চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ মিছিল ও ‘লাল কার্ড’ কর্মসূচি পালন করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। শনিবার বেলা ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার সংলগ্ন সড়ক থেকে লাল কার্ড প্রদর্শনের মাধ্যমে মিছিল শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে শিক্ষার্থীরা এতে যোগ দেন। মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে স্বাধীনতা চত্বর হয়ে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়।
মিছিল থেকে ‘অনলাইন ভিসি মানি না’, ‘রেড কার্ড টু অনলাইন ভিসি’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের হাতে থাকা লাল কার্ডে নবনিযুক্ত উপাচার্যকে প্রত্যাখ্যানের বার্তা তুলে ধরা হয়। এর আগে শনিবার সকাল ১০টা থেকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চত্বর ও একাডেমিক ভবনের দেয়ালে প্রতিবাদী ও ব্যঙ্গাত্মক গ্রাফিতি আঁকেন শিক্ষার্থীরা। গ্রাফিতিতে নতুন উপাচার্য নিয়োগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার এবং অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি তুলে ধরা হয়।
আন্দোলনরত আবদুল্লাহ বিন নয়ন নামে শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের গ্রাফিতি আঁকা কর্মসূচি চলমান রয়েছে। আমাদের দাবি একটাই-উপাচার্য হিসেবে আমরা সকলের প্রিয় অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে চাই। এতদিন কেটে যাওয়ার পরও দাবি পূরণ না হওয়া হতাশাজনক।’ তিনি বলেন, ‘আমরাও আমাদের ক্লাসে ফিরতে চাই। সরকারের কাছে আকুল আবেদন, আমাদের একাডেমিক জীবন ও ক্যারিয়ারকে প্রাধান্য দিয়ে ক্যাম্পাসে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হোক।’ জেনিয়া তাসনিম নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে আমরা গ্রাফিতি আঁকছি।’
তার ভাষ্য, ‘সায়েম স্যারকে ৫৬ দিনের মাথায় অপসারণ করা হয়েছে। উনি ভালো কাজ করছিলেন। অবশ্যই উনাকে সুযোগ দিতে হবে। উনার কাজগুলো করার পর্যাপ্ত সময় যেন উনি পান।’ এদিকে নবনিযুক্ত উপাচার্য ক্যাম্পাসে আসতে পারেন-এমন খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে অবস্থান নেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। নতুন উপাচার্যের ক্যাম্পাসে প্রবেশ ঠেকাতে মূল ফটকে ভেতর থেকে তালা দিয়ে পালা করে রাতভর পাহারা দেন তারা।
শনিবার সকালেও প্রধান ফটকসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের অবস্থান অব্যাহত ছিল। শুক্রবার রাতে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণেও ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। পরে আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের কার্যালয় ভবনে তালা ঝুঁলিয়ে দেন। এর মধ্যে নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে চলমান আন্দোলনকে ‘ক্ষুদ্র’ উল্লেখ করে ক্যাম্পাসে ৩০ থেকে ৩৫ জন শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন বলে দাবি করেন। একইসঙ্গে ক্যাম্পাসে তালা খুলে তাকে বরণ করার প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান তিনি। তার এই বক্তব্যের প্রতিবাদে শনিবার নতুন উপাচার্যকে ‘লাল কার্ড’ দেখানোর কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাকিবুর রহমান বলেন, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম দায়িত্বে থাকার ৫৬ দিনে শিক্ষার্থীবান্ধব বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে চুয়েটকে আধুনিকায়নের চেষ্টা করেছেন।
তিনি বলেন, ‘নতুন উপাচার্য আমাদের আন্দোলনকে ৩০-৩৫ জনের আন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ প্রতিটি হল থেকে শত শত শিক্ষার্থী স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন। তার এই বক্তব্য ও অনলাইনে যোগদানকে আমরা প্রত্যাখ্যান করছি।’
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে চুয়েট শিক্ষক সমিতি জরুরিসেবা ছাড়া সর্বাত্মক কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছে। ২৪শে সেপ্টেম্বর রাতে ভার্চ্যুয়াল সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রোববার থেকে এ কর্মবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। একই দাবিতে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়েছে চুয়েট অফিসার্স এসোসিয়েশন ও কর্মচারী সমিতিও। শিক্ষার্থীদের শাটডাউন, প্রধান ফটকে অবস্থান এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কর্মবিরতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বন্ধ রয়েছে ক্লাস ও পরীক্ষা।
প্রসঙ্গত, গত ২১শে সেপ্টেম্বর চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অব্যাহতি দিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেয়া হয়। এর আগে গত ২৭শে জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় তাকে সরিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২১ সেপ্টেম্বর রাত থেকেই ক্যাম্পাসে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
পরে তারা অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। মঙ্গলবার সকাল থেকে ক্যাম্পাসের মূল ফটকে তালা দিয়ে শাটডাউন শুরু হয়। আন্দোলনের কারণে বন্ধ রয়েছে ক্লাস-পরীক্ষা। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন, বিক্ষোভ, গণস্বাক্ষর ও গ্রাফিতি কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। গণস্বাক্ষর কর্মসূচিতে পরিচয়পত্রসহ স্বাক্ষর করে অধ্যাপক সায়েমকে পুনর্বহালের দাবির প্রতি সমর্থন জানান শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার বিকালে অনলাইনে উপাচার্য পদে যোগ দেন নবনিযুক্ত অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। ওইদিন রাতে ক্যাম্পাসে মশাল মিছিল করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেন। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকালে সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষক সমিতির সভাপতি নতুন উপাচার্যকে চুয়েটে না চাওয়ার কথা জানান।