল ও প্রমাণনির্ভর তথ্য প্রকাশের মাধ্যমেই দেওয়া উচিত। এজন্য সরকারের একটি ডেডিকেটেড ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্মও থাকতে হবে।

ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরকারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে দ্রুত ও সমন্বিত তথ্য সরবরাহের ঘাটতি। কোনো ঘটনার প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থা যদি যাচাই করা তথ্য প্রকাশ না করে, তাহলে অনুমান, গুজব ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সেই শূন্যস্থান পূরণ করে। তিনি বলেন, সরকারের উচিত একটি ডেডিকেটেড ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। যেখানে প্রযুক্তি ও মেশিন লার্নিংয়ের সহায়তায় ছড়িয়ে পড়া তথ্য যাচাই করে সত্য-মিথ্যার ব্যাখ্যা দেওয়া হবে। পাশাপাশি দক্ষ ও সঠিক ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর টিম গড়ে তুলে দ্রুত সঠিক তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরা জরুরি।

তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবার রয়েছে, সরকার এতে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। তবে ভুল তথ্য ও অপতথ্যের বিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যাতে মিসইনফরমেশন ও ডিজইনফরমেশনের বিস্তার রোধ করা যায়।

সামাজিকমাধ্যমে বয়ান শুধু তথ্যের প্রচার নয়, জনমত তৈরিরও হাতিয়ার। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এটি ছড়ানোর পেছনে একাধিক স্তর কাজ করে। প্রথম ধাপে থাকে উৎস বা বয়ান উৎপাদক (রাজনৈতিক কর্মী, মতাদর্শিক গোষ্ঠী বা অজ্ঞাত অ্যাকাউন্ট)। দ্বিতীয় স্তরে থাকে ‘অ্যামপ্লিফায়ার’ (বড় পেজ, ইউটিউবার ও ইনফ্লুয়েন্সার); যারা একই বক্তব্যকে বড় সংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়। তৃতীয় স্তরে রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক এটিকে রাজনৈতিক রূপ দেয়। চতুর্থ স্তরে তৈরি হয় রিলস, মিম ও ফটোকার্ড। সবশেষে মূলধারার গণমাধ্যম বা টকশোতে যাচাই ছাড়া এসব বিষয় আলোচনায় এলে তা ‘প্রতিষ্ঠিত সত্য’র আবহ তৈরি করে।

সম্প্রতি কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক মাধ্যমে তাকে হিন্দু পরিচয় দিয়ে ঘটনাটিকে সাম্প্রদায়িক রং দেওয়ার চেষ্টা করে একটি গোষ্ঠী। পতিত আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বেশ কয়েকটি আইডি থেকেও এমন পোস্ট করা হয়। অথচ পুলিশের তদন্তে দেখা যায়, আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়।

একইভাবে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর ঘিরেও ভিন্ন বয়ান তৈরি হয়। কয়েকজন ইউটিউবার দাবি করেন, নিউইয়র্কে জাতিসংঘের নির্ধারিত এলাকার বাইরে প্রধানমন্ত্রীর যাওয়ার সুযোগ নেই এবং তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। তবে সরকারি নথি বা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসাসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার তালিকায় এর কোনো সত্যতা মেলেনি; বরং প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচি, মার্কিন প্রেসিডেন্টের নৈশভোজসহ নানা আয়োজনে অংশ নেন। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত কাউন্টার ন্যারেটিভ না থাকায় এই গুজবটি সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঘোষিত ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি ঘিরেও ছড়ানো হয় বিভ্রান্তিকর ভিডিও। ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার জানায়, ২০ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচি ঘিরে অন্তত ১১টি পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ভিডিও ছড়ানো হয়, যার একটি ছিল ২০২১ সালে ফেনীতে যুবলীগের একটি পুরোনো মিছিলের দৃশ্য। আরেকটি বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী ‘মধুর ক্যান্টিন’কে নবাব পরিবারের ‘ইশারাত মঞ্জিল’ হিসাবে দাবি করা হয়, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

ছয় মাসে ৩ হাজার ২১০টি অপতথ্য শনাক্ত : রিউমর স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে ৩ হাজার ২১০টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছিলেন সবচেয়ে বেশি টার্গেট হওয়া ব্যক্তি। ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ বলছে, এপ্রিল-জুনে যাচাই করা ১ হাজার ২৬৫টি অপতথ্যের মধ্যে ৫৭ শতাংশই ছিল রাজনৈতিক। একই সময়ে ধর্মীয় অপতথ্যের হার বেড়ে ৯ শতাংশ এবং আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত অপতথ্য ৮ দশমিক ২ শতাংশে ওঠে।

গুজব ও প্রোপাগান্ডা বিশেষজ্ঞ ইমতিয়াজ মির্জা বলেন, ‘ঘটনা ঘটার প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তথ্য না দিলে ব্যবহারকারীরাই ঘটনার ব্যাখ্যা তৈরি করে ফেলেন। অসত্য তথ্যের জবাব হওয়া উচিত তথ্য ও যুক্তি দিয়ে; মানুষের কণ্ঠ বন্ধ করে নয়। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু সেই স্বাধীনতার নামে মিথ্যা তথ্য, ঘৃণা বা সহিংসতার উসকানি সমাজকে বিভক্ত করবে না।’

ঢাকায় অফিস স্থাপনে আগ্রহী মেটা : অপতথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান ঠেকানোর ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর অফিস বাংলাদেশে না থাকা। তবে সম্প্রতি মেটার (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান) সঙ্গে সরকারের একটি বৈঠকে অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানান, ডিজিটাল হয়রানি ও অপতথ্য ঠেকাতে ঢাকায় অফিস স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে মেটা। বৈঠকে বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা আইন ও ডিজিটাল হয়রানির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ঢাকায় তাদের অফিস থাকলে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সরাসরি যোগাযোগ করে তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং আপত্তিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ করতে পারবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।