ফেনী জেলাজুড়ে তথাকথিত ‘কোর্ট ম্যারেজ’ বা নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে হলফনামা (অ্যাফিডেভিট) করে বিয়ের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। আইনি বাধ্যবাধকতা ও সামাজিক সম্মতি উপেক্ষা করে একশ্রেণির অসাধু চক্রের সহায়তায় বয়সের তথ্য গোপন করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে ফেনীতে অব্যাহতভাবে বাড়ছে বাল্যবিয়ে। শারীরিক, মানসিক ও আইনি সুরক্ষা নিয়ে ঝুঁকিতে পড়ছে কন্যাশিশুরা।
জানা যায়, বাংলাদেশে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ বিয়ের আইনগত কোনো ভিত্তি নেই বলে দাবি বিবাহ নিবন্ধকদের। নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে কেবল একটি ঘোষণাপত্র প্রদান করা হয়, যা কোনো নিকাহনামা বা নিবন্ধিত বিয়ের বিকল্প নয়। অথচ অসাধু সিন্ডিকেট ও ভুয়া নিবন্ধকরা সাধারণ মানুষ ও প্রেমঘটিত কারণে পালিয়ে আসা কিশোর-কিশোরীদের ভুল বুঝিয়ে টাকার বিনিময়ে অ্যাফিডেভিট করিয়ে সেটিকে বৈধ বিয়ে হিসেবে দাবি করছেন। যার ফলে অনেকে পরবর্তী সময়ে সামাজিক অস্থিরতাসহ পারিবারিক মামলা মোকাদ্দমায় জড়িয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদ বা জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স কম থাকা সত্ত্বেও ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে বয়স বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগ উঠছে।
গত ২৯ এপ্রিল ২০১৫ সালে আইন বিচার ও সংসদ মন্ত্রণালয়ের এক পরিপত্রের মাধ্যমে আইনে স্বীকৃত না থাকায় নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে না পড়ানোর নির্দেশ জারি করা হয়। তবে এসব নির্দেশের তোয়াক্কা না করে চলছে অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে পড়ানোর হিড়িক। এতে নানামুখী ঝুঁকিতে পড়েছেন অভিভাবক ও কন্যাশিশুরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী জর্জ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ফেনীতে ফলস কাবিন তথা অ্যাফিডেভিটের মাধ্যমে অহরহ বিয়ের ঘটনা ঘটছে। তারা একটি কাগজে বিয়ে দেখায় কিন্তু সরকারি বালামে উক্ত বিয়ের অস্তিত্ব থাকে না। তাহলে এটি কিসের বিয়ে? এজন্য কতিপয় কাজিদের লোভ লালসা ও নোটারি পাবলিকদের নৈতিক অবক্ষয় দায়ী।
সচেতন মহলের মতে এর স্থায়ী সমাধানের জন্য কয়েকটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, ভুয়া বয়স দেখিয়ে অ্যাফিডেভিট সম্পাদনকারী নোটারি পাবলিক ও তাদের সহযোগীদের সনদ বাতিল ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং অ্যাফিডেভিটের ভিত্তিতে কোনো কাজী যাতে নিকাহ রেজিস্ট্রি না করতে পারে সে বিষয়ে জেলা রেজিস্টার কার্যালয়ের কঠোর নির্দেশনা জারি রাখা। এছাড়া নোটারি পাবলিকের অ্যাফিডেভিট যে বিয়ের আইনি দলিল নয়—এ বিষয়ে স্কুল-কলেজ ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার চালানো। কেবল সামাজিক প্রতিরোধ নয়, এসব অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে।

অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্কুলে পড়াশোনার সময়ে প্রেমঘটিত কারণে অনেকে বাল্যবিয়েতে রাজি হয়। অনেকে পালিয়ে গিয়ে অ্যাফিডেভিট করে কোর্ট ম্যারেজ করে। অনেকে পালিয়ে গিয়ে এসব বিয়ের ঘোষণা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে। এতে অস্থিরতা বাড়ে পরিবারে। বাবা-মায়ের সম্মানহানি ঘটে। অনেক পরিবার লোকলজ্জার ভয়ে পরে এসব বিয়ে মেনে নিলেও বছর পার না হতে অনেক সময় এসব বিয়ে আর টিকে না। যার খেসারত দিতে হয় সবাইকে। এছাড়া বাল্যবিয়ের পর দ্রুত গর্ভধারণের ফলে জরায়ু জটিলতা, মাতৃমৃত্যু ও জেনোফোবিয়ার মতো শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাদের। পাশাপাশি, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে করা এসব বিয়ের কোনো সরকারি রেজিস্ট্রি বা ‘কাজি অফিসের নিকাহনামা’ না থাকায় পরে দাম্পত্য কলহ, যৌতুক দাবি বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে ভুক্তভোগী কিশোরী কোনো আইনি প্রতিকার পায় না।
দাগনভুঞা উপজেলার মাতুভুঞা ইউপির উত্তর আলিপুর গ্রামের বাসিন্দা ফারুক হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি কুয়েতে থাকি। আমার ছেলে সদ্য এসএসসি পাস করেছে। আমি ছুটিতে বাড়িতে গেলে হঠাৎ আমার বড় ছেলে মারুফ আমার ইমোতে একটি মেসেজ পাঠায়। ওপেন করে দিখি একটি কোর্ট ম্যারেজের নোটারি পাবলিকের স্ট্যাম্পের কপি। এটি পড়ার পর বুঝি সে একটি মেয়েকে কোর্ট ম্যারেজের মাধ্যমে বিয়ে করেছে। অথচ তার জন্ম তারিখ ১৩ জুলাই ২০০৮ সাল। সে মোতাবেক তার বয়স হয়েছে ১৮ বছর আর মেয়ের বয়স ১৬ বছর। অথচ তারা নোটারি পাবলিকের অ্যাফিডেভিটে বয়স দেখিয়েছে ছেলে ২১ মেয়ে ১৮। যার পুরোটা বানোয়াট। এ ঘটনায় আমার সংসার এলেমেলো হয়ে গেছে। পরে আরেকটি নোটিশ দিয়ে আমরা তালাকনামা পাঠিয়েছি।
সম্প্রতি ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার পূর্ব মির্জাপুর গ্রামের আবদুর রহিমের অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যা জান্নাতুল ফেরদৌস ও মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের জাফর উল্লার ছেলে জিহাদুল ইসলাম জিসান পালিয়ে কোর্ট ম্যারেজ করে। পরে তারা বাবা-মায়ের উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও বার্ত দেয়, যেখানে তারা বলে, আমরা দুইজন সম্মতিক্রমে বিয়ে করেছি। কেউ জোর করে আনেনি। আমাদের বাবা-মাকে বলব আপনারা ওর ফ্যামেলিকে হয়রানি করবেন না। আমরা কোর্টের মাধ্যমে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা কাবিনের মাধ্যমে বিয়ে করেছি। আপনারা আমাদের বিয়ে মেনে নিন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনীর রামপুর নাসির মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক রুমানা জাহান এশিয়া পোস্টকে বলেন, বাল্যবিয়ের শিকার হলে একটি কন্যাশিশুর স্বাভাবিক শৈশব ও ব্যক্তিত্বের বিকাশ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। এটি তার মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক অবস্থানকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত পারিবারিক দায়িত্ব, শ্বশুরবাড়ির চাপ এবং অকাল গর্ভধারণের ভয়ে কিশোরীরা তীব্র মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তায় ভোগে। খেলাধুলা ও পড়াশোনার বয়সে শারীরিক ও বৈবাহিক সম্পর্কে বাধ্য হওয়া কিশোরীর মনে গভীর মানসিক ক্ষত তৈরি করে।
তিনি আরও বলেন, পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়ে বাল্যবিয়ের শিকার কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার অন্যান্য নারীদের তুলনায় অনেক বেশি। পরিবার ও সমাজে নিজের মতামত প্রকাশের সুযোগ না পাওয়ায় তাদের আত্মবিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।
তাছাড়া বিয়ের পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েদের পড়াশোনা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়, যা তাদের ভবিষ্যৎ স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ নষ্ট করে দেয়।
সমবয়সী বন্ধু, সহপাঠী ও খেলার সাথীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কিশোরীটি চার দেয়ালের মাঝে বন্দি হয়ে পড়ে, ফলে তার সামাজিক বিকাশ থমকে যায়। কম বয়সে বিয়ে হওয়া নারীরা শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি থাকেন, কারণ তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকেন না। শিক্ষা ও দক্ষতার অভাবে এসব নারী সারাজীবন অর্থনৈতিকভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকেন, যা বংশানুক্রমিক দারিদ্র্য ও লিঙ্গবৈষম্যকে বজায় রাখে। এজন্য আইনের সঠিক প্রয়োগ করে অ্যাভিডেভিটের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে বন্ধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. আরিফুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, অপরিণত বয়সে কন্যাশিশুর বিয়ে হলে তার শরীর ও প্রজননতন্ত্র গর্ভধারণের জন্য পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয় না। ফলে গর্ভাবস্থা ও প্রসবের সময় শারীরিক জটিলতা তৈরি হয়। কিশোরীদের পেলভিক বোন পুরোপুরি সুগঠিত হয় না। ফলে প্রসবের সময় শিশু জন্মথলিতে আটকে যায়, যা মা ও শিশু উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক। দীর্ঘস্থায়ী ও বাধাপ্রাপ্ত প্রসবের ফলে প্রজনন অঙ্গের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ‘ফিস্টুলা’ হতে পারে। এর ফলে আজীবন অনিয়ন্ত্রিত প্রস্রাব বা পায়খানা ঝরার মতো যন্ত্রণাদায়ক ব্যাধি সৃষ্টি হয়। গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ এবং খিঁচুনির (এক্ল্যাম্পসিয়া) ঝুঁকি প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের তুলনায় কিশোরীদের অনেক বেশি থাকে। এছাড়া প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ মাতৃত্বকালীন মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। তাছাড়া এ সময়ে কিশোরীদের শরীর নিজেই বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় থাকে। এই অবস্থায় গর্ভধারণ করলে পুষ্টির ঘাটতিসহ রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। শারীরিক সম্পর্কের জন্য প্রজনন অঙ্গ পরিপক্ব না থাকায় অভ্যন্তরীণ ক্ষত, ইনফেকশন এবং পরবর্তী জরায়ুমুখের ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। প্রজনন অঙ্গের টিস্যু পাতলা ও নাজুক থাকায় এইচআইভিসহ অন্যান্য যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কাও বেশি থাকে। অন্যদিকে প্রাক-মেডিকেল মেয়াদে বা সময়ের আগেই সন্তান জন্মদান এবং কম ওজনের শিশু জন্ম নেয়। তাছাড়া ২০ বছরের কম বয়সী মায়েদের ক্ষেত্রে মৃত শিশু জন্মদান এবং জন্মের পরপরই শিশু মৃত্যুর হার বেশি দেখা যায়। বাল্যবিয়ে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ফেনী জেলা রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) আবদুর রহমান মুহাম্মদ তামিম এশিয়া পোস্টকে বলেন, মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ এবং মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধি ২০০৯ সংশোধনী ২০২৫ মোতাবেক কাজি ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে বিবাহ নিবন্ধন বৈধ নয়। যারা শুধুমাত্র নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে নিকাহনামা রেজিস্ট্রেশন ছাড়া বিয়ের কাজ সারেন তারা আইন ও বিধির বহির্ভূত কাজ করছেন। আইন ও বিধি মেনে বিবাহ নিবন্ধন করতে হবে। এ বিষয়ে সবার সচেতনতা জরুরি।
ফেনী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহাবুবুল করিম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ফেনীতে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে বন্ধে পিপি সাহেবকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন স্কুল কলেজ ও মাদরাসায় অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ চলমান রয়েছে। আশা করছি জনসচেতনার মাধ্যমে বিষয়টি দূরীকরণ করা হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সুশীল সমাজ যৌথভাবে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ফেনীতে অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাশিশুদের ভবিষ্যৎ আরও গভীর সংকটে পড়বে। যার মাধ্যমে অধিকার হারাবে কন্যাশিশুরা।