Image description

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক ঐতিহাসিক ও ফলপ্রসূ সফর সম্পন্ন করে দেশে ফিরছেন। এই সফরে তিনি কেবল বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক রূপরেখা তুলে ধরেননি, বরং একের পর এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি, প্রতিশ্রুতি ও সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন। ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারী, মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ নেতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাঁর এই তৎপরতা বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান পুনরুদ্ধারের এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। দেশে ফেরার আগেই তিনি ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের জন্য একাধিক অর্জন নিয়ে এসেছেন, যা আগামী দিনে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কূটনৈতিক শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

ম্যানহাটনের জেপি মরগানের সদর দপ্তর ২৭০ পার্ক অ্যাভিনিউয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়িক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্ব বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, “বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।” তিনি ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করেন যে, বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার একটি স্থায়ী ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি ঘোষণা করেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করা হবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রধান উৎপাদন, বিনিয়োগ ও সেবামূলক হাব হিসেবে গড়ে তোলা হবে।

বিদেশি পুঁজির নিরাপত্তা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করার বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জানান, বিনিয়োগের মূলধন ও অর্জিত লভ্যাংশ যেন সহজে নিজ দেশে ফেরত নেওয়া যায়, তার আইনি ও নীতিগত নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। এছাড়া সরকারের সকল অর্থনৈতিক নীতিমালা ও রেগুলেশন অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং অনুমানযোগ্য হবে। বৈঠকে তিনি আরও বলেন, নীতির মাধ্যমে ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে তার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে আস্থা তৈরি করাই সরকারের দায়িত্ব। সরকার স্বল্পমেয়াদি লেনদেন নয়, উভয় পক্ষের জন্য মূল্য সৃষ্টি করবে এমন দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব চায়। 

ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে এমন একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে চায় সরকার, যেখান থেকে বিনিয়োগকারীরা বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন। উল্লেখ্য, এই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যারা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবেন বলে জানানো হয়েছে।

অধিবেশনের সাইডলাইনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। নিউইয়র্কে কুয়েতের স্থায়ী মিশনে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার করার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে দুই দেশের শ্রমশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় হয়।

সউদী আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান বিন আবদুল্লাহ আল সৌদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর ও বহুমাত্রিক করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। জাতিসংঘ সদরদপ্তরের ইউএন বাইল্যাটেরাল বুথে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়াদি নিয়ে মতবিনিময় করা হয়। সউদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা-রিয়াদ সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে সউদী আরবের আগ্রহের কথা তুলে ধরেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আমিরাতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও বিনিয়োগমুখী করতে আগ্রহী। এছাড়া, ইউএই-তে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের বিশেষ যতœ ও কল্যাণের ব্যাপারে তারা ইতিবাচক অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা নিরসনে আলোচনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ যখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের পণ্যবাহী জাহাজ ও কনটেইনারের নিরাপদ চলাচলের জন্য ইরানের সহযোগিতা চেয়েছে, তখন ইরানের পক্ষ থেকেও দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বজায় রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মূল মঞ্চে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন, তখন তা মুসলিম বিশ্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের মাঝে বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। এই কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান পুনরুদ্ধারের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উল্লেখ্য, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধারে দৃশ্যমান কোনো সাফল্য আসেনি। ফলে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল এবং নতুন বিনিয়োগের গ্রাফ শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর সেই ক্ষতিপূরণের পথ তৈরি করেছে।

এই সফরের সাফল্য নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মেজবাহ-উল-আজম সওদাগর এই সফরকে দেশের জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশে জুলাই-পরবর্তী ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশনের পর জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গে হওয়া দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলো বাংলাদেশের পরিবর্তিত এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ও কূটনৈতিক তৎপরতাকে ‘সার্বজনীন’ বলে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, সবার আগে নিজের দেশকে ধারণ করেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বমঞ্চে ও মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সামনে বাংলাদেশের স্বার্থ ও রূপরেখা তুলে ধরেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন যে বিশ্বমঞ্চে ফিলিস্তিন সংকটের যৌক্তিক সমাধান দাবি করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী ও ফলপ্রসূ পদক্ষেপ ছিল। 

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্বমঞ্চে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারের পক্ষে যে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন, তা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম উম্মাহ এবং বৈশ্বিক শান্তি কাঠামোর প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতিকে পুনরুল্লেখ করে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক জোরদার করার মাধ্যমে বাংলাদেশের শ্রম বাজার, রেমিট্যান্স খাত ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।