দ্বিতীয় স্ত্রী মোছাম্মৎ মরিয়ম খাতুনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় নারীকাণ্ডের বিতর্কিত এমপি গাজী নজরুল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আপত্তিকর ভিডিও ভাইরালের পর থেকে সম্পর্কের অবনতি, মরিয়মের মামার সঙ্গে দ্বন্দ্ব এবং প্রথম স্ত্রীকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়গুলো মরিয়মের মনে ধীরে ধীরে চরম ক্ষোভ জন্ম নেয় বলে জানা গেছে। মৃত্যুর আগে মরিয়মের লিখে যাওয়া চিরকুট ও বাবার কাছে ফোন করে জানানো অভিযোগগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে-চরম মানসিক ট্রমায় সংসার চালিয়ে যাচ্ছিলেন মরিয়ম।
তবে এসব কিছুকে ছাপিয়ে রহস্যের জন্ম দিয়েছে সাতক্ষীরার দুই ব্যক্তি। সাতক্ষীরার মানুষ মঞ্জু সরদার ও সোবহান গাজী নামের এই দুই ব্যক্তিকে গাজী নজরুল ইসলামের ডান ও বাঁ-হাত হিসেবেই চেনে। একাধিক সূত্র বলেছে, গাজী নজরুলের যত অপকর্মের সাক্ষী হলেন এই দুই ব্যক্তি। ন্যাম ভবনের ওই বাসায় আসাযাওয়া ছিল এই দুজনের। ঘটনার দুই দিন আগে তাঁরা ন্যাম ভবনে এমপি নজরুলের বাসভবনে আসেন। মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পরই তাঁরা লাপাত্তা। একাধিক সূত্র বলেছে, তাঁরা দুজন কেন ওই বাসায় এসেছিলেন-সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে গোয়েন্দারা। তাঁদের দুজনকে আটক করার চেষ্টা চলছে বলে নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র। এমপি নজরুলের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, মঞ্জু সরদার ও সোবহান গাজীর সঙ্গে কোনো রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও নজরুলের সব গোপন কাজের সাক্ষী ছিলেন তাঁরা। গোয়েন্দারা এখন এই দুই ব্যক্তির খোঁজ করছে।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বাসিন্দারাও এই দুইজনকে এমপির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবেই চেনেন। প্রায়ই তাঁরা ঢাকার ন্যাম ভবনে নজরুলের বাসায় আসতেন। ঘটনার দিন সকালে গাজী নজরুল ইসলাম আদালতে যাওয়ার পরেও ওই দুই ব্যক্তি বাসাতেই ছিলেন। রহস্যজনক কারণে ঘটনার পর থেকে তাঁরা হাওয়া হয়ে যান। গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, ওই দুজনকে আটক করা গেলে মরিয়মের মৃত্যুরহস্যের জট খুলতে পারে। কারণ তাঁদের ওই বাসায় অবস্থান করা ও হুট করেই লাপাত্তা হয়ে যাওয়া সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। তাঁদের আটক করে এমপি নজরুলের মুখোমুখি করা হতে পারে বলে জানা গেছে। এদিকে বিভিন্ন কারণে পারিবারিক কলহের বিষয়টি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন গাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর প্রথম স্ত্রী মোছাম্মৎ মাকছুদা ইসলাম কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছেন তাঁর দায়। তবে মরিয়মকে দূরে রাখতে তিনিও ভূমিকা রেখেছেন বলে ধারণা করছে পুলিশ। গতকাল তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে মেয়ের মৃত্যুর পেছনে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছেন মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ। গতকাল শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গের সামনে আহাজারি করতে করতে এমপি নজরুলসহ অন্যদের বিচার দাবি করেন তিনি। এ সময় মরিয়মের মাকেও আহাজারি করতে দেখা যায়। মাসুম বিল্লাহ বলেন, সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীরা যেন শাস্তি পায়। এ ঘটনার জন্য নিজের শ্যালক ওবায়দুর রহমানকে (মামলার আসামি) দায়ী করে মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘মরিয়ম বলত, আমি বাইরে মুখ দেখাব কীভাবে। সে আমার মামা, আমার এত বড় ক্ষতি করবে আমি বুঝতে পারিনি। আমি বাপের থেকে তাঁকে বেশি বিশ্বাস করতাম। বিশ্বাস করে আজকে আমি ওই পরিণতি ভোগ করতেছি।’
ময়নাতদন্ত শেষে লাশ গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগরে নেওয়া হয়। তবে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ার ১৭ হাজার টাকা ধার করেন মরিয়মের বাবা। এই বিপদের সময়েও এমপি নজরুলের পরিবার তাঁদের কোনো খোঁজ নেয়নি বলেও অভিযোগ করেন মাসুম বিল্লাহ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই মরিয়ম খাতুনের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয় এমপি গাজী নজরুল ইসলামের। এরপর এমপি, তাঁর প্রথম স্ত্রী-এমনকি পিএস হাসান মরিয়মকে কটু কথা বলতেন। অনেক সময় গালিগালাজও করতেন। বাসাতে তিনটি বেড রুম থাকলেও দুই বউকে নিয়ে একই রুমে থাকতেন গাজী নজরুল। এটিতে মরিয়ম চরম আপত্তি জানান। তিন রুমের একটিতে মাঝেমধ্যে থাকতেন পিএস হাসান। ওই রুমে মরিয়মকে থাকতে বলা হয়। এতে মরিয়ম রাজি হননি। পরে যে রুমে ঝুলন্ত লাশ পাওয়া যায় সেই রুম মরিয়মকে দেওয়া হয়। কয়েক দিন ধরে ওই রুমে থাকছিলেন মরিয়ম।
রুম আলাদা হওয়ার পর এমপি গাজী নজরুলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। যা তাঁর মনে চরম ক্ষোভের জন্ম দেয় এবং বাসাটি তাঁর কাছে একপ্রকার মানসিক টর্চার সেল হয়ে ওঠে। ঘটনার দিন সকাল ৭টায় বাসা থেকে বের হয়ে আদালতে যান গাজী নজরুল। ফেরেন বেলা আড়াইটার দিকে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গাজী নজরুল পুলিশকে জানিয়েছেন, দুপুরে একসঙ্গে দুই স্ত্রীকে নিয়ে খাবার খেয়েছেন। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে মরিয়ম নিজ রুমে চলে যান। এর ঘণ্টাখানেক পর ডাকাডাকি করে কোনো সাড়া না পেয়ে জানালা দিয়ে ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান।
করা হতো শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন
লাশ উদ্ধারের পর গত রবিবার রাতেই গাজী নজরুল, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ও শ্যালক ওবায়দুর রহমানকে আসামি করে আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা করেন মরিয়মের বাবা। মামলার এজাহারে মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করেন, গত জুনে তাঁর শ্যালক ওবায়দুর রহমানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের সঙ্গে বাদীর বড় মেয়ে মরিয়মের বিয়ে হয়। সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে সরকারি ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটে নজরুল ও মাকছুদার সঙ্গে থাকতেন মরিয়ম। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নজরুল ও মাকছুদা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে মরিয়ম তাঁদের ফোন করে জানাতেন। এরই মধ্যে রবিবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে নজরুল মোবাইল ফোনে শ্বশুরকে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে মরিয়মকে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে থাকতে দেখেন। মাসুম বিল্লাহর ধারণা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন মরিয়ম। মামলার তদন্ত বিষয়ে শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মো. মনিরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘কিছু ক্লু আমরা পেয়েছি। তদন্তের স্বার্থে বলতে চাচ্ছি না। রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদে মরিয়মের মৃত্যুর রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছি।’
শ্যামনগরে নজরুলের কুশপুতুল দাহ : বিতর্কিত এমপি নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের রহস্যজনক ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে সাতক্ষীরায় তাঁর নিজ নির্বাচনি এলাকা। ঘটনাটির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, মূল রহস্য উন্মোচন এবং অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবিতে শ্যামনগরে সর্বস্তরের সচেতন জনতার অংশগ্রহণে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ ও কুশপুতুল দাহ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। গতকাল দুপুর ১২টায় শ্যামনগর উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে থেকে সচেতন নাগরিক সমাজ-এর ব্যানারে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা বলেন, তরুণী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুকে কোনোভাবেই ধামাচাপা দিতে দেওয়া হবে না।
নির্বাচনের সময় এলাকার সাধারণ মানুষকে নানা প্রতিশ্রুতি ও ভুল বুঝিয়ে ভোট আদায়কারী এই নেতার অনৈতিক কর্মকাণ্ডে বহু আগেই জনমনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল। যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়ায় সুষ্ঠু তদন্ত সম্পন্ন করে মরিয়মের মৃত্যুর সঠিক কারণ উন্মোচন করতে হবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে তাঁর ফাঁসি নিশ্চিত করতে হবে। উল্লেখ্য গত জুলাইয়ে মরিয়মের সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় তোলেন জামায়াত থেকে বহিষ্কার হওয়া বিতর্কিত এমপি নজরুল ইসলাম। অভিযোগ ওঠে মরিয়মকে চাকরির প্রলোভন ও তাঁর বাবাকে ঠিকাদারির মাধ্যমে কোটিপতি বানানোর স্বপ্ন দেখিয়ে এ সম্পর্কে জড়ান এমপি নজরুল।