২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৪ শতাংশ করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। গত জুলাইয়ে সংস্থাটি এই প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। ব্যাংকিং খাতের চলমান চাপ, কাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতা এবং তীব্র জ্বালানি সংকটকে পূর্বাভাস কমানোর মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
সর্বশেষ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক’ (এডিও) প্রতিবেদনে ম্যানিলাভিত্তিক ঋণদাতা সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশে অর্থনীতির সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্তই থাকবে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, ব্যাংকগুলোর দুর্বল আর্থিক ভিত্তি, ঋণের উচ্চ সুদ এবং তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে ব্যাংকগুলোর বেশি বিনিয়োগের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ সীমিত থাকবে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এডিওতে এডিবি বলেছে, ২০২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানোর পেছনে রয়েছে বাণিজ্যে প্রতিকূল পরিস্থিতি, জ্বালানি আমদানির অনিশ্চয়তা এবং আবহাওয়াজনিত নানা সমস্যা। এসব কারণে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে কৃষি ও উৎপাদন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, পণ্য পরিবহনে নানা সীমাবদ্ধতা এবং নিয়ন্ত্রক ও অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগায় বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে সুদের হার কমানো বা সরকারের প্রণোদনা দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তাতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার অর্থনীতির সক্ষমতা সীমিত থাকবে।
এডিবি বলছে, ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয়বৃদ্ধি, বৈদেশিক চাহিদায় ধীরগতি এবং উৎপাদন ও বেসরকারি বিনিয়োগে ব্যাপক অনিশ্চয়তার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হবে।
প্রতিকূল আবহাওয়া এবং সারের সীমিত সরবরাহের কারণে কৃষি উৎপাদনও বাধার মুখে পড়তে পারে। তবে এর বিপরীতে সেবাখাত তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকবে বলে মনে করছে এডিবি। প্রবাসী আয় শক্তিশালী থাকায় এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা গতি ফেরায় এই খাতে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে।
এল নিনো ও সরবরাহ সংকটে বাড়বে মূল্যস্ফীতি
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোক্তা পর্যায়ে ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ শতাংশ হতে পারে। ২০২৬ অর্থবছরে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত জুলাইয়ের পূর্বাভাসে ২০২৭ অর্থবছরের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ হবে বলা হয়েছিল।
ঋণদাতা সংস্থাটি বলছে, তুলনামূলক শক্তিশালী এল নিনোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, জ্বালানি সংকটের কারণে সরবরাহব্যবস্থায় অব্যাহত মূল্যচাপ, পরিবহন ব্যয়বৃদ্ধি এবং জাহাজ চলাচলে সম্ভাব্য বিঘ্ন—এসব কারণে পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও জাহাজ চলাচলের ব্যয় বাড়ায় আমদানি পণ্যের দাম বেড়েছে; যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে। শিথিল মুদ্রানীতি গ্রহণ এবং বাজারে তারল্য সহায়তা বাড়ানোও মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরগতি এবং ঋণপ্রবাহে স্থবিরতার কারণে চাহিদা থেকে তৈরি মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কম থাকবে বলে মনে করছে এডিবি।
বিনিয়োগে ধীরগতি
চাহিদার দিক থেকে প্রবাসী আয় প্রবাহের ওপর ভর করে ব্যক্তিগত ভোগই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি থাকবে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমতে থাকবে।
আর্থিক খাতে চাপ, উচ্চ সুদের ঋণে সীমিত প্রবেশাধিকার, জ্বালানি ঘাটতি এবং ব্যবসায়ীদের আস্থার ঘাটতির কারণে বেসরকারি বিনিয়োগও দুর্বল থাকবে। সরকারি বিনিয়োগ কিছুটা সহায়তা দিতে পারে। তবে রাজস্ব ঘাটতি এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে এর প্রভাব সীমিত থাকবে।
চ্যালেঞ্জিং বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির মধ্যে রপ্তানি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াবে বলে ধারণা করছে এডিবি। অন্যদিকে জ্বালানি ও শিল্প উৎপাদনের কাঁচামালের চাহিদা বাড়ায় আমদানিও বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।