সোনালী ব্যাংকের কর্মী হরেন্দ্রনাথ চন্দ্রর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ১৯৮৫ সালে মামলা করে ওই সময়কার দুর্নীতি দমন ব্যুরো। বিচারিক আদালতের রায়ে হরেন্দ্রনাথকে খালাস দেওয়া হয়।
আরেকটি ঘটনা এমন : এক যুগ আগে শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে আদিবাসী শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে কান্তি মারাককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত। সাত বছর পর চলতি বছরের ১ জুলাই সেই মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় দেন হাইকোর্ট। পরে জানা যায়, পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি কাশিমপুর কারাগারে মারা গেছে দণ্ডিত কান্তি মারাক। তার মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক প্রমাণ মৃত্যু সনদ পাওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের রায় প্রত্যাহার ও মামলাটির সমাপ্তি চেয়ে আবেদন করে।
অধুনা এই ঘটনায় ফের আলোচনায় আসে—‘জাস্টিস ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’। কিন্তু এটিই দেশের বিচারপ্রার্থী মানুষের জীবনের নির্মম বাস্তবতা। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ (চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের আদালতগুলোতে ৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৯২১টি মামলা বিচারাধীন। সরকারের হিসাবে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৭৬। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলা। যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রছুলের এক প্রশ্নে গত ৭ জুলাই আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জাতীয় সংসদে এই তথ্য তুলে ধরেন। আইনমন্ত্রী সেদিন আরো জানিয়েছিলেন, অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি মামলার মধ্যে দেওয়ানি মামলা রয়েছে ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৪৩টি, আর ২৩ লাখ ৮৭ হাজার ৯৮৯টি রয়েছে ফৌজদারি মামলা। তবে সুপ্রিম কোর্টের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন বলছে, ৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৯২১টি বিচারাধীন মামলার মধ্যে অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলা ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি, আর সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন সাত লাখ ১৩ হাজার ৪৮৯টি মামলা। এর মধ্যে হাইকোর্টে ছয় লাখ ৭৪ হাজার ৫১৬টি এবং আপিল বিভাগে ৩৮ হাজার ৯৭৩টি মামলা বিচারাধীন।
এসবের মধ্যেও স্বস্তির খবর হলো, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে মামলা নিষ্পত্তির গতি বেড়েছে। ফলে কমতে শুরু করেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে জমে থাকা মামলা। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করায় মামলা নিষ্পত্তির গতি বাড়ে।
আইনজ্ঞরা বলছেন, প্রধান বিচারপতির বিশেষ পদক্ষেপে সর্বোচ্চ আদালতের মামলাজট কিছুটা কমলেও অধস্তন আদালতে যে বিশাল মামলাজট তৈরি হয়েছে, তা প্রচলিত বিচারব্যবস্থা দিয়ে নিরসন করা অসম্ভব। তাঁরা বলছেন, মহাপরিকল্পনা নেওয়া ছাড়া বিচার বিভাগকে মামলাজটমুক্ত করা যাবে না।
প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় লাখ লাখ মামলা নিষ্পত্তি সম্ভব নয় : অ্যাটর্নি জেনারেল
বিশাল এই মামলাজটের নিরসন কিভাবে সম্ভব জানতে চাইলে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় এই লাখ লাখ মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়।’
তবে মামলাজটের এই পর্যায়কে আর বাড়তে না দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, তুলনামূলক কম সাজার ফৌজদারি মামলাগুলোকে আপসযোগ্য করে তোলা।
তিনি বলেন, ‘এটি করা যায় কি না তা চিন্তা করার সময় এসেছে। দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে। অর্থাৎ কোনো বিরোধকে মামলা পর্যন্ত গড়াতে দেওয়া যাবে না। এরই মধ্যে কয়েকটি আইনের অধীনে মামলা আপসযোগ্য করেছে সরকার। এটি ভালো উদ্যোগ। আমি মনে করি, কম সাজার ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রেও এমনটা করা উচিত।’
গ্রাম আদালত সক্রিয় করার মাধ্যমেও মামলাজট কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘পাশাপাশি মানুষের মধ্যে মিথ্যা মামলা করার যে প্রবণতা, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দেখা যাচ্ছে, একজন ব্যক্তি কোনো কারণে একটা অপরাধ করে ফেলেছেন। কিন্তু ওই ব্যক্তির পরিবারের সবাইকে আসামি করে মামলা দেওয়া হচ্ছে। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নাগরিকদের সচেতন হতে হবে, তাঁরা যেন মিথ্যা মামলায় কাউকে না জড়ান। এগুলো করতে পারলে একটা সময়ে গিয়ে হয়তো আমরা এর সুফল পাব।’
মামলাজট কমানোর ক্ষেত্রে বিচারকদের ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর পরামর্শ হচ্ছে, যেকোনো মামলা গ্রহণ করার আগে বিচারকের উচিত মামলার আইনগত ভিত্তি বিবেচনা করা। রিট মামলার উদাহরণ টেনে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘যেকোনো মামলা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে মামলার মেরিট বিবেচনা করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত আছে। তার পরও দেখা যাচ্ছে, আদালত মামলা নিচ্ছেন। যেমন—বেসরকারি ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রিট চলে না। কিন্তু হরহামেশা এসব মামলা হচ্ছে। উচ্চ আদালতের অনেক বিচারক এসব মামলার বেসিক বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে মামলা নিচ্ছেন। সে কারণে প্রশ্ন জাগে, তাঁরা কতটুকু মন লাগিয়ে কাজ করেন?’
মামলাজট নিরসনে সুপারিশ ছিল দুই কমিশনের প্রতিবেদনে
চব্বিশের গণ-আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিচার বিভাগ সংস্কারে কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। ওই বছরের ৩ অক্টোবর আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানকে প্রধান করে আট সদস্যের কমিশন গঠন করা হয়। গত বছর ৮ ফেব্রুয়ারি মামলাজট নিরসন ও বিভিন্ন বিষয়ে সুপারিশসহ ৩৫২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দেয় ওই কমিশন। এতে মামলাজট নিরসনে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের (জেলা জজ) চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল; আর অধস্তন আদালতে বিচারকের সংখ্যা কমপক্ষে ছয় হাজারে উন্নীত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া আদালতের বাইরে সালিশি বা মধ্যস্থতার মাধ্যমে দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াটি আরো কার্যকর ও বাধ্যতামূলক করা এবং মামলা দায়ের, নিষ্পত্তিতে জেলাভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছিল।
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের আগে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও জট কমিয়ে আনার বিষয়ে ২০২৩ সালের আগস্টে আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেছিল আইন কমিশন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যাপ্ত বিচারক না থাকা, বিশেষায়িত আদালতে পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ না হওয়া, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের, জনবলের অভাব এবং দুর্বল অবকাঠামো মামলাজটের মূল কারণ। এ ছাড়া জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন পর্যায়ে চার বছরে অন্তত পাঁচ হাজার বিচারক নিয়োগ এবং আদালতে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের সুপারিশ করেছিল আইন কমিশন।
দেশে কত বিচারক
প্রধান বিচারপতিসহ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বর্তমানে বিচারপতি আছেন পাঁচজন; আর হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতি অছেন ১০০ জন। গত ২১ জুন জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নে আইনমন্ত্রী জানান, দেশে (অধস্তন আদালতে) বিচারকের অনুমোদিত পদ রয়েছে দুই হাজার ৬২০টি।
সুপ্রিম কোর্টের একজন কর্মকর্তা পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, বর্তমানে দেশে বিচারক আছেন দুই হাজার ২৩৩ জন। এর মধ্যে বিচারকাজে নিয়োজিত অছেন এক হাজার ৮৫৫ জন। বাকি ৩৭৮ জন প্রেষণে আছেন। আইনমন্ত্রীর তথ্য মতে, বিচারক পদে ৭৬৫টি অনুমোদিত পদ শূন্য আছে। জনসংখ্যা অনুপাতে প্রায় এক লাখ নাগরিকের জন্য বিচারকাজে আছেন মাত্র একজন বিচারক।
মামলাজট নিরসনে হাপরিকল্পনা নিতে হবে : মনজিল মোরসেদ
আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ না নেওয়া এবং সমাজে ক্রমবর্ধমান অপরাধ মামলাজটের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তাঁর ব্যাখ্যা হচ্ছে, এই দুটি কারণ হলো মামলা উৎপাদনের জায়গা। এই দুটি কারণে প্রতিদিন শত শত মামলা হচ্ছে। ফলে মামলা উৎপাদন ঠেকাতে না পারলে মামলাজটও ঠেকানো সম্ভব নয়।
কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘মামলাজট কমানোর জন্য প্রচলিত ব্যবস্থা দিয়ে আর হবে না। এর জন্য মহাপরিকল্পনা নিতে হবে। আর মহাপরিকল্পনা নিতে হলে সংবিধান, আইন পরিবর্তন করা লাগবে।’
তিনি বলেন, ‘অভিজ্ঞ আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে মামলাজট কমানোর ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যেতে পারে। কিন্তু বিদ্যমান সাংবিধানিক বা আইনি কাঠামোতে এর সুযোগ নেই। ফলে এর জন্য সংবিধান, আইনের সংশোধন করতে হবে।’
কমছে সুপ্রিম কোর্টের মামলাজট
সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ শাখার তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরুতে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন মামলা ছিল সাত লাখ ৮০০টি। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলতি বছরের প্রথম আট মাসে তা কমে হয়েছে ছয় লাখ ৮৫ হাজার ৮৩০টি। এই সময়ে নতুন মামলা হয়েছে ৮৩ হাজার ৭৪৬টি। এর বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে ৯৮ হাজার ৭৩২টি।
চলতি বছরের শুরুতে আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলা ছিল ৪১ হাজার ৫৫১টি। গত আট মাসে নতুন ৯ হাজার ১৩৯টি মামলার বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে ১১ হাজার ১৩৬টি। ৩১ আগস্ট শেষে আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলা দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৫৫৪টি। আর বছরের শুরুতে হাইকোর্ট বিভাগে ছয় লাখ ৫৯ হাজার ২৫৬টি মামলা বিচারাধীন ছিল। প্রথম আট মাসে ৭৪ হাজার ৬০৭টি নতুন মামলার বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে ৮৭ হাজার ৫৯৬টি। ৩১ আগস্ট শেষে হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলা দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৪৬ হাজার ২৭৬টিতে।
সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৩২ কর্মদিবসে আপিল বিভাগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। আর গত আট মাসে হাইকোর্টে নিষ্পত্তি হয়েছে ৮৭ হাজার ৫৯৬টি মামলা, যা পুরো ২০২৫ সালে নিষ্পত্তি হওয়া ৫৫ হাজার ৭৫৬টি মামলার চেয়ে ৩১ হাজার ৮৪০টি বেশি।’
মামলাজট নিরসনে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দ্রুত বিচার পাওয়া মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগ বা চেম্বার আদালতে মামলা বিলম্বিত করা বা অযথা সময় নেওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। আমি মনে করি, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিতে মাননীয় প্রধান বিচারপতির নেওয়া পদক্ষেপ অব্যাহত রাখা উচিত।’