বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় আড়াইশ রোগী ভর্তি হচ্ছেন। রোগীর চাপ বাড়লেও সংকট কাটছে না চিকিৎসাব্যবস্থায়।
বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালেও দেখা দিয়েছে নানা সংকট। জায়গার সংকট, ধারণক্ষমতার তিনগুণের বেশি রোগী, জনবল ঘাটতির পাশাপাশি সরকারি ওষুধও পর্যাপ্ত মিলছে না বলে অভিযোগ রোগী ও স্বজনদের।
সরকারি ওষুধ বলতে একমাত্র প্যারাসিটামলনির্ভর হয়ে পড়েছে দক্ষিণাঞ্চলের বৃহৎ এই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা। চলমান সংকট দ্রুত নিরসনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও হিমশিম খাচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভাগের ছয় জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে ১১ হাজার ২১২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। সর্বশেষ ২৭ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে পটুয়াখালীর বাউফলে ৬০ বছর বয়সী আব্দুল বারেক নামে এক ব্যক্তি ডেঙ্গু জ্বরে মারা যান। এ নিয়ে বিভাগে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে।
অন্যদিকে, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলতি বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত এক হাজার ১৯২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এ সময়ে মারা গেছেন ১৪ জন। বর্তমানে হাসপাতালে ১৬৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। তবে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে কে ডেঙ্গু আক্রান্ত আর কে সাধারণ রোগী, তা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সোমবার দুপুরে সরেজমিনে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগ ঘুরে দেখা যায়, রোগীর ভিড়ে ওয়ার্ডগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কেউ বেডে, আবার কেউ মেঝেতে ফোম বা চাদর বিছিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শুধু ওয়ার্ডের ভেতরেই নয়, হাসপাতালের বারান্দাতেও রোগী ও স্বজনদের ভিড়।
ওয়ার্ডগুলোর মধ্যেই ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা জায়গা রাখা হয়েছে। কিন্তু জায়গা সংকটের কারণে সেখানেও সাধারণ রোগীদের ভর্তি রাখা হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের শয্যায় মশারি টাঙানো নেই। ওয়ার্ড থেকে মশারি দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন রোগীর স্বজনরা।
হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিট-৩-এ চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর স্বজন গৌরনদীর কৃষ্ণা মজুমদার বলেন, ‘গত পাঁচদিন ধরে ডেঙ্গু আক্রান্ত স্বামীকে নিয়ে এই হাসপাতালে আছি। প্রথমে এসে ফ্লোরে থাকতে হয়েছে। পরে বেড পেয়েছি, কিন্তু মশারি পাইনি। এখানে চিকিৎসা পাই, কিন্তু একমাত্র নাপা ছাড়া কোনো ওষুধ পাই না। সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়।’
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহ জালাল বলেন, ‘গত চারদিন ধরে এই হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী নিয়ে আছি। কিন্তু এখানে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। সব রোগী এক জায়গায় রাখা হচ্ছে। এতে সাধারণ রোগীরাও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ওয়ার্ডের মধ্যে রোগীর এত চাপ যে হাঁটার জায়গা পর্যন্ত নেই। তার ওপর এই গরমে ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক ফ্যানের ব্যবস্থাও নেই। গরমে রোগী আরও অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ পাই না। সব বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে।’
চিকিৎসাধীন রোগী গৌরনদীর মো. জসিম হাওলাদার বলেন, ‘রোববার বেলা ১১টার দিকে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। কিন্তু সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত কোনো চিকিৎসক আসেননি। পরে একজন নার্স গ্যাস্ট্রিকের ইনজেকশন দিতে আসেন। সারাদিনে চিকিৎসক না আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে চলে যান। এই হাসপাতাল থেকে এখন পর্যন্ত নাপা আর গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ ছাড়া কিছুই পাইনি।’
তবে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ডেঙ্গু রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন মেডিসিন ইউনিটের ইনচার্জ ও সিনিয়র স্টাফ নার্স সালমা সুলতানা।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এই ইউনিটটি ৪৮ শয্যার। সেখানে ৭৫ শয্যার ব্যবস্থা করে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এই সংখ্যক শয্যার বিপরীতে বর্তমানে ১৫২ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৯ জন ডেঙ্গু রোগী।’
তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীর চাপ দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু জায়গা বাড়ছে না। এ কারণে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ওয়ার্ডের মধ্যে আলাদা ব্যবস্থা করা হলেও সেখানে বাধ্য হয়ে সাধারণ রোগীদেরও রাখতে হচ্ছে। তার ওপর আমাদের জনবলের অনেক সংকট। দেড় শতাধিক রোগীর জন্য দিনে তিনজন, বিকেলে দুইজন এবং রাতে দুজন করে নার্স দায়িত্ব পালন করেন। এই সংখ্যক নার্স দিয়ে সব রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে বেগ পেতে হচ্ছে। তারপরও আমরা সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’
সালমা সুলতানা আরও বলেন, ‘আমরা যেভাবে ওষুধ সরবরাহ পাই, সেভাবেই ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। ৪৮ শয্যার ওষুধ দিয়ে প্রায় দেড়শ রোগীকে ম্যানেজ করতে হয়। যে কারণে ওষুধ কমবেশি হতে পারে। আমাদের বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিজিটররা। একজন রোগীর সঙ্গে তিন থেকে পাঁচজন পর্যন্ত ভিজিটর থাকেন। এ কারণে বিশৃঙ্খলা বেশি হয়ে যায়।’
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ও মিডিয়া অফিসার ডা. রেজওয়ানুল ইসলাম রেজা বলেন, ‘বর্তমানে ডেঙ্গু পরিস্থিতি কিছুটা উদ্বেগজনক। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি থাকতে পারে। তবে রোগী বাড়লেও আমাদের হাসপাতালে জায়গা বাড়েনি। যে কারণে সাধারণ রোগীদের সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। তবে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা ডেঙ্গু ওয়ার্ড আলাদা করার উদ্যোগ নিয়েছি। সাবেক মেডিসিন ভবনের ডেন্টাল ওয়ার্ডে ডেঙ্গু ওয়ার্ড স্থানান্তর করা হবে। সেই প্রস্তুতি চলছে। শিগগিরই আলাদা ওয়ার্ডের সমস্যাটি সমাধান হবে।’
তিনি বলেন, ‘শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ৫০০ শয্যার অবকাঠামো। আর কাগজে-কলমে শয্যা সংখ্যা এক হাজার। অথচ প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন হাজার পর্যন্ত রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সোমবার সকাল পর্যন্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৮০৪ জন। এর মধ্যে মেডিসিন বিভাগের ছয়টি ইউনিটে রোগীর সংখ্যা ৮২৪ জন। তাদের মধ্যে ১৬৫ জন ডেঙ্গু রোগী। এত সংখ্যক রোগীর চাপে হয়তো ওষুধের কিছুটা সংকট হতে পারে।’
ডা. রেজা আরও বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এক হাজার শয্যার চিকিৎসকের অনুকূলে তিন হাজার রোগী। আমাদের এখনো চিকিৎসকের ৩০ শতাংশ পদ শূন্য। নার্স যে সংখ্যক প্রয়োজন, তাও নেই। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমরা চিকিৎসাসেবার সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’