দেশে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে শিশু নিখোঁজের ঘটনা। চলতি মাসেই নিখোঁজ ৪৬ জন শিশুর মধ্যে খোঁজ মেলেনি ৩১ জনের। মৃত উদ্ধারের সংখ্যাও বড়। পুলিশের প্রতিবেদনের তথ্যও উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু নিখোঁজের পেছনে পারিবারিক ও সামাজিক কারণের পাশাপাশি জড়িত থাকতে পারে মাদক ও শিশুশ্রম চক্র ও ভিক্ষাবৃত্তির সিন্ডিকেট এমনকি পাচারচক্রও। এদিকে সময়ের সঙ্গে আহাজারি বাড়ছে সন্তান হারানোর পরিবারগুলোর। পুলিশি সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ বেশিরভাগের। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় ডাটাবেস তৈরির পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
১২ বছরের সন্তান হাবিবুল্লাহ নাঈমকে ফিরে পেতে আহাজারি মা শাহানুর বেগমের। ১৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুর্মিটোলা স্কুলের সামনের বাসা থেকে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে টিউশনিতে গেলে আর ফিরে আসেনি নাঈম। আত্মীয় স্বজন ও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে খুঁজেও না পেয়ে র্যাব ও খিলক্ষেত থানায় হারানোর ডায়েরি করে পরিবারটি।
নিখোঁজ শিশু নাঈমের মা শরিফা খাতুন বলেন, ‘একটাই রিকোয়েস্ট আপনাদের মাধ্যমে আমার বাচ্চাটা যেন ফিরে আসে, আপনারা এতটুকু আমাকে হেল্প করেন।’
গত ২৮ আগস্ট রাজধানীর বনানীর সৈনিক ক্লাব এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় আফরুজ্জাহান সাইবা নামের ৪ বছর বয়সী এই শিশু। এখনো পাওয়া যায়নি ছোট সাইবাকে।
আর গত ১৫ সেপ্টেম্বর তেজগাঁওয়ের বিটাক ট্রেনিং সেন্টার থেকে নিখোঁজ হয় সতেরো বছরের কিশোর কাওসার হোসেন নিলয়। এক সপ্তাহ ধরে খুঁজে তাকেও পায়নি পরিবার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
শুধু এই নাঈম ও সাইবা কিংবা রনি নয়, ডিজিটাল প্লাটফর্ম মুন অ্যালার্ট এর তথ্য বলছে, চলতি মাসে সারাদেশে ৪৬ জন শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে ১১ জন জীবিত ও ৪ জনকে মৃত্যু উদ্ধার করা হলেও খোঁজ মেলেনি ৩১ জনের।
এদিকে পুলিশ সদরদপ্তরে তথ্য বলছে গত ৭ মাসে ১৫ হাজারের শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার উদ্ধার হলেও এখনো খোঁজ মেলেনি ২ হাজারের বেশি শিশুর। যা উদ্বেগজনক বলছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, ‘যেখানে শিশুদের সুরক্ষা করার কথা, সেখানে সুরক্ষার পরিবর্তে যখন আমরা দেখব সে ভিকটিম হচ্ছে, মার্ডারের শিকার হচ্ছে এবং সে নিখোঁজ হচ্ছে, এটা আসলে আমাদের চিন্তা করার মতো বিষয়।’
শিশু নিখোঁজের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উদ্ধার না হওয়া শিশুদের বয়স বেশির ভাগই ৩-৯ বছর বয়সী ও ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সী। এই অপরাধ বিশেষজ্ঞের মতে,পারিবারিক কলহ, অতিরিক্ত শাসনে অভিমানে কিছু শিশু হারিয়ে যেতে পারে। যাদের বয়স ১০ থেকে ১৮ মাঝামাঝি। তবে বিপুলসংখ্যক শিশু নিখোঁজের পেছনে মাদক ও শিশু শ্রম চক্র ও ভিক্ষাবৃত্তির সিন্ডিকেট এমনকি জড়িত থাকতে পারে পাচার চক্রও।
তিনি বলেন, ‘আবার দেখব যে ফোর্সড লেবার, তাদেরকে জোর করে বিভিন্ন জায়গায় কর্মসংস্থান, তাদেরকে ইউজ করা হচ্ছে। এরপর বেগিং—ভিক্ষাবৃত্তি। দেখবেন যে তাদের দিয়ে আরও বিভিন্ন অপকর্ম তৈরি করা হচ্ছে, ড্রাগসের মাধ্যম হিসেবে ড্রাগস কেরি করার ক্ষেত্রে একটা চক্র ইনটেনশনালি বিভিন্ন জায়গা থেকে সেই শিশুদেরকে হায়ার করতেছে।’
এদিকে কুমিল্লার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর আতঙ্ক বেড়েছে সন্তান হারানো পরিবার গুলোর। বেশিভাগ ক্ষেত্রে পুলিশের সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের।
যদিও পুলিশ বলছে, শিশু নিখোঁজের ঘটনায় দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালাতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে সারাদেশে। সিন্ডিকেট বা চক্রের কোনো তথ্য নেই।
ক্রাইম ম্যানেজমেন্টর ডিআইজি মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, সেরকম কিছু না, এগুলো বিভিন্ন কারণে হচ্ছে। বিভিন্ন কারণে কেউ হয়তো রাগ করে বের হয়ে গেছে, এগুলো সংখ্যা খুব বেশি না। এগুলা হয়তো নিখোঁজ জিডি করল, তো দু-এক দিন পর আবার সে বাসায় চলে আসছে, ফেরত আসছে এরকম। থানায় জিডি হয় বলা আছে, তারা এগুলা দ্রুত এগুলা ইনকোয়ারি করে, এগুলা তাদের খোঁজ নিবে এবং খুঁজে পাওয়ার ব্যবস্থা করবে।’
নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারে ফিরে পাওয়াদের কেস স্টোরি বিশ্লেষণ করে তৈরি করতে হবে জাতীয় তথ্য ভান্ডার। সচেনতা ও আইনি তৎপরতা জোরদারের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের। অন্যথায় বড় ধরণের ঝুঁকিতে পড়তে দেশের শিশুরা।