Image description

কিশোর গ্যাং এখন ভয়াবহ আতঙ্কের নাম, যা উদ্বেগজনক সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কিশোর গ্যাং শুধু ব্যক্তি বা পরিবারের জন্য নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ২০১৪ সালের প্রার্থী ও ভোটারবিহীন নির্বাচনের সময় বিরোধী দলের লাগাতার অবরোধের মুখে ভোটকেন্দ্রে যাতে বিশৃঙ্খলা না হয় সে লক্ষ্যে ঢাকার বস্তির কম বয়সী শিশুদের ভোটকেন্দ্রের আশপাশে প্রহরায় বসানো হয়। তারা পুলিশের সামনেই ত্রাস সৃষ্টি করে আন্দোলনরত বিএনপি-জামায়াতকে প্রতিহত করে। নির্বাচনের পর ওই কিশোররা অপরাধে জড়িয়ে পড়লে পুলিশ নাম দেয় কিশোর গ্যাং। এই কিশোর গ্যাংয়ের উৎপত্তিস্থল রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু হলেও এটা এখন বিস্তৃত দেশজুড়ে। ঢাকাসহ সারা দেশেই কিশোর গ্যাং এখন সমাজের বিষফোঁড়া। এরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায়। নিজ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে এক গ্রুপ অপর গ্রুপের সঙ্গে ভয়ঙ্কর সংঘাতে লিপ্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র হাতে মহড়া, হামলা-মারধর, চুরি-ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, খুন, দখল, হুমকি, ইভটিজিং ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে গ্যাংয়ের সদস্যরা। খুনসহ বিভিন্ন অপরাধে ভাড়াটে হিসেবেও কাজ করে এরা। এসব অপরাধমূলক কর্মকা- করতে গিয়ে এলাকায় এলাকায় সৃষ্টি করেছে আতঙ্ক।

কিশোর গ্যাং বিস্তারের রাজনৈতিক প্রভাব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী প্রফেসর ড. তৌহিদুল হক বলেন, আমাদের দেশে রাজনীতিতে অপরাধীদের প্রয়োজন আছে। আবার অপরাধীদেরও রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন। এ দুই শক্তি যখন যতটুকু প্রয়োজন, এটা বিনিময় করে। আবার যখন ক্ষমতার পালাবদল হয়, তখন অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণের হাতও বদল হয়। রাজনৈতিক সংযোগের কারণে স্থায়ী রূপ পেয়েছে অপরাধী বা গ্যাং গ্রুপ। যারা তাদের ব্যবহার করে গ্যাং গড়ে তুলছে ও অপরাধে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে, তাদেরও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকার ১৩ বছর বয়সী একমাত্র পুত্র স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম সম্প্রতি বন্ধুদের হাতে খুন হন। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিমের এ মর্মান্তিক হত্যাকা- জাতির বিবেক নাড়া দিয়েছে। যে ঘটনা এখন সারাদেশে আলোচিত। অপ্রতিম হত্যার পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা-নিষ্ঠুরতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে সব থেকে আশ্চর্যের বিষয় অপ্রতিমকে যারা খুন করেছে তারা আবার ভুক্তভোগী পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ নিখোঁজ অপ্রতিমের সন্ধান চেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দিয়েছে। অপ্রতিমের খুনে অভিযুক্ত বন্ধু তুহিন, ফাহাদ, কামরুল ও সিয়ামদের মধ্যে একমাত্র তুহিনের বয়স ১৯। বাকিদের বয়স ১৫ থেকে ১৭-এর কোঠায়। একজন কিশোর বন্ধুকে হত্যার পরও জড়িতদের এমন স্বাভাবিক আচরণে রীতিমতো হতবিহ্বল অপরাধ ও মনোজ্ঞিানীরাও। চাঞ্চল্যকর এ খুনের তদন্তকারীদের ভাষ্য, প্রধান অভিযুক্ত তুহিন একটা কিশোর গ্যাং গড়ার চেষ্টা করছিল। অপ্রতিমকেও সে দলে টানতে চেয়েছিল। আর টিকটক ভিডিও বানানোর কথা বলে সে অন্য কিশোরদের জড়ো করত।

পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বর্তমানে মোট অপরাধের ৪০ শতাংশের সঙ্গে কিশোর অপরাধীরা জড়িত। তাদের অপরাধ ঠেকাতে রীতিমতো নাজেহাল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যার পর কিশোর গ্যাং গ্রেফতারে অভিযান চালায়। প্রায় ৬ শতাধিক অভিযুক্তকে আটক করা হয়। বেশিরভাগ মুচলেকায় ছেড়ে দেয়া হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় থানার ভেতরেই ভুয়া ভুয়া সেøাগান তুলে কয়েক কিশোর পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। তবে থানা ও জেলা পুলিশ হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এদিকে খোদ রাজধানীতেই গতকাল আলোচিত মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুর আর মোহাম্মদপুরে প্লট দখলের মতো ঘটনায় কিশোরদের সম্পৃক্ততা পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

রাজধানীতে প্রতি মাসে গড়ে ২০টি খুন হয়। এদের মধ্যে অধিকাংশ হত্যার পেছনে কিশোর অপরাধীরা জড়িত বলে প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। একেকটি আলোচিত ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কিশোর অপরাধী গ্রেফতার হয় ঠিকই কিন্তু জামিন পেয়ে এ অপরাধীরা যেন আরো বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। নিজের গ্রেফতার হবার কারণে তারা প্রতিশোধের নেশায় মেতে ওঠে। যে কারণে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতিতে লাগাম টানা যায়নি। বরং দিন দিন বেড়েছে গ্যাং ও গ্যাংয়ের সদস্যসংখ্যা। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত আয়ের হাতছানি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্যাং সংস্কৃতির প্রচার, আইন প্রয়োগের দুর্বলতাসহ বিভিন্ন কারণে কিশোরেরা অপরাধে জড়াচ্ছে।

পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন ইনকিলাবকে বলেন, সারাদেশে কতগুলো কিশোর গ্যাং রয়েছে, এদের সদস্যসংখ্যা এবং কতজন গ্রেফতার হয়েছে সে বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য যাচাই চলছে। তবে পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যানের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে রাজধানীসহ সারা দেশে ১২৭টি কিশোর গ্যাং ছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কয়েক দিন পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার সুযোগে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা বেড়ে ২৩৭টি হয়। কোনো কোনো সংস্থার মতে, বর্তমানে এই সংখ্যা তিন শতাধিক। সারা দেশে এসব গ্যাংয়ের অন্তত ৫০ হাজার সক্রিয় সদস্য বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে তাদের অপরাধের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিচ্ছে। কিশোর গ্যাং বা অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে কিশোরদের ইতিবাচক কর্মকা-ে যুক্ত করার উদ্যোগও প্রয়োজন।

সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে ঢাকা মহানগরে। এখানে ১৫৯টি গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত এক হাজার ৮১২ জন। ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগরে-৯৮টি। এছাড়া সিলেট মহানগরে ১৫টি, রাজশাহী ও গাজীপুর মহানগরে ১৩টি করে এবং খুলনা মহানগরে সাতটি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। অন্যান্য মহানগর ও জেলায় রয়েছে আরো ৮১টি কিশোর গ্যাং। অনেক কিশোরের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার শুরু হয় আড্ডা, মাদক সেবন, ছোটখাটো চুরি কিংবা মারামারি দিয়ে। পরে সংঘবদ্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা তৈরি হয় এবং হাতে আসে দেশীয় অস্ত্র ও মাদক।

স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) পরিচালক (আইন ও গণমাধ্যম শাখা) উইং কমান্ডার এ জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী ইনকিলাবকে বলেন, বর্তমানে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায় ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকায় ১৫৯টি এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত ২০৫২ জনকে আইনের আওয়তায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪৪ জনকে সংশোধনাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর, আদাবর, বসিলা, মিরপুর ও পল্লবী এলাকায় এ ধরনের গ্রুপের তৎপরতা বেশি। এছাড়া উত্তরা ও যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীর আরো কিছু এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে। ডিএমপির একটি সাম্প্রতিক তালিকা অনুযায়ী, মিরপুর বিভাগে ৩২টি এবং তেজগাঁও বিভাগে ২৬টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য রয়েছে। থানা হিসেবে পল্লবীতে ১৪টি এবং মোহাম্মদপুরে ১৬টি গ্যাংয়ের তথ্য রয়েছে।

ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে মোহাম্মদপুর-আদাবরে। গত এপ্রিলে মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের সদস্যরা প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে অ্যালেক্স ইমন গ্রুপের লিডার ইমনকে। এই কিশোর গ্যাং লিডারকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। কুপিয়ে তাঁর হাত-পা শরীর থেকে আলাদা করে ফেলে সন্ত্রাসীরা। পুলিশ বলছে, নিহত অ্যালেক্স ইমনের বিরুদ্ধে জোড়া খুনসহ ১৮টি মামলা ছিল। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে ইমনের প্রতিপক্ষ আরমান-শাহরুখ গ্যাংয়ের সদস্যরা। কিশোর গ্যাংয়ের নৃশংসতা আঁৎকে দিচ্ছে মানুষকে। এসব এলাকায় অভিযান চালিয়েও লাগাম টানতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ বলছে, গ্রেফতারের কয়েক মাস পরই অপরাধীরা জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার অপরাধে জড়াচ্ছে।

মোহাম্মদপুর, আদাবর ও হাজারীবাগ এলাকার দেয়ালে দেয়ালে এখনো রঙ করা কালিতে লেখা রয়েছে কিশোর গ্রুপগুলোর নাম। আদাবর মোহাম্মদপুরে রয়েছে লও ঠেলা, লেভেল হাই, পাটালি গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ, অ্যালেক্স গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, লও ঠেলা গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, নবী গ্রুপ, ল্যাংড়া নুরু, কিং শাওন গ্রুপ। ধানমন্ডি ও সংলগ্ন এলাকায় ব্রাদারহুড, তৌসিফ গ্রুপ। তেজগাঁও ও মগবাজার এলাকায় মাঈনুদ্দিন গ্যাং। বংশাল ও পুরান ঢাকায় জুম্মন গ্যাং। মুগদা ও খিলগাঁও এলাকায় চান জাদু, ডেভিড কিং ফল পার্টি, ভলিয়ম টু, ভান্ডারি। উত্তরা ও মিরপুরে গাংচিল, ম্যা´ পলু, বাট্টু বাহিনী, পটেটো, কব্জি কাটা গ্রুপ, লাল বাহিনী, খিলগাঁও থানা এলাকার গ্রুপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ৯৯৯ গ্রুপ, কেজি ১৯, ০০১ টিকটক গ্রুপ, ০০৭ টিকটক গ্রুপ, আলিফ গ্রুপ, তারেক গ্রুপ উল্লেখযোগ্য।

মোহাম্মদপুর থানার ওসি মোহাম্মদ আবদুল হালিম ইনকিলাকে বলেন, সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের মাহি গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড জয়কে গ্রেফতার করি। তাকে বিভিন্নভাবে আমি নিজেই দীর্ঘসময় জিজ্ঞাসাবাদ করি। জয়ের ভাষ্যমতে, এক সময়ে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী ছিল সে। কিন্তু একবার গ্রেফতার হয়ে নিজেকে শুধরে নেয়ার চেষ্টা করেন। ভালো হতে চেয়ে এড়িয়ে চলতে শুরু করেন পুরোনো সাঙ্গপাঙ্গ সন্ত্রাসীদের। আর তখনই অব্যাহত হুমকি আসতে থাকে। তার মতো অনেকেই সন্ত্রাসী পথ পরিহার করতে চাইলেও পারছেন না। বাধ্য হয়েই গডফাদারদের নির্দেশ মানতে হচ্ছে। পুলিশের স্থানীয় এ কর্মকর্তা বলেন, এলাকাটিতে নতুন নতুন হাউজিং কোম্পানি গড়ে উঠেছে। জমি রক্ষা কিংবা দখলের স্বার্থে হাউজিং কোম্পানিগুলো অর্থ-অস্ত্র আর শক্তির যোগান দিয়ে কিশোর অপরাধীদের পুষে রাখছে।

এছাড়া রায়েরবাজার এলাকাটি মাদকের হাট হিসেবে পরিচিত। জেনেভা ক্যাম্পেও অবৈধ মাদকের ব্যবসা পুরোনো। মাদকের গডফাদাররা তাদের অবৈধ ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সন্ত্রাসী আশ্রয়-প্রশয় দিচ্ছে। তিনি আরো বলেন, এলাকায় প্রতিদিনই অভিযান চালানো হচ্ছে। গড়ে ২০ জনের বেশি গ্রেফতার হচ্ছে। তার মতে, শুধু ছোট অপরাধীদের গ্রেফতার করলেই এ সমস্যার সমাধান হবে না। মূল জায়গায় হাত দিতে হবে। পাশাপাশি সকলের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। জানতে চাইলে আদাবর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম জাহাঙ্গীর বলেন, তার এলাকায় দেড় শতাধিক কিশোর অপরাধী ছিল। ডিএমপি পুলিশ কমিশনার ঘোষণা দিয়েছেন, কোনো কিশোর গ্যাং থাকবে না। এর পরই বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অব্যাহত অভিযানে শতাধিক সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন যারা আছে, তারা এলাকায় নেই। কেরানীগঞ্জসহ আশপাশ এলাকায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের ধরতেও অভিযান চলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন প্রয়োগ বা সংশোধনমূলক শাস্তি দিয়েই কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব নয়। এজন্য দরকার চতুর্মুখী পরিকল্পনা। প্রথমে দরকার পারিবারিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক চর্চা ও জোরদার। কিশোর গ্যাং সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে দরকার প্রান্তিক পরিবারগুলোকে আর্থসামাজিক সহায়তা, সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দমন। এছাড়া কিশোরদের বয়স ও পরিস্থিতি বিবেচনায় কাউন্সেলিং, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, পরিবারভিত্তিক তদারকি ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই তাদের অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

জানতে চাইলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম রেজাউল ফিরোজ রিন্টু ইনকিলাবকে বলেন, কিশোর অপরাধ সৃষ্টিতে পরিবার বা অভিভাবকদের উদাসীনতাই মূল কারণ। সন্তানের দিকে মনিটরিংয়ের দুর্বলতাকে পুঁজি করে কিশোররা বিপথে পা বাড়ায়। শাস্তির মাত্রা লঘু হওয়ায় কিশোররা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। শাস্তির সীমা বাড়াতে আইন বিভাগকে পদক্ষেপ নিতে বা অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় রেখে আইনের সংস্কার প্রয়োজন। এছাড়া মাদকের সহজলভ্যতা আরেকটি বড় বিষয়। ১৮ বছরের নিচে স্মার্ট ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রাষ্ট্রীয় আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। তিনি আরো বলেন, মাদকাসক্তি, দারিদ্র্য, নি¤œমানের জীবনযাত্রা, পারিবারিক সমস্যা, হতাশা, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পর্যাপ্ত শিক্ষার অভাব, ধর্মীয় অনুশাসনের অভাবÑ এ কারণগুলোই মূলত কিশোর গ্যাংগুলো গড়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী।

ঢাকা আহছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরের সিনিয়র মনোবিজ্ঞানী রাখী গাঙ্গুলী ইনকিলাবকে বলেন, কিশোর গ্যাং বর্তমানে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি পরিবার, শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। পারিবারিক সম্পর্কের দুর্বলতা, বন্ধুমহলের চাপ, পরিচয় ও গ্রহণযোগ্যতার সংকট, সহিংসতার অভিজ্ঞতা, মাদক, স্কুল থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং ইতিবাচক সুযোগের অভাব বিভিন্ন কারণ একত্রিত হয়ে একজন কিশোরকে ধীরে ধীরে অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর দিকে ঠেলে দিতে পারে। পরিবার, স্কুল বা সমাজে যদি একজন কিশোর নিজের ইতিবাচক পরিচয় তৈরি করতে না পারে, তাহলে সে অন্য কোথাও সেই পরিচয় খুঁজতে পারে। ফলে এটা ঠেকাতে প্রয়োজন পারিবারিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি, মানসিক স্বাস্থ্যসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ।