ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে নন-এসি বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল মঙ্গলবার সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হলেও প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। তবে তা জারির আগেই বেড়েছে বাস ভাড়া।
ঢাকার বাসে পাঁচ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়া হচ্ছে। দূরপাল্লার বাসে ভাড়া ২০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়া হয় গতকাল। এসি বাসের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে না। তবে সেগুলোতেও আগের তুলনায় বেশি টাকা নেওয়া হয়েছে ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে।
সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) পরিবহন মালিক এবং অন্যান্য অংশীজনের বৈঠক থেকে গত সোমবার দূরপাল্লার বাসে ২০ পয়সা এবং ঢাকা-চট্টগ্রামের নগর পরিবহনের বাসে ১৮ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়। গতকাল সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সভাপতিত্বে প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে ১৭ পয়সা ভাড়ার বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়। তিনি বলেন, ২০ পয়সা প্রস্তাবের পরও ১৭ পয়সা বৃদ্ধি যৌক্তিক ভাড়ার চেয়ে কম।
মন্ত্রী বলেন, প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি হলো ডিজেলের দাম এক টাকা বাড়লে বাসের ভাড়া এক পয়সা বৃদ্ধি পাবে। এপ্রিলে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধির পর ভাড়া ১৫ পয়সা বৃদ্ধির যৌক্তিক দাবি ছিল। ডলারের দাম বৃদ্ধিতে বাসের রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশের ব্যয় বেড়েছে। মালিকদের এ দাবির পরও পরিস্থিতি বিবেচনায় ১১ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটা সরকারের সফলতা।
রবিউল আলম বলেন, ডিজেলের দাম ২০ টাকা বৃদ্ধিতে ২০ পয়সা ভাড়া বৃদ্ধির কথা ছিল। কিন্তু পরিবহন মালিকদের বুঝিয়ে ১৭ পয়সায় রাজি করা হয়েছে। যে কোনো ভাড়া বৃদ্ধিই জনগণের জন্য চাপ। তবে সরকার যৌক্তিক ভাড়ার চেয়েও কম বৃদ্ধিতে সফল হয়েছে।
১৭ পয়সা বৃদ্ধিতে দূরপাল্লার ৫২ আসনের বাসের ভাড়া কিলোমিটারে দুই টাকা ২৩ পয়সা থেকে হবে দুই টাকা ৪০ পয়সা। নগর পরিবহনের বাসের ভাড়া দুই টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে হবে দুই টাকা ৭০ পয়সা। এই বাড়তি ভাড়া শুধু ডিজেলচালিত সাধারণ বাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। সরকার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে না। ট্রাক-কাভার্ডভ্যানসহ পণ্যবাহী অন্য যানবাহনের ভাড়াও সরকার ঠিক করে না। ফলে পণ্যবাহী যানবাহন ও এসি বাসের ক্ষেত্রে বাড়তি ভাড়ার হার কার্যকর হবে না।
দূরপাল্লায় ৫২ আসন ধরে বাস ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও অধিকাংশ বাসই ৪০ আসনের। আরামদায়ক যাত্রার জন্য অনেক বাসে আসন সংখ্যা ৩২ থেকে ৩৬। আসন কমলে ভাড়া বৃদ্ধি পায়। ফলে দূরপাল্লার ৪০ আসনের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া দুই টাকা ৯০ পয়সা থেকে তিন টাকা ১২ পয়সা হবে। ৫২ আসনের বাসে ১৭ পয়সা বৃদ্ধি পেলেও ৪০ আসনের বাসে তা বাড়বে ২২ পয়সা।
দূরপাল্লার পথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব ২৪৮ কিলোমিটার। ফলে ৪০ আসনের বাসে ভাড়া বৃদ্ধি পাবে ৫৫ টাকা। ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে বর্তমান ভাড়া ৩৩৫ টাকা। যা বৃদ্ধি পেয়ে হবে ৩৬০ টাকা। দূরত্ব হিসাবে অন্যান্য রুটেও ভাড়া বাড়বে। এর সঙ্গে যোগ হবে সেতুর টোল, ফেরি পারাপারের খরচ।
রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী, ফুলবাড়িয়াসহ বিভিন্ন টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া বাসে গত সোমবার থেকেই বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু করে দিয়েছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা। কোথাও কোথাও ১০০ টাকা কিংবা তারও বেশি ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-বরিশাল রুটে ১০০ টাকা বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অথচ ১৮১ কিলোমিটার দূরত্ব হিসাবে ভাড়া বাড়তে পারে ৪০ টাকা।
রোববার রাতে ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করেছে সরকার। এর আগে গত এপ্রিলে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। তখন বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। মঙ্গলবার ঢাকার বিভিন্ন পথে দেখা যায় বাস ভাড়া বেড়েছে। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে মতিঝিলের দূরত্ব ৯ দশমিক ৫ কিলোমিটার। এই রুটে বর্তমান ভাড়া ২৪ টাকা। আগেও নেওয়া হতো ২৫ থেকে ৩০ টাকা। ডিজেলের দাম বৃদ্ধির পর ৩৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে সিটি, রজনীগন্ধাসহ এই রুটের বাসগুলো। অথচ ১৭ পয়সা বৃদ্ধি পেলেও ভাড়া হবে ২৬ টাকা। নতুন তালিকা না থাকায় যাত্রীরা বুঝতে পারছে না প্রকৃত ভাড়া কত।
সিটি পরিবহনের চালকের সহকারী নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেছেন, মালিক ঠিক করে দিয়েছেন প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত ৩৫ টাকা করে নিতে হবে। ডিজেলের যে দাম হয়েছে, এর কমে পোষাবে না।
বাসটির যাত্রী আকবর হোসেন সমকালকে বলেন, আসা-যাওয়ায় ১০ টাকা বাড়তি দিলে দিনে ২০ টাকা বেশি। মাসে ২৫ দিনে ৫০০ টাকা লাগবে। আয় তো বাড়েনি। এই বাড়তি খরচটা কী করে জোগাব।
তবে কিছু কিছু বাস এখনও এপ্রিল মাসের নির্ধারিত ভাড়ায় চলছে। তারা নতুন ভাড়ার তালিকার অপেক্ষায় রয়েছেন। তবে এসব বাসের চালকরা বলছেন, ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে লোকসান হচ্ছে।
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, আন্তঃজেলা মিনিবাসে ভাড়া বেড়েছে। অন্যদিকে মৌলভীবাজার-শ্রীমঙ্গল রুটে আগের ভাড়া বহাল রেখেছেন পরিবহন শ্রমিকরা। দুই পরিবহনে একই দূরত্বে ভাড়ার তারতম্য হওয়ায় যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের বাগ্বিতণ্ডা চলছে।
সিলেট-মৌলভীবাজার-শ্রীমঙ্গল রুটে চলাচল করা এসএমএস পরিবহনের মিনিবাসে গতকাল থেকে ২০০ টাকা নেওয়া হয়, যা আগে ছিল ১৭০ টাকা। শ্রীমঙ্গল-মৌলভীবাজারের ভাড়া ১০ টাকা বাড়িয়ে ৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। মালিক সমিতির প্যাডে লেখা সিদ্ধান্ত দেখিয়ে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
এসএমএস পরিবহনের সচিব আব্দুর রব জানান, এপ্রিলে ভাড়া বৃদ্ধির পরও তা কার্যকর করা হয়নি। কিন্তু এবার আর পারা যাচ্ছে না।
মৌলভীবাজার মিনিবাস মালিক সমিতির চেয়ারম্যান, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপন সমকালকে বলেন, এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তাই ভাড়া বৃদ্ধি করতে হয়েছে প্রজ্ঞাপন জারির আগেই।
নাটোর সংবাদদাতা জানান, ২০ থেকে ৫০ টাকা বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে যাত্রীদের। নাটোর শহরের মাদ্রাসা মোড় ও হরিশপুর বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রাজশাহী থেকে যে কোনো আন্তঃজেলা বাসে ভাড়া ছিল ৭০ টাকা। সোমবার থেকে তা ১০০ টাকা হয়ে গেছে। রাজশাহী থেকে আসা যাত্রী শহিদুল ইসলামও একই কথা জানান। তিনি বলেন, ৩০ টাকা বাড়তি দিতে রাজি না হলে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন সুপারভাইজার।
বগুড়া জেলার পণ্য ব্যবসায়ী দোলন আলী বলেন, ‘প্রতি মাসে নাটোর থেকে ভ্যারাইটি স্টোরের পণ্য কিনে বাসে করে বগুড়া যাই। তখন ৮-১০ কার্টনের জন্য ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা দিতো হতো। এবার ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকা দিতে হচ্ছে।’
বাস কাউন্টার মাস্টার বিলাস বলেন, নাটোর থেকে রাজশাহীর ভাড়া ১০০ টাকা। এতদিন কম রাখা হতো। এখন আর পারা যাচ্ছে না।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ভাড়া বৃদ্ধিতে যাত্রী কমেছে। সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকার দূরত্ব ১২৮ কিলোমটিার। নন-এসি বাসে ভাড়া ৪০০ টাকা।
এসআই পরিবহনের কাউন্টার ব্যবস্থাপক রাকিব হোসেন বলেন, ঢাকা আসা-যাওয়ায় ৮০ থেকে ৯০ লিটার ডিজেল লাগে। প্রতি ট্রিপে এক হাজার ৮০০ টাকা অতিরিক্ত হচ্ছে।