এক কেজি চিনি উৎপাদনে খরচ পড়ে প্রায় ১৮০ টাকা (১৭৯ টাকা ৮০ পয়সা)। অথচ সরকার নির্ধারিত দামে সেই চিনি ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে ১২৫ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কেজি চিনিতে গচ্চা যাচ্ছে প্রায় ৫৫ টাকা। উৎপাদন ব্যয় আর বিক্রয়মূল্যের এই বিশাল তফাত, জরাজীর্ণ যন্ত্রপাতি, মাঠ থেকে মিল পর্যন্ত আখ পৌঁছাতে বিলম্ব এবং নানা সিস্টেম লসে দিন দিন লোকসানের বোঝা ভারী হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে ঠাকুরগাঁও সুগার মিলস লিমিটেড।
কারখানার হিসাব শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ মাড়াই মৌসুমে চিনিকলটি লোকসান গুনেছে ৫০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো চূড়ান্ত না হলেও কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, এতে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪০ কোটি টাকা।
২০২৫-২৬ মাড়াই মৌসুমে মিলটিতে মোট ১ লাখ ৯০০ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৫ হাজার ৮৩৬ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করা হয়। কেবল উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান হিসাব করলে উৎপাদিত চিনির বিপরীতে গচ্চা গেছে প্রায় ৩২ কোটি টাকা। তবে এটি মিলের চূড়ান্ত লোকসান নয়। এর সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যয়, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন, মেরামত, জ্বালানি ও ঋণের সুদ যোগ হয়ে প্রকৃত লোকসান আরও অনেক বাড়ে।
কৃষকদের অনাগ্রহ
চিনিকলের মূল কাঁচামাল আখ। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী ফসল হওয়া এবং বাজারমূল্য ও দুর্ভোগের কারণে দিন দিন আখ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা। মাঠ পর্যায়ে কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বললে আখ চাষে অনাগ্রহের কারণ হিসেবে উঠে আসে নানা ভোগান্তির চিত্র।
সদর উপজেলার আঁকচা ইউনিয়ন রফিকুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘আখে প্রায় ১২ থেকে ১৩ মাস জমি আটকে থাকে। অথচ একই জমিতে বছরে আলু, ভুট্টা আর সবজি ফলিয়ে চারগুণ বেশি লাভ পাচ্ছি।’
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা চাড়োল ইউনিয়নের কৃষক আমজাদ হোসেন জানান, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের যে দাম, সে তুলনায় আখের দাম অনেক কম। তাছাড়া অন্যান্য লাভজনক শস্যে প্রতি বিঘায় যে লাভ আসে, আখে তার ধারেকাছেও যাওয়া যায় না।
একই এলাকার কৃষক সুবাস রঞ্জন দেবনাথ বলেন, মাঠ থেকে আখ কাটার পর মিল পর্যন্ত পৌঁছানোর পরিবহন খরচ এবং স্লিপ (কুপন) পাওয়ার বিড়ম্বনাতে চাষিদের অর্ধেক উৎসাহ মরে যায়। তেলের দাম ও গাড়ি ভাড়া বাড়ার পর আখ চাষে লোকসান ছাড়া কিছু থাকে না।
চলতি মৌসুমে ৭ হাজার একর জমিতে আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও বৈরী আবহাওয়া ও কৃষকদের ধীরগতির কারণে মাঠপর্যায়ে রোপণ কার্যক্রম আশানুরূপ গতি পাচ্ছে না।
পুরোনো যন্ত্রপাতি ও কম রিকভারি রেট
১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কারখানাটিতে ধুঁকে ধুঁকে চলছে মান্ধাতার আমলের যন্ত্রপাতি। মৌসুম শেষে নিজস্ব জনবল দিয়ে টানা সাত-আট মাস ধরে এসব যন্ত্রপাতি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চালাতে হয়। মিলটিতে চিনি আহরণের হার বা রিকভারি রেট ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ কেজি আখ মাড়াই করে চিনি পাওয়া যায় গড়ে সাড়ে ৬ কেজি। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে রিকভারি রেট ৮ থেকে ৯ শতাংশ। সময়মতো আখ মাড়াই ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে আহরণ বাড়িয়ে উৎপাদন খরচ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
৭০০ কোটি টাকার ঋণের বোঝা
বর্তমানে বিশ্বব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন উৎস থেকে নেওয়া ঋণ ও সুদে মিলটির মোট দায় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। কারখানাটিতে নিয়মিত ৫৭৩ জন শ্রমিক-কর্মচারী এবং মাড়াই মৌসুমে আরও ২৫০ জন মৌসুমি শ্রমিক কাজ করেন। চিনি বিক্রির সীমিত আয় থেকে তাদের বেতন-ভাতা ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে কর্তৃপক্ষের।
ঠাকুরগাঁও সুগার মিলস লিমিটেডের ডেপুটি অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার মো. রুস্তম আলী স্ট্রিমকে বলেন, গেল মৌসুমে ৫০ কোটি টাকা লোকসানের পর চলতি মৌসুমেও প্রায় ৪০ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। কেবল চিনি বিক্রি করে এই বিপুল ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়। মিলটিতে একটি আধুনিক ডিস্টিলারি প্ল্যান্ট স্থাপন করা গেলে উপজাত মোলাসেস (চিটাগুড়) থেকে অ্যালকোহল, ভিনেগার ও ফরেন লিকার তৈরি করে সহজে প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করে তোলা সম্ভব।
জমির ক্ষতিপূরণ ও আধুনিকায়নের দাবি
লোকসানের পাশাপাশি সম্প্রতি মিলের জমি হস্তান্তর নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। মিলের ২ হাজার ৯০০ একর জমির মধ্যে ৮০ দশমিক ৫৫ একর জমি ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে। এর ক্ষতিপূরণ বাবদ অর্থ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনকে (বিএসএফআইসি) প্রায় ৭৫ কোটি ৩২ লাখ ৪১ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।
তবে স্থানীয় শ্রমিক নেতাদের দাবি, এই অর্থ করপোরেশনের সাধারণ তহবিলে না রেখে সরাসরি ঠাকুরগাঁও সুগার মিলের আধুনিকায়নে ব্যবহার করা হোক।
কারখানাটির শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ রতন বলেন, ‘জমিটি ঠাকুরগাঁও মিলের। তাই এই ক্ষতিপূরণের অর্থ বিএসএফআইসির মূল তহবিলে না রেখে মিলটির আধুনিকায়ন ও স্বনির্ভরতায় ব্যয়ের জোর দাবি জানাচ্ছি।’
উপজাতে ঘুরতে পারে লোকসানের চাকা
কারখানার কর্মকর্তা ও শ্রমিক নেতারা বলছেন, শুধু আখ মাড়াই করে আর চিনি বিক্রি করে মিলটিকে লাভজনক করা সম্ভব নয়। দর্শনার কেরু অ্যান্ড কোম্পানির আদলে সেখানে আখের উপজাত ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে।
চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবির জানান, আধুনিক ডিস্টিলারি প্ল্যান্ট স্থাপন করা গেলে চিটাগুড় থেকে ইথানল, রেকটিফাইড স্পিরিট, ভিনেগার, হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং ওষুধশিল্পের মূল্যবান কাঁচামাল তৈরি করা সম্ভব। এতে চিনির ওপর একক নির্ভরতা কমবে এবং উপজাত পণ্য বিক্রির আয় দিয়ে মিলটি দীর্ঘদিনের লোকসান কাটিয়ে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হয়ে উঠতে পারবে।