ফেনী জেনারেল হাসপাতাল ২৫০ শয্যার। অথচ নিয়মিত ভর্তি থাকছেন ৫০০-র বেশি রোগী। গতকাল রবিবারও ভর্তি ছিলেন ৫৬৭ জন। রোগীর চাপ সামলাতে যখন হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, তখন চিকিৎসকের ৭৪টি পদের মধ্যে ৩১টি এবং সেবিকার ২২০টি পদের মধ্যে ৭৮টিই শূন্য। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ১০৬টি পদের মধ্যে শূন্য ৭৪টি। এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি চিকিৎসা-যন্ত্র অচল থাকায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। শয্যা না পেয়ে মেঝেতে থাকতে হচ্ছে অনেক রোগীকে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ফেনীর ছয় উপজেলা ছাড়াও চট্টগ্রামের মিরসরাই, নোয়াখালীর সেনবাগ ও কোম্পানীগঞ্জ এবং কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন এখানে। প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। ফলে বহির্বিভাগের পাশাপাশি অন্তর্বিভাগেও থাকে অতিরিক্ত চাপ।
গতকাল হাসপাতালটিতে ভর্তি ছিলেন ৫৬৭ জন। এর মধ্যে ৩১ শয্যার মেডিসিন ওয়ার্ডেই ছিলেন ১১১ জন। ডেঙ্গু, শিশু ও অন্যান্য ওয়ার্ডেও নির্ধারিত শয্যার চেয়ে ভর্তি রয়েছেন বেশি রোগী। অতিরিক্ত রোগীর কারণে অনেককে শয্যার বদলে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
হাসপাতাল প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসকের ৭৪টি পদের মধ্যে ৩১টি শূন্য। কার্ডিওলজি, মেডিসিন, শিশু, চর্ম ও যৌন, ডেন্টাল, চক্ষু, গাইনি, রেডিওলজি ও ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্টের একটি করে পদও শূন্য রয়েছে। সবচেয়ে বেশি সংকট সহকারী সার্জন পদে। ১৭টির মধ্যে ১৬টিই শূন্য।
চিকিৎসকের পাশাপাশি সেবিকা সংকটও প্রকট। ২২০টি পদের বিপরীতে শূন্য ৭৮টি। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ১০৬টি পদের মধ্যে ৭৪টি শূন্য। ফলে রোগীদের চিকিৎসা ও সেবা দেওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালাতেও কর্মীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী রুবেল হোসেন জানান, বেশ কিছু পদ শূন্য থাকায় অল্পসংখ্যক কর্মীকে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে তাদের ওপর তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত চাপ।
সেবিকা মিতালী রানী বলেন, ‘হাসপাতালে সবসময় রোগীর চাপ থাকে। অল্পসংখ্যক সেবিকার পক্ষে পাঁচ শতাধিক ভর্তি রোগীকে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া কঠিন।’
জনবল সংকটের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি ও অচল যন্ত্রও চিকিৎসাসেবায় সমস্যা তৈরি করছে। হাসপাতালের চারটি এক্স-রে মেশিনের তিনটিই অচল। তিনটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের একটি এবং সাতটি ইসিজি মেশিনের দুটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে রোগীর চাপের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতেও ভোগান্তি হচ্ছে।
ডায়ালাইসিস সেবাতেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা। হাসপাতালে থাকা ১০টি ডায়ালাইসিস যন্ত্রের একটি অচল। কিডনিজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ায় আরও ১০টি যন্ত্রের চাহিদা জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্র পাওয়া গেলে ডায়ালাইসিস সেবা বাড়ানো সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের চিকিৎসক ডা. কামরুজ্জামান জিকু বলেন, ‘চিকিৎসকের বেশ কিছু পদ শূন্য থাকার পরও তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন সেবা অব্যাহত রাখার।’
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোবারক হোসেন দুলাল বলেন, শূন্য পদগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসক ও সেবিকা নিয়োগ দেওয়া হলে সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘ফেনীতে কিডনি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ডায়ালাইসিস সেবার জন্য হাসপাতালের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো রয়েছে। সেবা বাড়াতে আরও ১০টি ডায়ালাইসিস যন্ত্রের চাহিদার কথা জানানো হয়েছে।’
২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে নিয়মিত রোগী ভর্তি থাকছেন শয্যার দ্বিগুণেরও বেশি। এর সঙ্গে চিকিৎসক-সেবিকার শূন্য পদ এবং গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির অচলাবস্থায় ফেনী জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।