১১-দলীয় ঐক্যের রাজনৈতিক কর্মসূচির ব্যস্ততার মধ্যেই জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ সংসদ সদস্যের (এমপি) বিদেশ সফর নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে আলোচনা।
দলটির ৭১ সদস্যের এই বহর ১৭ দিনের সফরে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইন ঘুরছেন। সংসদ সদস্যদের পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি দলের কয়েকজন নেতাও রয়েছেন এই দলে।
জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটি কোনো আনুষ্ঠানিক দলীয় সফর নয়। এমপিদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করা এবং বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার অংশ হিসেবে এ সফরের আয়োজন করা হয়েছে।
একে ‘শিক্ষামূলক সফর’ বলছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। এনিয়ে আলোচনাও অমূলক বলে মনে করছেন তিনি।
হামিদুর রহমান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘এ ধরনের সফর স্বাভাবিক। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা ও সংসদ সদস্যরাও বিভিন্ন দেশে সফর করেন। জামায়াতের এমপিরা একসঙ্গে যাওয়ায় হয়তো বিষয়টি বেশি আলোচনায় এসেছে।’
‘এটি মূলত একটি শিক্ষামূলক সফর। অভিজ্ঞতা অর্জন, বিভিন্ন দেশের বাস্তবতা দেখা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্পর্ক উন্নয়নই এর অন্যতম উদ্দেশ্য,’ বলেন তিনি।
জামায়াত বর্তমানে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় রয়েছে। বাংলাদেশে দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসে এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সাফল্য।
জামায়াতের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, মূলত সম্পর্ক জোরদার, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জনের লক্ষ্যেই এই সফর।
মালয়েশিয়ার মতো মুসলিম প্রধান দেশের পাশাপাশি সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইনে কেন- এই প্রশ্নে তার উত্তর আসে, মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে দলের যোগাযোগ মোটামুটি ভালো। এখন মুসলিম বিশ্বের বাইরের দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ধারাবাহিক উদ্যোগ রয়েছে জামায়াতের। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে জামায়াত আমিরের বৈঠকও হয়েছে।
দলের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় তরুণ নেতৃত্ব ও ছাত্রনেতাদেরও ভবিষ্যতে ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানোর বিষয়টি রয়েছে বলে জামায়াত সূত্র জানিয়েছে।
সফরকারী এমপিরা ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর দুই দফায় মালয়েশিয়ায় পৌঁছান। সেখানে অবস্থান শেষে ১৭ সেপ্টেম্বর তারা সিঙ্গাপুরে যান। পরে যান ফিলিপাইনে।
সফরসূচি অনুযায়ী, ২৪ সেপ্টেম্বর ফিলিপাইন থেকে বাহরাইনে যাত্রাবিরতি দিয়ে সৌদি আরবে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তাদের। ওমরাহ পালনের পর ৩০ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরবেন তারা।
মালয়েশিয়ায় জামায়াতের এমপিদের সঙ্গে দেশটির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও রাজনৈতিক দল কেদিলান রাকাইয়াতের আন্তর্জাতিকবিষয়ক ব্যুরোর প্রধান মাসজলি মালিকের সাক্ষাৎ হয়। তিনি ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড ইসলামিক স্টাডিজের সঙ্গেও যুক্ত।
মাসজলি মালিক এক ফেসবুক পোস্টে জানান, জামায়াত এমপিদের সঙ্গে আলোচনায় সংস্কারমুখী রাজনৈতিক দলগুলোর চ্যালেঞ্জ, সংসদ সদস্যদের ভূমিকা, জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা, সততা ও জবাবদিহির মতো বিষয় উঠে আসে।
জামায়াতের প্রতিনিধিরা ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শন করেন।
মালয়েশিয়া থেকে সিঙ্গাপুরে গিয়ে জামায়াতের এমপিরা নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি পরিদর্শন করেন। সেখানে একটি সিম্পোজিয়ামেও অংশ নেন তারা। সিঙ্গাপুর কীভাবে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে, দেশটির উন্নয়ন প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বিষয়েও সেখানে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এরপর ফিলিপাইনে যাওয়া প্রতিনিধিদলের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের কথা রয়েছে।
ফলে সফরটি একদিকে ব্যক্তিগত ও শিক্ষামূলক হলেও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক যোগাযোগ তৈরির সুযোগও তৈরি করছে।
তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে এটিকে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সফর হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। দলটির নেতারা বলছেন, বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদদের সঙ্গে দেখা হলেও তা মূলত পরিচিতি, মতবিনিময় ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া সেলের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের আগামীর সময়কে বলেন, দলীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী এর আগেও দলের অনেক সদস্য বিদেশে গেছেন। এই সফর তারই ধারাবাহিকতা। জামায়াত আমিরের অনুমতি নিয়েই সংসদ সদস্যরা বিদেশে গিয়েছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জামায়াতের যোগাযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বর্তমান সফরকে সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার একটি ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে শুধু এমপি নয়, দলের তরুণ নেতৃত্ব ও ছাত্রসংগঠনের নেতাদেরও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া সেলও জানিয়েছে, বিদেশ সফর দলের চলমান কর্মসূচির অংশ। এর আগে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বিদেশ সফর করেছেন। এবার বিশেষভাবে সংসদ সদস্যদের জন্য এ ধরনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
ফলে ৩৪ এমপির বর্তমান সফরকে শুধু কয়েকটি দেশ ভ্রমণ হিসেবে নয়, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ানো ও নতুন সংসদ সদস্যদের অভিজ্ঞতা বিস্তারের একটি পরিকল্পিত উদ্যোগ হিসেবেই দেখছে জামায়াত।