Image description

কাগজে নদী বাড়ছে, বাস্তবে হারিয়ে যাচ্ছে। সরকারি তালিকায় দেশের নদনদীর সংখ্যা এখন ১ হাজার ৪১৫টি। অথচ এসব নদীর অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের অস্তিত্ব বাস্তবে খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোনোটি দখলে, কোনোটি দূষণে, কোনোটি ভরাট হয়ে পরিণত হয়েছে খাল, ড্রেন কিংবা চাষের জমিতে। যেগুলো এখনো টিকে আছে, সেগুলোও দখল, দূষণ ও পানির সংকটে ধুঁকছে। নদী রক্ষায় বছরের পর বছর সভা, পরিকল্পনা ও প্রকল্প হলেও নদীর মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না। আজ বিশ্ব নদী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য-‘বন নেই, নদী নেই, পানি নেই, জীবন নেই’। ১৯৮০ সালে কানাডায় শুরু হওয়া দিবসটি ২০০৫ সালে জাতিসংঘের সমর্থনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

তবে দিবস পালনের আয়োজন যতটা দৃশ্যমান, নদী উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ ততটাই অনুপস্থিত।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২০১১ সালের বাংলাদেশের নদনদী বইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ৪০৫টি নদী তালিকাভুক্ত ছিল। ২০২৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ১ হাজার ৮টি নদীর তালিকা প্রকাশ করে। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪১৫টিতে। কিন্তু তালিকাভুক্ত নদীগুলোর কতটি বাস্তবে প্রবহমান, কতটি মৃত বা মৃতপ্রায়-তার নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই। বরং নতুন তালিকা তৈরির পরও মৃতপ্রায় নদীগুলো উদ্ধারে দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি।

আজ বিশ্ব নদী দিবসবিগত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে পরিবেশ রক্ষায় বেশ তৎপরতা দেখায়। নদনদীর আগের তালিকা বাতিল করে নতুন তালিকা তৈরি করে। কাগজে-কলমে নদীর সংখ্যা কয়েক শ বাড়ে। তখন ৬৪ জেলায় ৬৪টি নদী উদ্ধারের কথা জোরেশোরে বলা হলেও একটি নদীও উদ্ধার হয়নি। ফলে কাগুজে বাঘের মতো কাগুজে নদী হিসেবেই রয়ে গেছে দেশের ধমনিগুলো।

নদীর দৈর্ঘ্য নিয়েও সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যে বড় ধরনের অসংগতি রয়েছে। পাউবোর ২০০৫ সালের দলিলে বুড়িগঙ্গার দৈর্ঘ্য ৪৫ কিলোমিটার হলেও ২০১১ সালের হিসাবে তা ২৯ কিলোমিটার। অর্থাৎ সরকারি হিসাবেই ১৬ কিলোমিটার নদী অদৃশ্য হয়ে গেছে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের তথ্যে শীতলক্ষ্যার দৈর্ঘ্য ১০৮ কিলোমিটার, নদী কমিশনের হিসাবে ১০৯ কিলোমিটার। ধলেশ্বরীর ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের হিসাবে ২৯২ কিলোমিটার, নদী কমিশনের হিসাবে ৩৩০ কিলোমিটার। তুরাগের দৈর্ঘ্যও দুই সংস্থার হিসাবে ৬২ ও ৬৫ কিলোমিটার।

নদী গবেষক শেখ রোকন বলেন, ‘কাগজে-কলমে নদীর দৈর্ঘ্য কমিয়ে দেওয়ার অর্থ দখল পাকাপোক্ত করা।’ তাঁর মতে, ওয়াশপুর থেকে হযরতপুর পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটার বুড়িগঙ্গা সরকারি খাতা থেকেই বাদ দেওয়া হয়েছে। গত দুই দশকে বুড়িগঙ্গা রক্ষায় অন্তত ৩ হাজার ২৯৪ কোটি টাকার ৮টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও দৃশ্যমান সুফল মেলেনি।

নদী দখলদারদের তালিকাতেও রয়েছে রহস্যজনক পরিবর্তন। ২০১৯ সালে দখলদারের সংখ্যা ছিল ৫৭ হাজার ৩৯০। অভিযান চালিয়ে ১৮ হাজার ৫৭৯টি দখল উচ্ছেদ করা হলেও একই বছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে দখলদারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩ হাজার ২৪৯। নদী কমিশনের হিসাবে, ওই বছর ৩২ শতাংশ দখল উচ্ছেদের পর কার্যক্রম থেমে যায়। এরপর বড় কোনো উচ্ছেদ অভিযান ছাড়াই ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দখলদারের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৯৮৮। তালিকা ছোট হলেও ঢাকার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদে সরেজমিন এখনো দখল ও পুনর্দখলের চিত্র দেখা যায়।

সারা দেশেও একই চিত্র। দিনাজপুরের খরস্রোতা টেপা নদীর বিভিন্ন স্থানে এখন বালুচর; চরে হচ্ছে চাষাবাদ। হবিগঞ্জের পুরাতন খোয়াই নদীর বহু অংশ ভরাট করে গড়ে উঠেছে স্থাপনা; উচ্ছেদ করা জায়গাতেও ফিরেছে দখল। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের গোপলা নদী বালু-পলিতে ভরাট হয়ে দিক বদলেছে; নদীর জমিতে হয়েছে মাছের খামার, বসতবাড়ি ও চাষাবাদ। নারায়ণগঞ্জের মেঘনা ও মারিখালি নদীতে শিল্পবর্জ্যে পানির রং ও গন্ধ বদলে গেছে, ভেসে উঠছে মাছ।

ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলার প্রশাসনিক তালিকায় নদনদী রয়েছে ১৭৯টি। এর মধ্যে নেত্রকোনায় ৯৪, ময়মনসিংহে ৫৯, জামালপুরে ১৫ এবং শেরপুরে ১১টি। কিন্তু এসব নদীর বড় অংশই বছরের প্রায় আট মাস পানিশূন্য থাকে। শুষ্ক মৌসুমে নদীর তলদেশে চলে চাষাবাদ। সংকটাপন্ন এসব নদীরও নেই সুনির্দিষ্ট সরকারি তালিকা।

সরকারি হিসাবে, ২০১০ সাল থেকে বিআইডব্লিউটিএ ২৮ হাজার ৩২৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ১ হাজার ২৪৪ দশমিক ২২ একর তীরভূমি উদ্ধার করেছে। নদীর প্রবাহ, দখল ও দূষণ রোধে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনসহ ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ যুক্ত। এরপরও শহরের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত ২৮টি নদনদী সবচেয়ে বেশি দখল ও দূষণের শিকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী রক্ষায় শুধু খনন বা উচ্ছেদ অভিযান নয়, নদীর প্রবাহ, সীমানা ও অস্তিত্বের সঠিক সরকারি হিসাব জরুরি। তালিকায় নদী বাড়িয়ে লাভ নেই; বাঁচাতে হবে বাস্তবের নদী।

কাজে আসছে না প্রতিশ্রুতি : আইনুন নিশাত

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেছেন, দেশের নদীগুলো কার্যত এতিম। নদী রক্ষায় সরকার একের পর এক প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে নদী দখল-দূষণ ও সংকোচন বন্ধ হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করলেও সেই রায়ের বাস্তব প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ব নদী দিবস উপলক্ষে গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। আইনুন নিশাত বলেন, একটি জীবন্ত প্রাণীর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার যে অধিকার আছে, নদীরও সেটি আছে। কিন্তু আমাদের দেশে নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণার পর কার্যত সেখানেই বিষয়টি থেমে গেছে।

নদী রক্ষায় বিভিন্ন দেশের উদাহরণ তুলে ধরে আইনুন নিশাত বলেন, নিউজিল্যান্ডে একটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশেও খনিজ আহরণজনিত দূষণ থেকে নদী রক্ষায় আদালত কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। সেখানকার সুশীল সমাজ ও এনজিও বিষয়টি নিয়ে আদালতে গিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট রুলিং দেয় যে, নদীর পানির গুণগত মান যেন কোনোভাবে নষ্ট না হয়। মার্কিনিরা তা মেনে চলছে। অথচ যে দেশটির কৃষি অর্থনীতি সম্পূর্ণ নদীর ওপর নির্ভরশীল, সেখানে নদীর প্রতি কোনো দায়িত্ববোধ দেখানো হচ্ছে না। ভারতের হিন্দু সম্প্রদায়ের কোটি কোটি মানুষের কাছে নদী পবিত্র। সেখানকার জনগণ পবিত্রতার জন্য গঙ্গায় স্নান করেন। পূর্বপুরুষের আত্মার সদগতির জন্যে তারা পূজা করেন নদীতে। অথচ, সেখানেও দেশটির হাই কোর্ট যেদিন নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করল, তার পরের দিন সুপ্রিম কোর্ট সেটি বাতিল করে দিয়েছেন।

আইনুন নিশাত বলেন, একসময় বুড়িগঙ্গার পানি এতটাই স্বচ্ছ ছিল যে মানুষ সেখানে নেমে গোসল করতেন। সদরঘাট ও ওয়াইজঘাটের ভাসমান হোটেলে নদীর পানি দিয়ে রান্না হতো। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলের মানুষ নদীর পানি ফিটকিরি দিয়ে পান করতেন। সেই নদীগুলো এখন দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর চাপে বিপন্ন।

নদীর সংকটের জন্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজের মানসিকতাকেও দায়ী করেন এ পানি বিজ্ঞানী। বলেন, আমাদের সমাজ মূলত দখল করার সমাজ, রক্ষা করার নয়। ছোট নদী-খালগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য অতিরিক্ত পানি তুলে নেওয়ায় অনেক নদীর তলদেশ শুকিয়ে যাওয়ায় সেখানে চাষাবাদ হচ্ছে।

নদী ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বের বিভাজন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আইনুন নিশাত। তাঁর মতে, নদীর অভিভাবক ‘নদী কমিশন’। এই প্রতিষ্ঠানটি নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে। অথচ, নদী ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব থাকা উচিত পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যেখানে নৌযান ভেড়ে সেখানে। এ ছাড়া বিআইডব্লিউটিএ, ওয়াসা, জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দায়িত্ব থাকায় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা হচ্ছে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমালোচনা করে আইনুন নিশাত বলেন, তাদের সঙ্গে কথা বললে মনে হয় তারা নদী বোঝে না, তারা বোঝে শুধু প্রকল্প। অপরিকল্পিত বাঁধ ও অবকাঠামো নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে নদীর মৃত্যু ডেকে আনছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। আইনুন নিশাত সতর্ক করে বলেন, নদীর মৃত্যু বন্ধ করা না গেলে দেশের কৃষি ব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটে পড়বে এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।