Image description

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (ইউএনজিএ) অধিবেশনে ভাষণ দিতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা এবং যুক্তরাজ্য-ফ্রান্সসহ সমালোচকদের একযোগে আক্রমণ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর এ বক্তব্য চলাকালে অধিবেশনকক্ষে তুমুল হট্টগোল সৃষ্টি হয়।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেন নেতানিয়াহু। বক্তব্যের শুরুতেই বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অধিবেশনকক্ষ ত্যাগ করে প্রতিবাদ জানান।

বক্তব্যে তিনি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি, সমালোচক ও ইরানের নেতৃত্বের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো মিত্র দেশগুলোরও কড়া সমালোচনা করেন। নিজ দেশে আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় নির্বাচন সামনে রেখে নেতানিয়াহু কঠিন রাজনৈতিক লড়াইয়ের মুখোমুখি। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর এই ভাষণের লক্ষ্য আন্তর্জাতিক মহলের পাশাপাশি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ ভোটাররাও ছিলেন।

কূটনীতিকদের ওয়াকআউট ও অধিবেশনকক্ষে হট্টগোল

নেতানিয়াহুর বক্তব্য শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন দেশের বহু কূটনীতিক অধিবেশনকক্ষ থেকে ওয়াকআউট করেন। অনেকে নিন্দা জানান। এ সময় নেতানিয়াহুর সফরসঙ্গী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে করতালি দেন এবং অধিবেশনের সভাপতি সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। যারা অধিবেশনকক্ষ ত্যাগ করছিলেন, তাদের উদ্দেশে নেতানিয়াহু বলেন, ‘এই কক্ষে আর কোনো নৈতিক কাপুরুষ থাকলে দয়া করে তারাও এখনই বেরিয়ে যান।’

ইরানে যৌথ হামলা ও পেজেশকিয়ানের সমালোচনা

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা কঠিন ছিল, অত্যন্ত কঠিন ছিল। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি ছিল আমার নেওয়া অন্যতম সহজ সিদ্ধান্ত।’ তিনি দাবি করেন, এ পদক্ষেপ না নিলে ‘আমরা সবাই মারা যেতাম।’

এর আগে বুধবার একই অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পারমাণবিক ইস্যুতে পশ্চিমাদের দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্র ইসরায়েলের কাছে রয়েছে, অথচ পরিদর্শকেরা যান ইরানে। ইসরায়েল মানুষ হত্যা করছে, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ছে ইরান।’

সাতমুখী যুদ্ধ ও মিত্রদের বিরুদ্ধেই ক্ষোভ

নেতানিয়াহু বৃহস্পতিবার দাবি করেন, ইসরায়েল বর্তমানে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর, সিরিয়া, লেবানন, ইরান, ইয়েমেনের হুতি এবং ইরাকের মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে সাতমুখী যুদ্ধে লড়ছে। ১৯৭৬ সালে উগান্ডার এন্টেবে অভিযানে নিহত নিজের বড় ভাই ইয়োনাতান নেতানিয়াহুর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা জিতবই। আমাদের সামনে অন্য কোনো পথ নেই।’

ঐতিহাসিক মিত্র যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের কড়া সমালোচনা করে নেতানিয়াহু বলেন, উভয় দেশই পশ্চিম তীর থেকে ইসরায়েলি পণ্য আমদানিতে সীমিত নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তারা ইসরায়েলকে, এই ক্ষুদ্র ইসরায়েলকে উপনিবেশবাদের দায়ে অভিযুক্ত করছে—কেমন উপনিবেশবাদ? আর কারা আমাদের অভিযুক্ত করছে? তাদের মধ্যে রয়েছে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মানুষ। ঈশ্বরের দোহাই, তারাই তো এই শব্দের জন্ম দিয়েছিল।’

ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও মামদানির বিরুদ্ধে তোপ

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নেতানিয়াহু বলেন, ‘বর্বরদের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়ে বড় কোনো অংশীদার আমাদের ছিল না। আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই।’ তিনি উল্লেখ করেন, দুই দেশের বৈমানিকেরা ইরানের আকাশে যৌথ অভিযান পরিচালনা করেছেন এবং গাজা থেকে অবশিষ্ট জিম্মিদের ফিরিয়ে আনতেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসঙ্গে কাজ করেছে।

জাতিসংঘের অধিবেশনকক্ষ এবং বাইরের সমালোচকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমার দেশ সম্পর্কে যারা মিথ্যা ছড়াচ্ছেন, তারা এই কক্ষে থাকুন কিংবা নিউইয়র্কের ইহুদিবিদ্বেষী মেয়রের কার্যালয়ে বসুন, তাদের সবাইকে বলি: আপনাদের লজ্জা পাওয়া উচিত।’ নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকে লক্ষ্য করে তিনি বলেন, ‘মি. মামদানি, আপনি আমাকে এখানে আসতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আমাকে স্তব্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আপনি আমাকে থামাতে পারবেন না।’

নেতানিয়াহুর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মামদানি তার অভিযোগকে ভিত্তিহীন মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো গণহত্যাকে আড়াল করতেই নেতানিয়াহু এই মিথ্যাচার করেছেন।

আইসিসির পরোয়ানা ও বাইরে তুমুল বিক্ষোভ

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় অব্যাহত সামরিক অভিযানে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হেগভিত্তিক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ২০২৪ সালে জানায়, গাজায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির যৌক্তিক কারণ রয়েছে। তবে আইসিসির এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।

আইসিসির পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু নির্বিঘ্নে এ সম্মেলনে যোগ দেন। অন্যদিকে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে ভিসা দেয়নি মার্কিন প্রশাসন। ফলে তিনি রামাল্লাহ থেকে ভিডিওবার্তার মাধ্যমে অধিবেশনে যুক্ত হন।

নেতানিয়াহুর বক্তব্য চলাকালে বাইরে বিক্ষোভ সমাবেশ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন জিউইশ ভয়েস ফর পিস। তারা জাতিসংঘকে একজন যুদ্ধাপরাধীর আয়োজক হিসেবে অভিযুক্ত করে। সংগঠনের যোগাযোগ পরিচালক সোনিয়া মেয়ারসন-নক্স বলেন, ফিলিস্তিনিদের মুক্তির প্রতি সমর্থন এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে জোরালো এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধের দাবিতে সবাই একতাবদ্ধ।

জাতিসংঘ ভবনের অদূরে গাজায় গণহত্যা বন্ধের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ থেকে প্রখ্যাত মার্কিন অভিনেত্রী সুসান সারান্ডনসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ।

অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের বার্তা

ভাষণে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে নেতানিয়াহু বলেন, ‘এই দীর্ঘ যুদ্ধে আমাদের লক্ষ্য কখনো টলেনি—অটল সংকল্প নিয়ে বিজয়ী হওয়া… আমাদের যা ঐক্যবদ্ধ করেছে তা আরও শক্তিশালী: আমাদের ইতিহাস, আমাদের মূল্যবোধ, আমাদের সাহস।’

আটলান্টিক কাউন্সিলের ইউরেশিয়া সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো এরিয়েল কোহেন মন্তব্য করেন, নেতানিয়াহু ভালো ভাষণ দিলেও ভুল জায়গায় তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই বক্তব্যটি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী সমাবেশে দেওয়া উচিত ছিল। রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার জন্য তিনি দেশের ভেতরের ভোটারদের বার্তা দিতে চেয়েছেন।’

সংক্ষিপ্ত এই সফর শেষে দ্রুত ইসরায়েলে ফিরে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে কোনো শীর্ষ মার্কিন নেতার সঙ্গে তার বৈঠকের সূচি রাখা হয়নি।