দেশে হৃদরোগে প্রতিদিন গড়ে ৫৬২ থেকে ৭৭৭ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। একই সময়ে প্রতিদিন নতুন করে হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রায় ২ হাজার ৭২০ জন। বর্তমানে দেশে কোনো না কোনো হৃদরোগে ভুগছেন আনুমানিক ১ কোটি ২ লাখ ৬২ হাজার ১৯০ জন। অথচ বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই অধিকাংশ সরকারি মেডিকেল কলেজে। কোথাও আবার ক্যাথল্যাব আছে, কিন্তু যন্ত্র অচল; কোথাও যন্ত্র সচল থাকলেও তা পরিচালনার মতো দক্ষ জনবল নেই।
ফলে হৃদরোগের চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা ও জরুরি সেবার সক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের সংকট। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের রোগীদের নির্ভর করতে হচ্ছে রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর। এতে চিকিৎসার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি জরুরি মুহূর্তে ঢাকায় পৌঁছানোর আগেই জীবন হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব হার্ট দিবস’। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘ডোন্ট মিস আ বিট’ বা ‘হৃৎস্পন্দনকে গুরুত্ব দিন’।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের (আইএইচএমই) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন ৯ লাখ ৯২ হাজার ৭৩৬ জন। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বিভিন্ন গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর হৃদরোগে মারা যায় দুই লাখের বেশি মানুষ।
প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসান বলেন, দেশে অসংক্রামক রোগজনিত মৃত্যুর তিন ভাগের এক ভাগের জন্য দায়ী হৃদরোগ। গত তিন দশকে দেশে হৃদরোগ চিকিৎসার অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হলে তার ৯০ শতাংশই ঢাকা কেন্দ্রিক, অথচ ৯০ শতাংশ রোগীই থাকেন ঢাকার বাইরে। তাই হৃদরোগের উন্নত ও আধুনিক চিকিৎসা ঢাকার বাইরে পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, স্থূলতা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত লবণ ও চর্বি গ্রহণ এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা হৃদরোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারি মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে সাধারণত অধ্যাপকরা বিভাগীয় প্রধান এবং সহযোগী অধ্যাপকরা বিভাগীয় বা ইউনিট প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মেডিকেল কলেজের কার্ডিওলজি বিভাগেই প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। এতে রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা শিক্ষাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ না থাকায় অনেক মেডিকেল কলেজে হৃদরোগের উচ্চশিক্ষার কোর্স পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এফসিপিএস ও ডিপ্লোমাসহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকের পদ শূন্য রয়েছে। ফলে একদিকে বর্তমান রোগীদের চিকিৎসা সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ তৈরির পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ক্যাথল্যাব সংকট পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, মুগদা মেডিকেল কলেজ, বরিশাল মেডিকেল কলেজ ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের ক্যাথল্যাব নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। বগুড়া মেডিকেল কলেজের দুটি ক্যাথল্যাবের একটি অচল। চট্টগ্রামের একটি ক্যাথল্যাবও নষ্ট। রংপুরের ক্যাথল্যাবের যন্ত্রপাতি কখনো সচল, কখনো অচল থাকে।
একজন অধ্যাপক বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সরকারি পর্যায়ে হৃদরোগ চিকিৎসা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দক্ষ ও অভিজ্ঞ কিছু অধ্যাপককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, আবার কাউকে এমন জায়গায় পদায়ন করা হয়েছে, যেখানে তার দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ নেই। ফলে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমে সংকট তৈরি হয়েছে। তার মতে, যেসব মেডিকেল কলেজে এফসিপিএস ও ডিপ্লোমা কোর্স চালু ছিল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে সেগুলোও ব্যাহত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে অন্তত ১১ ধরনের হৃদরোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হন ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজে। রয়েছে কার্ডিওমায়োপ্যাথি ও মায়োকার্ডাইটিস, রিউম্যাটিক হার্ট ডিজিজ, ভালভুলার হার্ট ডিজিজ, হাইপারটেনসিভ হার্ট ডিজিজ, অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন, এন্ডোকার্ডাইটিস, অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজম, পালমোনারি আর্টেরিয়াল হাইপারটেনশন, লোয়ার এক্সট্রিমিটি পেরিফেরাল আর্টেরিয়াল ডিজিজ ও জন্মগত হৃদরোগ।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। এ অঞ্চলে প্রতি মিনিটে আটজন মানুষ হৃদরোগে মারা যান। এসব মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ঘটে ৭০ বছর বয়সের আগে। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৮৫ শতাংশ মানুষের রোগ নিয়ন্ত্রণে নেই। হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণে ‘সিহার্টস’ উদ্যোগের আওতায় উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ১০ কোটি মানুষকে প্রটোকলভিত্তিক চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। জুন ২০২৫ পর্যন্ত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে ৯ কোটির বেশি মানুষ এমন চিকিৎসা পাচ্ছিলেন। তামাক নিয়ন্ত্রণ, লবণ গ্রহণ কমানো এবং শিল্পজাত ট্রান্স-ফ্যাট নির্মূলেও আঞ্চলিকভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোতে অর্থায়নের ঘাটতি, প্রশিক্ষিত জনবলের সংকট, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সরঞ্জাম ও ওষুধের অপ্রতুলতা এবং তামাক ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্যের নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এখনো বড় বাধা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদরোগের চিকিৎসা শুধু বড় হাসপাতালনির্ভর হলে এই বিপুল রোগীর চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনীয় ওষুধের নিশ্চয়তা, দক্ষ জনবল তৈরি, সচল ক্যাথল্যাব এবং মেডিকেল কলেজগুলোতে পর্যাপ্ত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তামাক ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।