Image description

রাত গভীর, চারপাশে নীরবতা। হঠাৎ গর্জে ওঠে ড্রেজারের ইঞ্জিন। কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নদীতে নোঙর করা বাল্কহেড থেকে মোটা পাইপ বেয়ে নগরের ভেতরে ছুটে আসে বালু। বরিশাল নগরীর কোনো পুকুরে তখন তৈরি হচ্ছে বালুর বাঁধ, কোনোটি এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে। এক রাত, দুই রাত নয় এভাবে রাতের পর রাত চলছে বালু ফেলার কাজ।

নগরীর কাউনিয়া, রূপাতলীসহ বিভিন্ন এলাকার অলিগলিতে এখন চোখে পড়ে ড্রেজারের পাইপের জাল। কোথাও রাস্তার পাশ দিয়ে, কোথাও ব্যক্তিগত জমির ওপর দিয়ে, কোথাও আবার বসতবাড়ির গা ঘেঁষে চলে গেছে এসব পাইপ।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, রাত হলেই এসব পাইপ দিয়ে পুকুর ও নিচু জমিতে বালু ফেলা হয়। সকালে অনেক জায়গায় দেখা যায়, আগের দিনের জলাশয়ের জায়গায় শুধু বালু।

আরও বিস্ময়কর হলো, ভরাটের পর কয়েক দিনের মধ্যেই কোথাও কোথাও বালুর ওপর ঘাস গজিয়ে উঠছে। দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এই জায়গাটিই কিছুদিন আগে ছিল পুকুর। বরিশাল নগরের ৩০ টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় এভাবেই একের পর এক পুকুর ও জলাশয় হারিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র এই তৎপরতা জোরদার করেছে। তাঁদের দাবি, বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রাতের বেলায় ড্রেজার চালিয়ে নিচু জমি, পুকুর ও জলাশয় ভরাট করা হচ্ছে।

সরেজমিনে পুরানপাড়া, হাউজিং, টেক্সটাইল মোড়, রোকেয়া আজিম সড়ক, তোফাজ্জেল হোসেন সড়ক, ময়লা খোলা, কাউনিয়া সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মনসা গলি, কাউনিয়া প্রথম গলি, বিসিক এলাকা সহ রূপাতলীর বেশ কয়েকটি এলাকায় ড্রেজারের পাইপের সংযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব পাইপের বড় অংশ কীর্তনখোলা ও তালতলী নদীতে নোঙর করা বাল্কহেডের সঙ্গে যুক্ত।

নগরীর পুরানপাড়া এলাকার বাসিন্দা ওয়াহাব সিকদার জানান, প্রায় সাত-আট মাস আগে ২০-২৫ জন লোক তার জমির ওপর দিয়ে ড্রেজারের পাইপ বসান। তিনি বাধা দিয়েছিলেন। বাধা দেওয়ার পর তাকে হুমকি দেওয়া হয়। তিনি বলেন, আমি তাদের কাউকেই চিনি না।

রোকেয়া আজিম সড়কের বাসিন্দা লাবলু হাওলাদার বলেন, প্রায় ছয় মাস আগে ওই এলাকায় ড্রেজারের পাইপ ঢোকে। আশপাশের সাত-আটটি পুকুর ভরাট করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তার কথায়, এখন দেখলে বোঝার উপায় নেই যে এখানে পুকুর ছিল।

কাউনিয়া হাউজিং এলাকার বাসিন্দা সাইদুর রহমান কামাল বলেন, ৫ আগস্টের পর তার এলাকায় অন্তত ৫০টির বেশি ছোট-বড় পুকুর ও জলাশয় ভরাট হয়েছে। এ কাজে স্থানীয় বিভিন্ন পক্ষকে অর্থ দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের দুই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঈদের ছুটিতে কাউনিয়ার মনসা গলি এলাকায় একটি বড় পুকুর ভরাটের মাধ্যমে এ তৎপরতা দৃশ্যমানভাবে শুরু হয়। পরে ধীরে ধীরে তা বরিশাল নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তাদের দাবি, নদীতে নোঙর করা বাল্কহেড থেকে পাইপের মাধ্যমে বালু আনা হচ্ছে।

সিটি করপোরেশনের ওই কর্মকর্তাদের একজন দাবি করেন, সাবেক এক প্রশাসকের সময় সুবিধা নিয়ে অঘোষিতভাবে পুকুর ও জলাশয় ভরাটের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এরপর পাইপের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

এক ড্রেজার মালিকও পরিচয় গোপন রাখার শর্তে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন। তার দাবি, নদী থেকে বালু উত্তোলন থেকে শুরু করে ভরাটকৃত স্থানে পৌঁছানো পর্যন্ত বিভিন্ন পক্ষকে টাকা দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করতে হয়। কাউকে এককালীন, কাউকে মাসিক ভিত্তিতে টাকা দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

সম্প্রতি কোস্টগার্ড কয়েকটি ড্রেজার ও বাল্কহেড আটক করে জরিমানা করেছে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এতে ভরাটের কাজ বন্ধ হয়নি। বরং অভিযান শেষে আবারও রাতে ড্রেজার চালু হচ্ছে।

স্থানীয় পরিবেশবিদদের তথ্য মতে, গত ৫০ বছরে বরিশাল নগরীর প্রায় ৭০ ভাগ পুকুর ও জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে। আশির দশকে বা তার আগে যেখানে হাজারেরও বেশি ছোট-বড় পুকুর ছিল, তা এখন আশঙ্কাজনক হারে কমে এসেছে। সরকারি ৩০টি পুকুরের বাইরে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডে এখনো কয়েকশ ব্যক্তিমালিকানাধীন বা পারিবারিক পুকুর টিকে আছে। তবে নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজ না থাকায় মোট বর্তমান সংখ্যার সঠিক সরকারি হিসাব পাওয়া কঠিন।

তবে পরিবেশবাদীদের ধারণা, সব মিলিয়ে বর্তমানে দৃশ্যমান বা ব্যবহারযোগ্য পুকুরের সংখ্যা ৩০০ থেকে ৪০০টির বেশি হবে না, যার বড় অংশই এখন ভরাট-আতঙ্কে ভুগছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পুকুর ও জলাশয় ভরাট হয়েছে আশঙ্কাজনক হারে, নগরীর বেশিরভাগ এলাকা নদী কাছে থাকায় সুযোগ কাজে লাগিয়েছে জমি মালিকের সাথে ড্রেজার পরিচালনাকারীরা।

সুজনের বরিশাল জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রনজিৎ দত্ত বলেন, বরিশাল জুড়ে প্রতিদিন একের পর এক জলাশয় ও পুকুর নিশ্চিহ্ন হচ্ছে। এভাবে জলাশয় ভরাট হতে থাকলে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীজুড়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। এছাড়া আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের পানি পাওয়ার কোনো উৎস থাকবে না, যা পুরো এলাকার জন্য এক বিশাল অগ্নিঝুঁকি তৈরি করছে।

নগরীর জলাশয়গুলো বাঁচাতে অবিলম্বে এই অবৈধ ড্রেজার বন্ধ করতে হবে এবং ভরাটকৃত জলাশয়গুলো পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিতে হবে।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাস এশিয়া পোস্টকে বলেন, বরিশাল নগরীতে ১৮টি বালু অবতরণ কেন্দ্র বা আনলোড পয়েন্ট এর অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ৫টা পয়েন্ট আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি ১৩টি পয়েন্টের বালু অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে চিঠি দেওয়া হচ্ছে। দ্রুত এসব বন্ধ করা হবে।

বরিশাল জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন এশিয়া পোস্টকে বললেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রী সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে সেখানে বরিশালে একের পর এক জলাশয় ভরাটের খবর খুবই উদ্বেগজনক। যারা জলাশয় ও পুকুর ভরাটের মতো অবৈধ কাজে জড়িত তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।