Image description

সাভারের আশুলিয়ার খেজুরবাগান এলাকায় গার্মেন্টস কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের জন্য বরাদ্দ সরকারি জমি দখল করে দোকানপাট ও পরিবহন পার্কিংয়ের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। সেখানে দোকান বসিয়ে মাসে ৩ হাজার ৫০০ টাকা করে এবং পার্কিংয়ে রাখা প্রতিটি পরিবহন থেকে দৈনিক ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ওই জমিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মোটরচালক দলের একটি সাইনবোর্ডও টাঙানো হয়েছে।

 

অভিযুক্ত সেলিম মোল্লা নিজেকে জাতীয়তাবাদী মোটরচালক দলের আশুলিয়া ইউনিয়ন শাখার আহ্বায়ক দাবি করেন। তার দখল ও প্রভাবের কারণে হোস্টেল কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তাকর্মীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ।

 

সরকারি রেজিস্ট্রি ও খতিয়ান বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানাধীন বড় আশুলিয়া মৌজায় ২০২৫-৬০০০২২ নম্বর খতিয়ানের অধীন ৭০৮১, ৭৩০৭ ও ৭৩০৮ দাগের জমি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নামে নিবন্ধিত। ওই খতিয়ানে মোট ৯৭ শতাংশ জমি রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নিয়মিত খাজনাও পরিশোধ করা হয়েছে।

 

হোস্টেল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, কর্মজীবী নারীদের আবাসনের সুবিধার্থে হোস্টেল সম্প্রসারণের জন্য ২০১২ সালে ওই জমির ৫৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেলিম মোল্লা ও তার সহযোগীরা জমিটি দখল করেন বলে অভিযোগ।

 

সরেজমিনে ওই জমিতে একটি ‘আইনগত বিজ্ঞপ্তি’ লেখা সাইনবোর্ড দেখা যায়। এতে বলা হয়েছে, মো. সেলিম মোল্লা ও মো. আলিম মোল্লা গং বাদী হয়ে মামলা করলে ঢাকার দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালত ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল সরকারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেন। তবে হোস্টেল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ওই মামলা ও আদালতের আদেশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সরকারি জমিতে রাতারাতি দোকানপাট ও পরিবহন পার্কিং গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মোটরচালক দলের সাইনবোর্ডও টাঙানো হয়েছে।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিটি দোকান থেকে মাসে ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং পার্কিংয়ে রাখা প্রতিটি পরিবহন থেকে দৈনিক ২০০ থেকে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়। এ নিয়ে প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না অনেকে। হোস্টেলের নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মচারীদের থাকার ঘর থেকেও তাদের জোর করে বের করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

হোস্টেল কর্তৃপক্ষ বলছে, দখল করা জায়গার সামনে দোকান বসায় কম খরচে হোস্টেলে থাকা অনেক নারীও চলে গেছেন। সন্ধ্যার পর সেখানে হকারদের জটলা ও উচ্চ শব্দে সাউন্ড সিস্টেমে গান বাজানোর কারণে হোস্টেলের পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে।

 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সেলিম মোল্লার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। সরকারি জমিতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা অবস্থায় কীভাবে দোকানপাট ও রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড স্থাপন করা হলো, এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, আপনারা জজ সাহেবের লগে কথা কন না কেন? আপনার সমস্যা থাকলে আপনি জজ সাহেবের লগে কথা কন। আমারে করবার কইছে, আমি করতে পারমু। আমারে কেউ ডিস্টার্ব যাতে না করে, এইজন্য আমার আইনজীবীরা কোর্ট থেকে সাইনবোর্ড লাগায় দিছে।

 

সরকারি জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে সেলিম মোল্লা বলেন, সড়কের পাশের প্রায় ৫০ শতাংশ জমি তাদের পৈতৃক সম্পত্তি। এর পক্ষে খাজনা-খারিজের কাগজপত্র রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে তিনি ওই কাগজপত্র দেখাতে রাজি হননি।

 

সরকারি জমিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মোটরচালক দলের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে কার্যালয় চালানো এবং চাঁদা তোলার বিষয়ে জানতে চাইলে সেলিম মোল্লা দলীয় নেতাদের অনুমতির কথা বলেন। তিনি বলেন, উনারা আমারে অনুমতি দিছে। মোটরচালক দলের সেলিম রেজা বাবু ভাই আছে, উনার লগে কথা কন, অনুমতি উনি দিছে। থানা কমিটির সভাপতি নুরুল ইসলাম ভাইয়ের লগেও কথা বলতে পারেন।

 

ফোনালাপের শেষ পর্যায়ে সাংবাদিকেরা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় দিলে সেলিম মোল্লা আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। পরে সাংবাদিকদের নাম ও গণমাধ্যমের পরিচয় একাধিকবার জানতে চান এবং তা লিখে রাখেন।

 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মোটরচালক দল আশুলিয়া থানার সভাপতি নূর হোসেন ভূঁইয়া বলেন, দলের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে মনগড়া কমিটি গঠন করে তারা এসব অপকর্ম ও সরকারি জায়গা দখলের চেষ্টা করছিলেন। খবর পাওয়ার পর তিনি আশুলিয়া ইউনিয়ন কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছেন।

 

নূর হোসেন ভূঁইয়া বলেন, দলের নাম ভাঙিয়ে যারা জায়গা দখল বা ঝামেলা করছে, তারা এখন আর পদে নেই এবং দল থেকেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে বা সরকারি জায়গা দখল করে অফিস বানানোর কোনো সুযোগ নেই। তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।

 

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মোটরচালক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সেলিম রেজা বাবুও বলেন, সংগঠনের নাম ব্যবহার করে সরকারি জমি দখল, চাঁদাবাজি বা স্ট্যান্ড দখলের কোনো সুযোগ নেই। তার ভাষ্য, ২০০৬ সাল থেকেই সংগঠনের নীতি অনুযায়ী কোনো ‘জিপি’ বা চাঁদা তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

 

সেলিম রেজা বাবু বলেন, সংগঠনকে ব্যবহার করে এমন অপকর্ম বা দখলদারিত্বের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে গত ২৪ সেপ্টেম্বর আশুলিয়া ইউনিয়ন শাখা কমিটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দখলদারিত্বের অভিযোগ ওঠায় ঢাকা জেলা কমিটির সিদ্ধান্তে ওই কমিটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

 

গার্মেন্টস কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহিদা আক্তার মুঠোফোনে বলেন, জমিটি সরকারি। ৫ আগস্টের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা জমিটি নিজেদের দাবি করে মামলা করেছেন এবং অবৈধভাবে দখল বজায় রেখেছেন। সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মামলা পরিচালনা করে জমি উদ্ধারের চেষ্টা করছে।

 

হোস্টেলে থাকা কর্মজীবী নারী ও শিক্ষার্থীদের সমস্যার বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কর্মকর্তা শাহানা আক্তার বলেন, সন্ধ্যার পর দখল করা জায়গায় হকারদের জটলা তৈরি হয়। এ ছাড়া উচ্চ শব্দে সাউন্ড সিস্টেমে গান বাজানো হয়। এতে হোস্টেলে থাকা অনেক শ্রমজীবী নারী, যাঁরা পড়াশোনা করেন, রাতে পড়াশোনা করতে সমস্যায় পড়েন।

 

শাহানা আক্তার বলেন, হোস্টেল-১-এর জন্য ৪২ শতাংশ এবং হোস্টেল-২ সম্প্রসারণের জন্য ৫৫ শতাংশ জমি সরকার বরাদ্দ দিয়েছে। জায়গাটি সম্পূর্ণ সরকারি। ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত এটি হোস্টেল কর্তৃপক্ষের অধীনেই ছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পর তাঁরা জমিটি দখল করেন, পরে মামলা করেন।

 

তিনি আরও বলেন, রাতে হকারদের আনাগোনা ও সাউন্ড সিস্টেমের বিকট শব্দের কারণে হোস্টেলের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এতে হোস্টেলে থাকা নারীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে।

 

গত ২২ আগস্ট আশুলিয়ায় চাঁদাবাজি ও ভূমিদখলের অভিযোগে সেলিম মোল্লাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

 

সাভারের আশুলিয়ার খেজুরবাগানে নির্মিত সরকারি গার্মেন্টস কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের শেষ দিকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহায়ণ তহবিলের অর্থায়নে এবং মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ১২ তলা ভবনটির নির্মাণকাজ করা হয়। প্রায় ২৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটির কাজ শেষ হয় ২০১৬ সালের শেষ দিকে। পরে ২০১৭ সালের মাঝামাঝি পোশাকশ্রমিক ও কর্মজীবী নারীদের জন্য আসন বরাদ্দ এবং আনুষ্ঠানিক আবাসনসেবা চালু করা হয়।