‘যে জাতি শিশুদের বিড়ালের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ায়, তারা সিংহের সঙ্গে লড়াই শিখবে কীভাবে?’—এটি খুঁজে পেলাম অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ফাহাদ নামের ১৫ বছরের কিশোরের ফেসবুক পোস্টে। মোটরসাইকেল নিয়ে ১৫-২০ জনের মহড়ার একটি ভিডিওর ক্যাপশন এটি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি ট্রেন্ড হচ্ছে—বিশাল সব মহড়া, কার প্রতিপত্তি কত, কার দামি আইফোন বা মোটরসাইকেল আছে, সেটি যে যত জাহির করতে পারে। এর মধ্যেই যেন জীবনের সার্থকতা!
অপ্রতিমের মরদেহ পাওয়ার পর থেকে তার বাবা-মায়ের ওপর নেমে এসেছে সমালোচনার ঝড়। ছেলেটা এভাবে হারিয়ে যাওয়ার পেছনে তাদের ‘ব্যাড প্যারেন্টিং’কে প্রধান কারণ বলা হচ্ছে।
সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে আর কী করছে—তা সতর্কভাবে তদারকি না করার ‘দায়’ অপ্রতিমের বাবা-মা হয়তো কোনোদিনই এড়াতে পারবেন না। আমার প্রশ্নটি আসলে অন্য জায়গায়।
অনেকেই বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়া, টিকটক, বাইক বা আইফোন না দিয়ে অপ্রতিমকে যদি ভিন্নভাবে তার বাবা-মা গড়তেন, তাহলে হয়তো ছেলেটা আজও বেঁচে থাকত। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিপুল প্রসারের যুগে সব বাবা-মায়ের হাতে সেই সুযোগ কি আসলেই আছে?
যদি অপ্রতিমের বাবা-মা তাকে একদম ভিন্নভাবে গড়ে তুলতেন—যেখানে আইফোনের বদলে তার হাতে হয়তো বই থাকত। কিন্তু এই সময়ে সন্তানকে যদি আপনি স্রোতের বাইরে গিয়ে লালন-পালনের চেষ্টা করেন, এতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে—আপনার সন্তান ভুগবে হীনম্মন্যতায়। কারণ তার আশপাশের অনেকেই হয়তো আইফোন কিংবা ভাইরাল হওয়া নিয়ে উত্তেজিত। সেখানে সে ‘ওল্ড স্কুল’ ও ট্রেন্ডে গা ভাসাতে পারে না।
কল্পনা করুন, এই যুগে সন্তানকে আপনি তার কৈশোরে কোনো স্মার্টফোন দিলেন না। তাকে ছোট থেকেই অনেক বই পড়ালেন; খেলাধুলায় সংযুক্ত করলেন। স্রোতের বাইরে গিয়ে একটা সময় লক্ষ করলেন, আপনার সন্তান সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। তার সহপাঠী বা বন্ধুরা তার সঙ্গে মিশছে না। কারণ সে যখন ‘তিন গোয়েন্দা’ বা ‘শার্লক হোমস’ পড়ছে, তার বন্ধুরা তখন ভাবছে—কীভাবে বাবা-মায়ের কাছ থেকে আইফোন আদায় করা যায়।
কিশোর গ্যাং তো মহামারির রূপ নিয়েছে। আজ থেকে ১০-১৫ বছর আগেও কিশোর গ্যাং ছিল; কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির সহায়তায় এর ব্যাপ্তি বেড়েছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কার কাছে কোন অত্যাধুনিক অস্ত্র আছে, কার প্রতিপত্তি কত—এগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করার প্রবণতা। রাজধানীসহ দেশের অধিকাংশ জেলা শহরে চলছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য।
এই যুগে কার্বন মনোক্সাইডের চেয়েও স্লো-পয়জন হলো শর্ট-ফর্ম কনটেন্ট, যেটিকে আমরা ‘রিলস’ বলি। মানুষের মস্তিষ্কের ওপর এর চেয়ে ভয়াবহ প্রভাব আর কোনো কিছু রেখেছে কি না সন্দেহ। মনে হয় না, আমরা কখনো এখনকার মতো এত অস্থির ছিলাম। আমাদের ধৈর্যের সীমাও এত বেশি সংকুচিত হয়ে এসেছে যে, তা চিন্তা করে বের করার মতো মানসিক শক্তিও বোধহয় আর নেই।
কেবল ভার্চুয়াল জগতের কালচার নয়; আমাদের বাস্তব শারীরিক কাঠামোর সংকটও শিশুদের পথভ্রষ্ট করছে। শৈশব-কৈশোরে প্রিয় স্থানগুলোর একটি হলো খেলার মাঠ। কিন্তু শিশুদের জন্য মাঠে গিয়ে খেলার মতো নির্মল আনন্দের সুযোগ কি আমরা রেখেছি? ঢাকা শহরের দিকে তাকালে দেখতে পাই, খেলার জন্য পর্যাপ্ত উন্মুক্ত মাঠ নেই। মাঠ দখল করেছে বাণিজ্যিক ‘টার্ফ’। কিন্তু একবার টার্ফে খেলতে যাতায়াতসহ ৫০০ টাকার কম খরচ হয় না। অধিকাংশ পরিবারের সামর্থ্য নেই এটা বহনের। এ অবস্থায় খেলাধুলা ও শারীরিক বিকাশের সুযোগ না পেয়ে অলস সময় ও মানসিক শক্তি কিশোররা ব্যয় করছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সস্তা অ্যাটেনশন বা গ্যাং কালচারে।
এই শারীরিক-মানসিক বিনোদনের অভাবের পরিণতি আমাদের সবার সামনে দৃশ্যমান। এমন এক পরিবেশেই হয়তো অপ্রতিমের প্রাণটা নিদারুণভাবে চলে গেল।
তাহলে সমাধান কী? মাথা ব্যথা করলে তা কেটে ফেলাটা তো সমাধান নয়। তাই সোশ্যাল মিডিয়া বা প্রযুক্তি পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়।
বিশ্বজুড়ে যে সংকট আমরা দেখছি, সেখানে উন্নত দেশগুলোও জটিল চ্যালেঞ্জে পড়েছে। অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১৫-১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া নিষেধাজ্ঞার আইন হলেও তার বাস্তবায়ন সহজ হচ্ছে না। কিশোররা ভিপিএন ব্যবহার করে বয়স লুকিয়ে আইন এড়াচ্ছে। কোনো কোনো দেশে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জটিলতায়ও তা আটকে যাচ্ছে। শুধু আইন করে সোশ্যাল মিডিয়ায় বয়সভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা যে কত কঠিন, এ চিত্রটি তার প্রমাণ।
এখন নিষেধাজ্ঞায়ও যদি কাজ না হয়, তবে আমাদের পথ কী? এখানেই প্রয়োজন প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, খেলার মাঠ পুনরুদ্ধার, রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামাজিক শিক্ষার সমন্বিত উদ্যোগ।
উন্মুক্ত খেলার মাঠ ও মেধা বিকাশের সুযোগ তৈরি
নগর পরিকল্পনায় সিটি কর্পোরেশনকে প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি করে উন্মুক্ত খেলার মাঠ নিশ্চিত করতে হবে। যেসব টার্ফ তৈরি হয়েছে, সেগুলোতে শিশুদের জন্য দিনের নির্দিষ্ট সময় বিনামূল্যে খেলার বাধ্যবাধকতা রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠগুলোকে বিকেলে সাধারণ শিশুদের খেলার জন্য উন্মুক্ত রাখার ব্যবস্থা করা জরুরি।
ডিজিটাল আইডেন্টিটি ও প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা
শুধু নামমাত্র বয়স যাচাই না করে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে ডিজিটাল আইডেন্টিটি যুক্ত করে অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করতে হবে। ফেসবুক, টিকটক বা অন্যান্য বহুজাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাধ্য করতে হবে, যাতে তারা অ্যালগরিদম সংশোধন করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাছে ক্ষতিকর কনটেন্ট পৌঁছে না দেয়।
পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ
অ্যারিস্টটল তাঁর ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থে লিখেছিলেন, ‘পরিবার হলো প্রকৃতির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এমন এক প্রাথমিক প্রতিষ্ঠান, যা মানুষের প্রতিদিনের চাহিদা মেটায়।’
মানুষ সমাজ বা রাষ্ট্রীয় জীবনে বাস করার প্রথম নৈতিক গুণাবলি পরিবার থেকেই শেখে। ডিজিটাল যুগে অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে হলে পিতামাতাকেও প্রযুক্তিবান্ধব হতে হবে। সন্তানের ডিভাইসে ‘প্যারেন্টাল কন্ট্রোল’ অ্যাপ ব্যবহার এবং স্ক্রিনটাইম বেঁধে দেওয়া সময়ের দাবি।
শিক্ষা কাঠামোর সংস্কার
মানুষ হিসেবে বিকাশের শুরু হয় শৈশবে। ভবিষ্যৎ গতিপথের নকশা সাজানোর সর্বোত্তম সময় এটি। নৈতিকতা, মূল্যবোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সঠিক ও পরিপূর্ণ ধারণার বীজ বপনের সবচেয়ে উর্বর সময় এটি। এ বিষয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অনেক। তাই প্রয়োজন প্রাথমিক শিক্ষার কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন।
শৈশব-কৈশোরে সঠিক কিংবা ভুল নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করার ক্ষমতা তাদের থাকবে না, এটিই অনুমেয়। কিন্তু এই বয়সেই যদি নৈতিকতার চর্চা শুরু না হয়, তাহলে জীবনের পরবর্তী ধাপে গিয়ে এই শিশু-কিশোররাই যে ধ্বংসের কারণ হবে না—তার নিশ্চয়তা কী?
আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার কাঠামোতে পড়াশোনা, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, ধর্ম চর্চার পাশাপাশি নৈতিকতা, মূল্যবোধ, বিশেষ করে পরমতসহিষ্ণুতা চর্চার পদক্ষেপ থাকা জরুরি। স্কুলে শিশুরা শুধু গণিত, বিজ্ঞান বা ইংরেজি নয়; বরং মানুষ হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করবে। জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনও এ কাঠামোর অংশ হওয়া উচিত। শিক্ষা একই সাথে হোক প্রয়োজন ও আনন্দের উৎস।
আর কিশোর গ্যাংয়ের সমস্যা দূরীকরণে এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণগুলোর গভীরে যেতে হবে। কিশোররা কেন নিজেদের গড়ে তোলার সময়ে এমন মরণফাঁদে পা দিচ্ছে, সেদিকে নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে কারা এর পৃষ্ঠপোষক বা ‘বড় ভাই’, সেটা চিহ্নিত করে সর্বনাশের এই শেকল ভাঙতে হবে।
- মো. সাদমান তকী মিঞা: প্রকৌশলী