Image description

ময়মনসিংহে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (মমেক) রোগীর চাপ স্বাভাবিক সক্ষমতার চেয়ে তিন গুণ বেড়েছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ২৪ দিনে মমেক হাসপাতালে ডেঙ্গুতে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং চলতি বছরে হাসপাতালটিতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ জনে।

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে খেলন সরকার (৬৫) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ১৩ জনের মৃত্যু হলো। আর চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এই হাসপাতালে মোট ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, সেপ্টেম্বরের ২৪ দিনে হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৮১৫ জন পুরুষ, ৩৭৫ জন নারী ও ৬১ শিশু চিকিৎসা নিয়েছেন। এ সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু একজনের

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন খেলন সরকার। তিনি ময়মনসিংহ নগরীর রামবাবু রোড এলাকার নরেন্দ্র সরকারের স্ত্রী। গত ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৭টার দিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বুধবার রাতে তার মৃত্যু হয়। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকালে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে এসব তথ্য জানানো হয়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৯ জন এবং ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭৬ জন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ১৩০ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৯২, নারী ৩৮ ও শিশু ১০ জন। তবে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৭০৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এ সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

৫০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মাইনউদ্দিন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ৫০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। সেখানে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। ভর্তি রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।’

উদ্বিগ্ন নগরবাসী

এদিকে ময়মনসিংহ নগরীতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন নাগরিকরা। ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট এইচএম খালেকুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর বিষয়ে মানুষ এখনও তেমন একটা সচেতন নয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশনকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘শুধু ফগার মেশিন দিয়ে ওষুধ ছিটালে হবে না। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো করতে না পারলে এডিস মশা কোনোভাবেই কমবে না। মশা উৎপাদন বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।’

এত ভয়াবহতার কারণ কী

জেলায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ার পেছনে মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের অসচেতনতা। সম্প্রতি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা পূর্বের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এ বছর বর্ষাকাল দীর্ঘায়িত হওয়ায় এবং দফায় দফায় বৃষ্টিপাতের ফলে চারপাশের পরিবেশ এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত অনুকূল হয়ে উঠেছে। বৃষ্টির পর জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা দ্রুত ডিম পাড়ছে। এ ছাড়া শহর ও এর আশেপাশের এলাকায় দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে। বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবন, বহুতল ভবনের বেজমেন্ট এবং ছাদ বা আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার না করার কারণে এডিস মশার লার্ভা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।

অসচেতনতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

সাধারণ মানুষের অসচেতনতার কারণে বাসাবাড়ির আঙিনায়, ফুলের টব, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার বা প্লাস্টিকের পাত্রে পানি জমে থাকছে। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব এই সমস্যাটিকে আরও তীব্র করে তুলেছে। এ ছাড়া ময়মনসিংহের একটি বড় অংশের মানুষের নিয়মিত ঢাকা বা অন্যান্য উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে যাতায়াত রয়েছে। যার ফলে ডেঙ্গু ভাইরাস দ্রুত স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।

মশা নিধন কার্যক্রমে ঘাটতি

স্থানীয় পর্যায়ে ড্রেন বা ডোবা-নালা পরিষ্কার করা এবং কার্যকরভাবে লার্ভিসাইড বা মশক নিধন স্প্রে করার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা থাকায় মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

কী ব্যবস্থা নিলো সিটি করপোরেশন

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রোকনুজ্জামান সরকার বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনতে সিটি করপোরেশনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কর্মীরা দায়িত্ব পালন করছেন।’

তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে ফগার মেশিন ব্যবহারের পাশাপাশি ইংল্যান্ডের তৈরি ট্যাবলেট ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া হোয়াইল বোম ড্রেনে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের কারণে নগরীতে অনেকাংশে মশা কমে গেছে। তবে নাগরিকদের সহযোগিতা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। এ ব্যাপারে তাদের সচেতন হতে হবে এবং সিটি করপোরেশনকে সার্বিক সহযোগিতা করতে হবে।’