Image description

‘একদল কিশোর রামদা নিয়া চিৎকার করতে করতে সড়কে মহড়া দিচ্ছিল। ভয়ে ব্যবসায়ীরা শাটার নামিয়ে দোকানের ভেতরে ঢুকে পড়েন। কুমিল্লার কাপ্তানবাজারের মানুষ প্রকাশ্যে এমন অস্ত্রের মিছিল আগে দেখেনি। ঘটনার আকস্মিকতায় পথচারীরাও ভয়ে ছোটাছুটি করছিলেন।’ গত মে মাসের এক বিকেলের একটি ঘটনার এভাবে বর্ণনা দিচ্ছিলেন কাপ্তানবাজারের এক ব্যবসায়ী। ভয়ে নাম প্রকাশ করতে সাহস পেলেন না তিনি।

ঘটনাটি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেদিন ছিল শুক্রবার। গোমতী নদীর তীরের ভাটারপুকুর থেকে কাপ্তানবাজার, বৌবাজার, চানপুর ও সংরাইশ পর্যন্ত এলাকায় ১০০ থেকে ১৫০ জন কিশোর ও তরুণ ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে রামদা, চাপাতি ও লাঠি নিয়ে মহড়া দেয়। তাদের সামনের সারিতে ছিল উচ্চ শব্দ করে চলা কয়েকটি মোটরসাইকেল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে তারা এই মহড়ায় নেমেছিল।

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, ওই কিশোর দলটির নাম ‘ক্রাইম সেটআপ’। নতুন দলটির আত্মপ্রকাশের তথ্য ওই দিনই তাদের নজরে আসে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুমিল্লা শহরে বর্তমানে এমন অন্তত ২০টি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। চলতি বছরের সাড়ে আট মাসে অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধের ঘটনায় এই গ্যাং সদস্যদের নাম এসেছে। সর্বশেষ গত শুক্রবার দিবাগত রাতে ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি জঙ্গলে নিয়ে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়া ও হত্যার ঘটনায় দুই কিশোর গ্রেপ্তার হয়েছে। এ ঘটনার পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার বিষয়টি নতুনভাবে সামনে এসেছে।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনও একটি কিশোর গ্যাং গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। অপ্রতিমকেও সেই দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করছিলেন তুহিন। টিকটকের জন্য ভিডিও তৈরির আড়ালে অন্য কিশোরদের জড়ো করার চেষ্টা ছিল তাঁর।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পারিবারিক সূত্রগুলো বলছে, অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার অন্য তিন কিশোরের একজন তার সৌদিপ্রবাসী বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আইফোন কিনেছে। সেটি দিয়ে ভিডিও বানিয়ে নিয়মিত টিকটকে পোস্ট করা হতো। আরেক কিশোর কিনেছে মোটরসাইকেল।

অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের ভূমিকা ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ থেকেও। গতকাল মঙ্গলবার এই দাবিতে ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা।
কুমিল্লায় ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা মামলার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯)। গত রোববার জেলা ডিবি পুলিশ কার্যালয়ে
কুমিল্লায় ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা মামলার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯)। গত রোববার জেলা ডিবি পুলিশ কার্যালয়েছবি: প্রথম আলো

একাধিক ‘গ্যাং পার্টিতেও’ যোগ দিয়েছে অপ্রতিম হত্যায় অভিযুক্তরা। তুহিন গত কয়েক মাসে কয়েকটি পার্টির আয়োজন করেছেন বলেও জানান স্থানীয় লোকজন। অবস্থান জানান দিতে সেখানে যোগ দেওয়া কিশোর দলকে নিয়ে ফেসবুকে ছবিও পোস্ট করেন।

অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের ভূমিকা ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ থেকেও। গতকাল মঙ্গলবার এই দাবিতে ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা বলেন, অপ্রতিমের মা ও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্যকে পুলিশে সোপর্দ করেন। সেই ক্ষোভ থেকে তাঁর একমাত্র সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে কি না, সেটি তদন্ত করতে হবে।

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হয়নি। ২০১৫ সালের দিকে বিষয়টি নগরে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তখন তিন থেকে চারটি দল বেশি সক্রিয় ছিল। ২০২২ সালের দিকে গিয়ে সেই সংখ্যা হয় কমপক্ষে ২০টি। তবে শাখা দল ও উপদল মিলিয়ে গ্যাংয়ের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল।

উপস্থিতি দিয়ে আতঙ্ক তৈরি

কাপ্তানবাজারের ওই ব্যবসায়ীর বর্ণনার সঙ্গে মেলে সংরাইশ ও চানপুর এলাকার বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতাও। চানপুরের এক অভিভাবক প্রথম আলোকে জানান, কিশোর গ্যাংয়ের অনেকেই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। এ তথ্য জানার পর তাঁরা সন্তানদের বাইরে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন।

ভয়ের একই ছবি দেখা গিয়েছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। রানীর দিঘির পাড়ে অস্ত্রের মহড়া দেখে কান্দিরপাড়ের ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান বলছিলেন, ‘ভয়ে আমার প্রাণটা যেন যায় যায় অবস্থায় ছিল।’ তাঁর অভিযোগ, কিশোরদের দলগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

আতঙ্ক তৈরির আরেক আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল। সেদিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময় চাঁদপুর থেকে আসা এক পরীক্ষার্থীর অভিভাবকের সঙ্গে রানীর দিঘির পাড়ে ছিলেন প্রশান্ত কর্মকার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব কোণ থেকে হঠাৎ একদল কিশোর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া শুরু করে এবং বাজি ফুটিয়ে আতঙ্ক ছড়ায়। একই বিকেলে তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়ায়ও অস্ত্রধারী দলগুলো মহড়া দেয়।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের ৩০ নভেম্বর তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরে থেকে ২৫০ জনের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে। তবে কিশোর হওয়ায় অনেকেই গ্রেপ্তারের পর দ্রুততম সময়ে মুক্তি পেয়ে আবার একই ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছে। অনেকের মা–বাবাকে ডেকে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে। তবে বয়স কম হওয়ায় শুধু পুলিশের তৎপরতা দিয়ে কিশোরদের অপরাধ বন্ধ করা কঠিন।

বাংলাদেশের অন্য জায়গায় কী অবস্থা জানি না। তবে কুমিল্লায় বর্তমানে এমন কোনো পাড়ামহল্লা নেই, যেখানে কিশোর গ্যাং নেই। তাদের এখনই থামাতে হবে, কোনোভাবেই বাড়তে দেওয়া যাবে না।
ইউসুফ মোল্লা, প্রশাসক, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন

এক যুগের ইতিহাস, ১২ খুনে নাম

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হয়নি। ২০১৫ সালের দিকে বিষয়টি নগরে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তখন তিন থেকে চারটি দল বেশি সক্রিয় ছিল। ২০২২ সালের দিকে গিয়ে সেই সংখ্যা হয় কমপক্ষে ২০টি। তবে শাখা দল ও উপদল মিলিয়ে গ্যাংয়ের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। তখন সবচেয়ে আলোচিত ছিল রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে, বিগ ব্রাদার, টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক, ইগল, আরজিএস, র‍্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিএমসি, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ ও বস।

ওই সময় ধর্মসাগরপাড়সহ বিভিন্ন এলাকার দেয়ালে গ্যাংয়ের নাম ও লোগো লেখা থাকত। গ্যাং সদস্যদের মেসেঞ্জার গ্রুপ, একই ধরনের পোশাক-চুলের ছাঁট এবং নির্ধারিত আড্ডাস্থল ছিল। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১২টি হত্যার ঘটনায় তাদের নাম আসে। এর বাইরে শতাধিক অপরাধের ঘটনায় জড়ায় তারা। এলাকায় দখল ও পাল্টাপাল্টি শক্তি প্রদর্শনেও কিশোর গ্যাং সদস্যদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়।

এ বিষয়ে কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা (টিপু) প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্য জায়গায় কী অবস্থা জানি না। তবে কুমিল্লায় বর্তমানে এমন কোনো পাড়ামহল্লা নেই, যেখানে কিশোর গ্যাং নেই। তাদের এখনই থামাতে হবে, কোনোভাবেই বাড়তে দেওয়া যাবে না।’ তিনি বলেন, বিগত সময়ে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের মাধ্যমে কিশোর গ্যাংকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে। বিএনপির কেউ কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করেন, এমন তথ্য জানা নেই।

পুরোনো দ্বন্দ্বের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ রতন ও ইগল। ২০২২ সালে ধর্মসাগর পাড় ও নগর উদ্যান এলাকা নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধের মধ্যে ১৫ বছরের রবিউল হাসান শাহাদাতকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সার্কিট হাউস মোড় এলাকায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে দুজন আহত হয়। ককটেল বিস্ফোরণের ওই ঘটনায় ১৬ জনকে গ্রেপ্তার এবং চারটি মামলা করা হয়।

কুমিল্লা জেলায় কিশোর গ্যাং গ্রুপের হালনাগাদ তালিকা পুলিশের কাছে নেই। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কিং স্কোয়াডসহ মোট পাঁচটি গ্রুপ এখন কুমিল্লা শহরে সবচেয়ে আলোচিত। বাকি চারটি হলো স্কোয়াড বা রতন গ্রুপ, ইগল, সিবিকে ও ক্রাইম সেটআপ। এর বাইরে অপু ও সাব্বিরের নামে দুটি গ্রুপ রয়েছে। তবে এখানকার অনেক সদস্য অন্য গ্রুপের সঙ্গে চলাফেরা করায় এটাকে উপ-গ্রুপও বলেন কেউ কেউ।

দুশ্চিন্তা পাঁচ গ্রুপ নিয়ে, পাল্টাপাল্টি হামলা

২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট হাউজিং এলাকার কেটিসিসি মাঠে কিং স্কোয়াড নামের একটি কিশোর দলের ২১ জনকে আটক করে পুলিশ। তাদের বয়স ছিল ১৫ থেকে ২১ বছর। পুলিশের ভাষ্য, দলটি ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পরে অভিযান চালিয়ে তাদের কাছ থেকে চাপাতি, চায়নিজ কুড়াল, হকিস্টিক ও রড জব্দ করা হয়।

কুমিল্লা জেলায় কিশোর গ্যাং গ্রুপের হালনাগাদ তালিকা পুলিশের কাছে নেই। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কিং স্কোয়াডসহ মোট পাঁচটি গ্রুপ এখন কুমিল্লা শহরে সবচেয়ে আলোচিত। বাকি চারটি হলো স্কোয়াড বা রতন গ্রুপ, ইগল, সিবিকে ও ক্রাইম সেটআপ। এর বাইরে অপু ও সাব্বিরের নামে দুটি গ্রুপ রয়েছে। তবে এখানকার অনেক সদস্য অন্য গ্রুপের সঙ্গে চলাফেরা করায় এটাকে উপ-গ্রুপও বলেন কেউ কেউ।

একই দলের সদস্যদের একাধিক দলের সঙ্গে চলাফেরার উদাহরণ পাওয়া যায় পুলিশের নথিতেও। যেমন ২০২৪ সালের ১১ অক্টোবর তানজিম আবদুল্লাহকে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের পর পুলিশ বলেছিল, তিনি সিবিকে, সিবিকে ডেঞ্জার জোন, সিবিকে জুনিয়র, সিবিকে স্পেশালসহ ছয়টি উপদলের নেতৃত্ব দিতেন। এগুলোকে ছয়টি স্বাধীন গ্যাং ধরা হলে মোট সংখ্যা আরও বাড়ে।

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ধর্মসাগরপারের রানীর কুঠি এলাকায় নাফিজ অময়কে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে রতন গ্রুপের তিনজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত প্রায় ৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। তখন নাফিজের একটি হাত প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ জখম হয় বলে তাঁর স্বজনেরা জানান।

নাফিজের এক বন্ধু নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, আগের দিন সাইফুলের হাতে আরেক তরুণ আহত হওয়ার প্রতিবাদ করেছিলেন নাফিজ। এর জেরেই রতন ও সাইফুলের নেতৃত্বে ৩০ থেকে ৪০ জন তাঁকে আক্রমণ করে। এ হামলার পর রতন ও সহযোগীরা আত্মগোপনে গেলে ২৫ এপ্রিল রানীর দিঘি, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়ায় সিবিকে, ইগল ও নামহীন আরেকটি পক্ষ অস্ত্র নিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে।

নগরের অন্তত পাঁচটি গ্যাংয়ের সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, রতন গ্রুপ চাপে পড়ায় প্রতিদ্বন্দ্বীরা জায়গা নেওয়ার চেষ্টা করছিল।

এ ঘটনার দুই দিন পর দুর্গাপুর ও রেসকোর্স এলাকায় সেনাবাহিনী ও র‍্যাবের যৌথ অভিযানে নয়জন এবং পুলিশের আলাদা অভিযানে আরও নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। যৌথ অভিযানে পিস্তল, রিভলভার, গুলি, দেশীয় অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করা হয়।

কুমিল্লার কিশোর গ্যাংগুলোকে নিয়ে অনুসন্ধানে দলগুলোর মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে মিল দেখা গেছে। সেটা হলো তারা জড়ো হচ্ছেন টিকটক ভিডিও বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো গ্রুপের মাধ্যমে।

তারা থামছেই না

কিশোর গ্যাং এখন আর কুমিল্লার নির্দিষ্ট এলাকায় বা নির্দিষ্ট অপরাধে সীমাবদ্ধ নয়। তবে কিছু এলাকায় বেশি প্রভাব আছে। যেমন কান্দিরপাড়, ধর্মসাগর, রানীর দিঘি, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়া–সংলগ্ন এলাকা কিশোর গ্যাংয়ের কারণে খুবই সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মফিজাবাদ ও রেসকোর্স এলাকা রতনের নেটওয়ার্কের প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। অশোকতলায় গ্যাং–সংশ্লিষ্ট মাদক কারবারের বিরোধে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। হাউজিংয়ের কেটিসিসি মাঠে কিং স্কোয়াড এবং গোমতীর তীরের ভাটারপুকুর, কাপ্তানবাজার, বৌবাজার, চানপুর ও সংরাইশে ক্রাইম সেটআপের তৎপরতা বেশি দেখা গেছে।

২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর রাতে অশোকতলায় সজীব হোসেন ওরফে বাবুকে পেটানো ও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরদিন হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। পুলিশ বলছে, ঘটনার নেপথ্যে কিশোর গ্যাংয়ের মাদক কারবার ছিল। সজীবের বড় বোন সনিয়া আক্তার প্রথম আলোকে জানান, তাঁর ভাই একটি সুপারশপে কাজ করতেন। তিনি হামলাকারীদের ‘ভয়ংকর কিশোর গ্যাং’ বলে বর্ণনা করেন।

গত ২৪ জুন কাঁটাবিল এলাকায় মাদক কারবার নিয়ে অপু গ্রুপ ও সাব্বির গ্রুপের বিরোধ শুরু হয়। পরদিন সংঘর্ষ ও গুলির মধ্যে টিফিনের সময় বাইরে বের হওয়া ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইথান আহমেদ গুলিবিদ্ধ হয়। পরে চারজনকে গ্রেপ্তার এবং একটি বিদেশি পিস্তল ও ছয়টি গুলি উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বয়স ছিল ১৯ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। যদিও পুলিশ এই দুই পক্ষকে স্থানীয় গ্রুপ বলেছে।

জনসমাগমপূর্ণ ধর্মসাগর পাড়ে গত ২ এপ্রিল নারী কনস্টেবল জাকিয়া সুলতানাকে অশালীন মন্তব্য করার প্রতিবাদ করায় তাঁর স্বামী পুলিশ কনস্টেবল কাজী আব্দুল্লাহ মো. জোবায়েরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আহত করা হয়। পুলিশ ১২ ঘণ্টার মধ্যে রিফাত ও সিয়াম নামে ১৯ ও ২০ বছর বয়সী দুজনকে গ্রেপ্তার করে।

কিশোর গ্যাং বলা হলেও এই চক্রের সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক (বয়স ১৮ বছরের কম) নয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে আর স্কোয়াড–সংশ্লিষ্ট অভিযানে ১৯, ২০, ২১, ২৮, ২৯, ৪৫ ও ৪৭ বছর বয়সী ব্যক্তিদের নাম আসে। সেখানে মূল অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে মো. রুবেল (৩৫) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ কারণে স্কুল-কলেজপড়ুয়া অল্প বয়সী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বয়সে বড় অনেকের বন্ধুত্বের বিষয়টি সামনে আসছে। অপ্রতিমের সঙ্গে তাকে হত্যায় অভিযুক্তদের বন্ধুত্বকেও ‘অসম বন্ধুত্ব’ বলছে পুলিশ।

এমন কোনো অপরাধ নেই যেটা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা করছে না। এদের আবার রাজনৈতিক নেতারা লালন-পালন করেন। এ কারণে অস্ত্র হাতে মহড়া দেওয়া ছেলেরা ভবিষ্যতে আরও বড় সন্ত্রাসীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। তাদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সতর্ক হতে হবে। পাশাপাশি সন্তান কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, পরিবারকেও সেই খবর রাখতে হবে।
অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায়, সভাপতি, সচেতন নাগরিক কমিটি, কুমিল্লা

শখ ও বন্ধুত্ব থেকে বড় অপরাধে

কুমিল্লার কিশোর গ্যাংগুলোকে নিয়ে অনুসন্ধানে দলগুলোর মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে মিল দেখা গেছে। সেটা হলো তারা জড়ো হচ্ছেন টিকটক ভিডিও বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো গ্রুপের মাধ্যমে।

গ্যাংয়ের সদস্যদের বেশির ভাগের হাতে আইফোনসহ বিভিন্ন দামি ব্র্যান্ডের মুঠোফোন রয়েছে। সেগুলো দিয়ে ভিডিও তৈরি করে তার সঙ্গে বিভিন্ন অসংলগ্ন সংলাপ যুক্ত করে পোস্ট করা হয়। যেমন একটি আইডি থেকে কিছু ছবি পোস্ট করা হয়। সেই ছবির সঙ্গে সংলাপ ছিল, ‘আমি হাত ধরি ঠিকই, কিন্তু বুক মিলাই না। সময় পাইলে ভইরা দিমু, তুই টেরও পাবি না’।

কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের অনেকের কাছেই আছে বিভিন্ন ধরনের মোটরসাইকেল। এগুলো চালানোর সময় শব্দ বাড়াতে অবয়বেও বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়েছে।

সদর দক্ষিণের গন্ধমতী কোটবাড়ি এলাকায় ১৬ বছর ধরে মোটরসাইকেল মেরামতের ব্যবসা রয়েছে মো. নাদিম খানের। মেহেরাজ হুন্ডা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের এই স্বত্বাধিকারী প্রথম আলোকে বলেন, এলাকায় এমন অনেকে আছে, যাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। অথচ তারা দামি দামি মোটরসাইকেল চালায়। উচ্চ শব্দ করে যায়। তাদের হাতে দামি ফোন। এমন পরিবেশ আগে ছিল না। এগুলোতে নজরদারি না করলে এই গ্যাং থামানো যাবে না।

অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের বাড়িতে গিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেও একই চিত্র পাওয়া যায়। গতকাল বেলা তিনটার দিকে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কালির বাজার ইউনিয়নের হাতিগাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, অপ্রতিম হত্যায় সরাসরি অংশ নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার ১৬ বছরের কিশোরটির বাড়িতে তার নানি দুই ছোট বোনকে নিয়ে বসে আছেন। মা বাড়িতে থাকলেও কথা বলতে সামনে আসেননি। ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীর সঙ্গে একই প্রতিষ্ঠানে পড়ার সূত্রে সালমানপুরের ১৫ বছরের কিশোরটির বন্ধুত্ব হয়। তার মাধ্যমেই পরিচয় হয় তুহিনের সঙ্গে। বাবা সৌদিপ্রবাসী; তিন ভাইবোনের মধ্যে সে একমাত্র ছেলে।

পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী জানান, প্রায় তিন বছর আগে হাতিগাড়ায় বাড়ি করার আগে পরিবারটি কোটবাড়ির চাঙ্গিনী এলাকায় থাকত। পরিবারের ‘আদরের ছেলে’ বলে মা ও নানি তাকে একটি আইফোন কিনে দিয়েছিলেন। সেটি দিয়ে সে নিয়মিত টিকটক ভিডিও বানাত। গ্রেপ্তার করতে এসে পুলিশ প্রথমে তার নাতির কাছ থেকে ফোনটি নেয় বলে জানান নানি। তবে পুলিশের একটি সূত্র বলছে, এই ফোনটি অপ্রতিম হত্যার গুরুত্বপূর্ণ আলামত।

একই দিন বিকেলে সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের ছোট গ্রাম সুধন্যপুরে গিয়ে অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. সিয়ামের (১৯) একটি টিনশেড ঘর দেখা যায়। তবে পরিবারের কেউ এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, তুহিনদের গ্রামের উঠতি বয়সী তরুণেরা মোটরসাইকেলে প্রায়ই এ এলাকায় আসতেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে মেজ সিয়ামের বাবা সেলিম মিয়া প্রায় তিন বছর আগে মারা গেছেন। বড় ভাইয়ের আয় ও মায়ের জমি বিক্রির টাকা দিয়ে সংসার চলে।

আফজাল খান টেকনিক্যাল অ্যান্ড কমার্স কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র সিয়াম বছরখানেক আগে মোটরসাইকেল কেনেন। মোটরসাইকেল ঘিরেই তুহিনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজনসহ তদন্তসংশ্লিষ্ট তিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, অপ্রতিম হত্যার রাতে তুহিন সিয়ামের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা আড্ডা দেন এবং হত্যার কথা জানান।

সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় প্রথম আলোকে বলেন, এমন কোনো অপরাধ নেই যেটা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা করছে না। এদের আবার রাজনৈতিক নেতারা লালন-পালন করেন। এ কারণে অস্ত্র হাতে মহড়া দেওয়া ছেলেরা ভবিষ্যতে আরও বড় সন্ত্রাসীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। তাদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সতর্ক হতে হবে। পাশাপাশি সন্তান কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, পরিবারকেও সেই খবর রাখতে হবে।