দেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করতে জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে এ মহাপরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা তৈরিতে ট্যুরিজম বোর্ডকে সহায়তা করছে। এ ক্ষেত্রে ইকো, কমিউনিটিভিত্তিক, ওয়াটার ও গ্যাস্ট্রোনমি ট্যুরিজমের ওপর বেশ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর আগে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আমলে এ মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন কারণে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ট্যুরিজম বোর্ড ডিসেম্বরে পর্যটন খাতের বিকাশে ‘বাংলাদেশ ফেস্টিভ্যাল’ নামে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। এর আগেই জাতীয় পর্যটন পরিষদে উপস্থাপনের জন্য পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রস্তুত করা হচ্ছে। ট্যুরিজম বোর্ড অক্টোবরের ৩১ তারিখ বা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চূড়ান্ত পর্যটন মহাপরিকল্পনাটি বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী গতকাল আগারগাঁওয়ে তাঁর কার্যালয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘পর্যটন মহাপরিকল্পনা বর্তমানে পর্যালোচনার শেষ পর্যায়ে আছে। আশা করছি অক্টোবরে পর্যালোচনা কার্যক্রম শেষ হবে। এরপর বিভিন্ন পর্যায়ে এর অনুমোদনের বিষয় আছে। পর্যটন বোর্ডের অনুমোদনের পর এটি মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন হয়ে আসবে। পরে ন্যাশনাল ট্যুরিজম কাউন্সিলে অনুমোদনের পর চূড়ান্ত হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য মন্ত্রণালয় যাওয়া পর্যন্ত প্রক্রিয়াগুলো নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার। আসছে ডিসেম্বরের মধ্যেই আমরা পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রকাশ করতে পারব বলে আশা করছি।’
কীভাবে চূড়ান্ত হচ্ছে মহাপরিকল্পনা : ট্যুরিজম বোর্ডের উপপরিচালক (পরিসংখ্যান, গবেষণা ও পরিকল্পনা) মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘আইএলও জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে ট্যুরিজম বোর্ডকে কারিগরি ও অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই। মূলত আগে তৈরি করা পর্যটন মহাপরিকল্পনার খসড়া সংশোধন করা হচ্ছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ সংশোধন হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ইকো, কমিউনিটিভিত্তিক, ওয়াটার ও গ্যাস্ট্রোনমি ট্যুরিজমের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এটি প্রণয়নে দেশি ও বিদেশি আট সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে আছেন দুজন বিদেশি ও ছয়জন দেশি। এ টিমের সবাই বেশ হাই প্রোফাইলের।’
কী থাকছে মহাপরিকল্পনায় : এবার পর্যটনের মাস্টারপ্ল্যানে ইকো ট্যুরিজমকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হবে। পর্যটনের বেশির ভাগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে ইকো ট্যুরিজম ঘিরে। পর্যটনে তথ্যের ঘাটতি মেটাতে পর্যটন স্যাটেলাইট হিসাব (টিএসএ) তৈরির কাজও চলছে। এজন্য ৭৩টি দেশের উপাত্ত জরিপ করা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব বিদেশি বাংলাদেশে আসেন এমন ৭৩ জনকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে। তাঁদের মূল্যায়নও মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পর্যটনের মহাপরিকল্পনায় বিদেশি বিনিয়োগের জন্য একটি আলাদা চ্যাপ্টার থাকবে। এ ক্ষেত্রে বিডা ও এনবিআরের সঙ্গে মিলে পর্যটন মহাপরিকল্পনার কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। পর্যটন মহাপরিকল্পনায় ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন স্পট অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। চূড়ান্ত মহাপরিকল্পনায় এর কিছু পরিমার্জন হয়ে তা কমবেশি হতে পারে। আট সদস্যের কমিটি এ সংখ্যা চূড়ান্ত করবে। লালবাগ কেল্লা থেকে শুরু করে আহসান মঞ্জিল, সোমপুর মহাবিহার, ইনানী সমুদ্রসৈকতসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ট্যুরিস্ট স্পটগুলোই এ তালিকায় আছে। মাজারের মতো ধর্মীয় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত আছে।
সরকারের পাঁচ বছরের নির্বাচনি ইশতেহারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী এ স্পটগুলোর উন্নয়নে কাজ করা হবে। ইকোট্যুরিজমের ক্ষেত্রে সুন্দরবন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো ইকোবেজড এলাকার পর্যটনের বিকাশ ঘটানো হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবেশের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় এবং পর্যটন ধারণক্ষমতা যাতে অতিরিক্ত না হয় সে ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হবে। গ্যাস্ট্রোনমি ট্যুরিজমের ক্ষেত্রে দেশের যে এলাকার খাবার জনপ্রিয়, সেখানে পর্যটন প্রসারের চেষ্টা করা হবে। ওয়াটার ট্যুরিজমের ক্ষেত্রে রিভার ক্রুজিং, নদীর পাড়ে ওয়াকওয়ে ইত্যাদি কার্যক্রম বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে করা হবে।
পর্যটন খাতে সমস্যা : পযর্টন খাতসংশ্লিষ্টরা বলেন, বর্তমানে দেশে পর্যটন খাতে বেশ কিছু সমস্যা আছে। এর মধ্যে অন্যতম বিদেশি পর্যটকদের ভিসা জটিলতা। এ জটিলতা দূর করার পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রগুলোয় যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। পর্যটন গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং জোরদার করতে হবে। দেশে মূলত বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকা, অতিরিক্ত ভ্রমণব্যয়, পর্যটকবান্ধব পরিবেশ গড়ে না ওঠাসহ বেশ কিছু কারণে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোয় চলে যাচ্ছেন বিদেশি পর্যটক। এ ছাড়া দেশের পর্যটন স্থানগুলোয় বিনোদনেরও কোনো ব্যবস্থা নেই।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের অধীনে প্রণীত একটি কৌশলগত পর্যটন মহাপরিকল্পনা ২০১৯ সালে প্রকাশ করা হয়। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, কভিড মহামারি এবং পরে প্রশাসনিক জটিলতায় এর বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত হয়।
পর্যটন দিবস উদযাপনে সপ্তাহব্যাপী বর্ণিল আয়োজন : ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’ প্রতিপাদ্যে আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হবে বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশেও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী কর্মসূচি আয়োজন করেছে। গতকাল আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
কর্মসূচির মধ্যে আজ শেরেবাংলা নগর প্রশাসনিক এলাকায় র্যালি, সাইকেল র্যালি ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সিটি ট্যুর রয়েছে। পর্যটন অংশীজন ও বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভাও হবে। ৩ অক্টোবর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ১২টি থিমাটিক প্রদর্শনী স্টল উদ্বোধন করা হবে। এ ছাড়া প্রথমবারের মতো ১৩ ক্যাটাগরিতে দেওয়া হবে ‘বাংলাদেশ পর্যটন পুরস্কার ২০২৬’।
সচিব ফাহমিদা আখতার বলেন, কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ হয়েছে এবং টার্মিনাল ভবনের কাজ প্রায় শেষ। আন্তর্জাতিকভাবে চালুর প্রস্তুতি চলছে। তবে বিমানবন্দরের পাশাপাশি পর্যটন অবকাঠামো, গন্তব্যের সুবিধা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ উন্নয়ন জরুরি। কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে আশপাশের গন্তব্যগুলোর সঙ্গে সংযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। বিদেশি পর্যটকদের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে কাজ করা হবে। ট্যুরিজম বোর্ডের সিইও ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, পর্যটন খাতের তথ্যঘাটতি দূর করতে পর্যটন স্যাটেলাইট হিসাব (টিএসএ) তৈরির কাজ এগোচ্ছে। খেলাধুলা, অ্যাডভেঞ্চার, ধর্মীয়, ঐতিহ্য, বিনোদন ও সম্মেলনভিত্তিক পর্যটনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বৌদ্ধ পর্যটন নিয়ে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি হালাল পর্যটন, বাংলাদেশি খাবার ও উৎসব তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।