Image description

জাতিসংঘে ফিলিস্তিন প্রশ্নে বিশ্বের নেতাদের বক্তব্যে আবারও সামনে এসেছে সেই পুরোনো কিন্তু ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠা একটি ধারণা ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’। অর্থাৎ, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন—দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র পাশাপাশি থাকবে; থাকবে পারস্পরিক স্বীকৃতি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার  জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে চোখের সামনে হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। তিনি গাজায় লড়াই বন্ধ, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং পশ্চিম তীরে সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি ও বসতি সম্প্রসারণ বন্ধের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।

তার বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক সমাধানের পথকে আরও সংকুচিত করছে।

ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ চেয়েছেন। গাজা যুদ্ধ বন্ধের পাশাপাশি পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ বন্ধের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। তবে এবারের অধিবেশনে তার উপস্থিতিই ছিল একটি বড় কূটনৈতিক প্রশ্ন।

যুক্তরাষ্ট্র তাকে ভিসা না দেওয়ায় তিনি নিউ ইয়র্কে যেতে পারেননি। পরে সাধারণ পরিষদ তাকে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত ১৫২ ভোটে পাস হয়েছে; যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও প্যারাগুয়ে এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ সম্প্রতি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের জাতিসংঘ অধিবেশনেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নিয়ে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য রাখছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ। ছবি : রয়টার্সজর্ডানসহ আরব ও মুসলিম দেশগুলোর নেতারাও গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। ইউরোপীয় নেতাদের বক্তব্যেও একই ধরনের বিষয় উঠে এসেছে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সমর্থন থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি সেই সমাধানের বিপরীত দিকে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ও ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের কিছু আন্তর্জাতিক উদ্যোগের বিরোধিতা করে আসছে। এবারের অধিবেশনেও মার্কিন প্রতিনিধিরা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) কর্মকাণ্ড নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন।

ফলে জাতিসংঘে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে বড় ধরনের কূটনৈতিক সমর্থন থাকলেও এর বাস্তবায়নের প্রশ্নে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রায় তিন দশক ধরে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান সমাধান হিসেবে থাকা এই ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ আসলে কী? কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ? ১৯৯০-এর দশকে অসলো চুক্তির মাধ্যমে যে পথ তৈরি হয়েছিল, সেটি কোথায় গিয়ে থেমে গেল? আর আজকের বাস্তবতায় সেই পথ কি আবার খোলা সম্ভব?

দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান আসলে কী

সহজভাবে বললে, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের মূল ধারণা হলো—ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। দুই রাষ্ট্রের নিজস্ব সরকার, ভূখণ্ড ও নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে। তারা পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করবে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচলিত কাঠামোটিতে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের আগে থাকা সীমারেখাকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। অর্থাৎ পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা নিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাই এর মূল ভিত্তি।

তবে সীমান্তের চূড়ান্ত রূপ, জেরুজালেমের মর্যাদা, ইসরায়েলি বসতি এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বহু বছর ধরে মতবিরোধ রয়েছে।

জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রস্তাবেও ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনকে আলাদা দুটি রাষ্ট্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। ২০১৬ সালের নিরাপত্তা পরিষদের ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাবে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতিকে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিবেদনে একই অবস্থান আবারও তুলে ধরা হয়েছে।

ধারণাটির শুরু কোথা থেকে

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ শাসনের সময় ফিলিস্তিন অঞ্চল নিয়ে বিরোধ জটিল হয়। একদিকে ভূমিপুত্র আরবদের স্বাধীনতার প্রত্যাশা, অন্যদিকে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার ব্রিটিশ প্রতিশ্রুতি—দুটি বিষয় মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা অঞ্চলটি থেকে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে জাতিসংঘ একটি বিভাজন পরিকল্পনা নেয়। এতে একটি ইহুদি রাষ্ট্র ও একটি আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব ছিল।

পরিকল্পনাটি আরব পক্ষ প্রত্যাখ্যান করে। এরপর সংঘাত শুরু হয় এবং ১৯৪৮-৪৯ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেই সময় স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি কন্যার কোলে তার বাবার মাথা। ফাইল ছবি : সংগৃহীতযুদ্ধের পর পশ্চিম তীর জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে এবং গাজা মিসরের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি হন বাস্তুচ্যুত। অন্যদিকে আরব দেশগুলো থেকেও বিপুলসংখ্যক ইহুদি ইসরায়েলে চলে আসেন।

১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে পরিস্থিতি আবার বদলে যায়। ইসরায়েল পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা দখল করে। এই যুদ্ধের পরই ‘ভূমির বিনিময়ে শান্তি’ ধারণাটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ, ইসরায়েল ১৯৬৭ সালে দখল করা ভূখণ্ডের বড় অংশ থেকে সরে যাবে এবং বিনিময়ে আরব দেশ ও ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে শান্তি ও স্বীকৃতি পাবে—এই ধারণা পরবর্তী শান্তি প্রক্রিয়ার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

অসলো চুক্তি : বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি

দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ১৯৯০-এর দশকে।

১৯৯১ সালের মাদ্রিদ সম্মেলনের পর ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। এরপর নরওয়ের অসলোতে গোপন আলোচনা থেকে যে সমঝোতা তৈরি হয়, তার ফল ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি।

১৯৯৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন ও ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) নেতা ইয়াসির আরাফাতের উপস্থিতিতে চুক্তিটি সই হয়। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ছিলেন সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে।

এই চুক্তির সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল—ইসরায়েল ও পিএলও একে অপরকে রাজনৈতিকভাবে স্বীকৃতি দেয়। পিএলও ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার স্বীকার করে এবং ইসরায়েল পিএলওকে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের সীমিত স্বশাসনের জন্য ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বা পিএ গঠনের পথ তৈরি হয়।

পরিকল্পনাটি ছিল ধাপে ধাপে এগোনোর। পাঁচ বছরের একটি অন্তর্বর্তী সময়ের মধ্যে ফিলিস্তিনি স্বশাসন সম্প্রসারিত হবে। এরপর স্থায়ী সমাধানের জন্য সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল।

সেসব বিষয়ের মধ্যে ছিল—ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের চূড়ান্ত সীমান্ত, জেরুজালেমের ভবিষ্যৎ মর্যাদা,  পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতির ভবিষ্যৎ, ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন বা পুনর্বাসন ও দুই পক্ষের নিরাপত্তাব্যবস্থা।

অর্থাৎ, অসলো চুক্তি নিজেই চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি ছিল না। এটি ছিল চূড়ান্ত দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের দিকে যাওয়ার একটি ধাপ।

অসলো চুক্তির সাফল্য কোথায়

অসলো প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি ব্যর্থ বললে এর অর্জনগুলো বাদ পড়ে যায়।

চুক্তির পর ইসরায়েল গাজা ও জেরিকোর কিছু এলাকা থেকে সেনা সরিয়ে নেয়। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়। ফিলিস্তিনিরা প্রথমবারের মতো নিজেদের ভূখণ্ডের কিছু অংশে সীমিত প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা দায়িত্ব পায়।

১৯৯৫ সালের অসলো-২ চুক্তির মাধ্যমে পশ্চিম তীরকে তিন ধরনের এলাকায় ভাগ করা হয়। ‘এ’ এলাকায় ফিলিস্তিনি প্রশাসন ও নিরাপত্তার দায়িত্ব, ‘বি’ এলাকায় ফিলিস্তিনি প্রশাসন এবং যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ‘সি’ এলাকায় ইসরায়েলি প্রশাসন ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল রাজনৈতিক স্বীকৃতি। কয়েক দশকের সরাসরি সংঘাতের পর ইসরায়েল ও পিএলও প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার কাঠামোয় আসে।
ঐতিহাসিক অসলো চুক্তি সইয়ের পর হাসিমুখে শীর্ষ নেতৃত্ব। ফাইল ছবি / রয়টার্স১৯৯৪ সালে রবিন, আরাফাত ও ইসরায়েলের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিমন পেরেজ শান্তিতে অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার পান।

তবে এই সাফল্য চূড়ান্ত শান্তিতে পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট হয়নি।

অসলো প্রক্রিয়া ভেঙে গেল কেন

অসলো চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল—চূড়ান্ত সমস্যাগুলো সমাধান না করেই সাময়িক ব্যবস্থা চালু।

পাঁচ বছরের মধ্যে সীমান্ত, জেরুজালেম, বসতি ও শরণার্থী সমস্যার সমাধান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এসব বিষয়ে আস্থার ঘাটতি বাড়তে থাকে।

ইসরায়েলি রাজনীতিতে অসলোবিরোধী শক্তি ছিল। ফিলিস্তিনি পক্ষেও ছিল চুক্তির বিরুদ্ধে অসন্তোষ। একই সময়ে সহিংসতা ও হামলা দুই পক্ষের মানুষের মধ্যে আস্থা কমিয়ে দেয়।

১৯৯৫ সালে রবিন এক ইসরায়েলি উগ্রপন্থীর হাতে নিহত হন। এরপর শান্তি প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক ভিত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

২০০০ সালে ক্যাম্প ডেভিডে চূড়ান্ত সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরপর দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হলে সহিংসতা আবার ব্যাপক আকার নেয়। অসলো প্রক্রিয়া কার্যত থেমে যায়।

এরপরও নানা সময়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকের মতো বড় রাজনৈতিক সমঝোতায় আর পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া কতটা এগোল

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র এখনো পূর্ণাঙ্গ জাতিসংঘ সদস্যরাষ্ট্র নয়। তবে ২০১২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ফিলিস্তিনকে ‘নন-মেম্বার অবজারভার স্টেট’ মর্যাদা দেয়। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিল ১৩৮ দেশ ও বিপক্ষে ৯। ৪১টি দেশ ভোটই দেয়নি।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ফিলিস্তিন অনেক দূর এগিয়েছে। ২০২৫ সালেও ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেয় বা স্বীকৃতি দেয়।

বিশ্বের বড় একটি অংশ এখন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে। কিন্তু কূটনৈতিক স্বীকৃতি আর বাস্তবে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এক বিষয় নয়।

একটি রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন কার্যকর সরকার, সংযুক্ত ভূখণ্ড, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব। ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে এসব জায়গাতেই বড় সমস্যা রয়েছে।

গাজা ও পশ্চিম তীর ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন। পশ্চিম তীরের ভেতরেও ইসরায়েলি বসতি ও বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রয়েছে। গাজায় দীর্ঘদিন ধরে হামাসের নিয়ন্ত্রণ ছিল। অন্যদিকে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সীমিত প্রশাসন চালায়।

ফলে ‘ফিলিস্তিন রাষ্ট্র’ ধারণাটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমর্থন পেলেও বাস্তবে সেই রাষ্ট্রের ভূখণ্ড, প্রশাসন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনো পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রের মতো নয়।

সবচেয়ে বড় বাধা: পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি অবৈধ বসতি

দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তব প্রশ্নগুলোর একটি হলো পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৩৩৪ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের পর দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতির আন্তর্জাতিক আইনি বৈধতা নেই এবং এসব বসতি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পথে বড় বাধা।
পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতির একাংশ। ফাইল ছবি / রয়টার্স২০২৬ সালের জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০২৫ সালের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বছর পশ্চিম তীরে নতুন বসতি ও আউটপোস্ট স্থাপনের পরিকল্পনা ও কার্যক্রম বেড়েছে।

ইইউর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপ ভূখণ্ডের পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এখানে সমস্যাটি শুধু বসতির সংখ্যা নয়। বিষয়টি ভূখণ্ডের ধারাবাহিকতার সঙ্গেও যুক্ত।

একটি সম্ভাব্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্র যদি পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি কার্যকর ও টেকসই রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালনা করা কঠিন হবে।

আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে নতুন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা আইসিজে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শমূলক মতামত দেন।

আদালত বলেছেন, ইসরায়েলের নীতি ও কর্মকাণ্ড ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বাধাগ্রস্ত করছে। পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ভূখণ্ডের বিভাজন, বসতি ও দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও আদালতের পর্যবেক্ষণে এসেছে।

এটি সরাসরি কোনো শান্তিচুক্তি তৈরি করেনি। তবে আন্তর্জাতিক আইনের আলোচনায় ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং অধিকৃত ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে।

দুই পক্ষের মানুষ কী মনে করেন

এখানেও পরিস্থিতি কঠিন। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে ইসরায়েলে মাত্র ১৭ শতাংশ এবং পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ২১ শতাংশ মানুষ বলেছেন, ইসরায়েল ও একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র শান্তিপূর্ণভাবে পাশাপাশি থাকতে পারে।

বিপরীতে ইসরায়েলে ৫৬ শতাংশ এবং পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ৬৮ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা এমন সম্ভাবনা দেখেন না।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান এখনো ব্যাপকভাবে সমর্থিত হলেও এ প্রক্রিয়ার ওপর এসব জায়গায় বসবাসকারী মানুষের আস্থা কমেছে।

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

কারণ কোনো শান্তি পরিকল্পনা শুধু রাষ্ট্রগুলোর কূটনৈতিক সমর্থনের ওপর টিকে থাকতে পারে না। দুই পক্ষের জনগণের কাছেও সেটিকে গ্রহণযোগ্য হতে হয়।

তাহলে কি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান শেষ হয়ে গেছে

এখানেই সবচেয়ে বড় বিতর্ক।

একটি পক্ষ মনে করে, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, ভূখণ্ডের বিভাজন, গাজার ধ্বংস এবং দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার পতনের কারণে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান ক্রমেই বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশ এখনো মনে করে, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের জন্য আলাদা রাষ্ট্রের কাঠামোই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত ভিত্তি। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রস্তাবগুলোতেও এই অবস্থান বহাল আছে।
সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলায় ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। ফাইল ছবি : রয়টার্সতাই বর্তমান বাস্তবতাকে এমনভাবে দেখা যায়—দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমর্থন কমেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। কিন্তু যে ভূখণ্ড ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর এই সমাধান দাঁড়ানোর কথা, সেটিই আরও জটিল হয়েছে।

সামনে কী হতে পারে

দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি বড় পরিবর্তন প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তাদের মত, সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে চূড়ান্ত রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরে যাওয়া।

সেখানে আবারও পুরোনো প্রশ্নগুলো সামনে আসবে—সীমান্ত কোথায় হবে, জেরুজালেমের মর্যাদা কী হবে, বসতিগুলোর কী হবে, ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের প্রশ্ন কীভাবে সমাধান হবে এবং দুই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের পর থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শুধু ‘সমর্থন’ দেওয়ার বদলে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দেশ ও জোট কাঠামো তৈরির চেষ্টা করেছে। জাতিসংঘও বাস্তবায়নের জন্য সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক আলোচনার ওপর জোর দিয়ে আসছে।

তিন দশক আগে অসলো চুক্তি যে পথ খুলেছিল, সেই পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। কিন্তু পথটি আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়েছে।

তবু জাতিসংঘে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের কথা বারবার ফিরে আসার কারণও এখানেই। এর বিকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা আলোচনা থাকলেও ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের জন্য আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাঠামো এখনো জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান এবং অধিকাংশ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগের কেন্দ্রেই রয়েছে।

এখন মূল প্রশ্ন তাই শুধু ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান সম্ভব কি না’ নয়। বরং প্রশ্ন হলো—এই সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ভূখণ্ড, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নিরাপত্তা কাঠামো ও পারস্পরিক আস্থা আবার তৈরি করা যাবে কি না।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে সেই পুরোনো সমাধানের প্রতি সমর্থন আবারও স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবতাও দেখিয়েছে, শুধু সমর্থন বা প্রস্তাব দিয়ে সমাধান আসবে না।

দরকার যুদ্ধ থামানো, ভূখণ্ডের বাস্তবতা বদলানো, রাজনৈতিক আলোচনা ফিরিয়ে আনা এবং দুই পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য একটি নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি করা।

সেই জায়গাতেই দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের ভবিষ্যৎ এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে।