Image description

রাজধানী ঢাকাবাসীদের জন্য ভারি বৃষ্টি মানেই যেন এক চেনা দুর্ভোগ–কাদাপানিতে নেমে কাজে যাওয়া। জমা পানিতে আটকে পড়া পথচারী আর থমকে যাওয়া যানবাহনের চেনা ছবির পেছনে রয়েছে শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার এক বড় ব্যর্থতা। বিশেষ করে বৃষ্টির পানি নদী বা খালে সরিয়ে নেওয়ার জন্য বানানো বেশ কয়েকটি স্লুইস গেট এখন আর কোনো কাজেই আসছে না।

বুড়িগঙ্গা নদী ঘেঁষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রয়েছে ৫৫টি স্লুইস গেট। কিন্তু এর মধ্যে পুরোপুরি চালু আছে মাত্র ২৪টি, হালকা কাজ করে ১৫টি, আর বাকি ১৬টি একেবারেই অচল হয়ে পড়ে আছে। ফলে বৃষ্টি হলেই ডুবছে ঢাকা।

সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বাবুবাজার থেকে কামরাঙ্গীরচর এলাকায়। সেখানকার অধিকাংশ স্লুইস গেট অকেজো হয়ে থাকায় আশপাশের জমা পানি স্বাভাবিক নিয়মে নামতে পারছে না।

অনেক জায়গায় ড্রেনের পানি নির্দিষ্ট চ্যানেল দিয়ে না গিয়ে নদীরক্ষা দেয়ালের ফাঁকফোকর দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। ফলে ভারি বৃষ্টির পর পানি সরতে দ্বিগুণ সময় লাগে, আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির নিচে ডুবে থাকে পুরান ঢাকার নিচু এলাকা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিবেশ, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) রাজিব খাদেম টাইমসকে বলেন, ‘স্লুইস গেট তো সব সময় খোলা রাখা যায় না। জোয়ারের সময় এগুলো খোলা রাখলে বুড়িগঙ্গার পানি উল্টো শহরের ভেতরে ঢুকে পড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অধিকাংশ গেটই এখন নষ্ট। তা ছাড়া এগুলো চালানো বা দেখাশোনার জন্য যে ধরনের লোকবল ও ব্যবস্থা দরকার, তা-ও আমাদের নেই।’

আর এই অব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থতার মাশুল প্রতি বর্ষায় দিতে হচ্ছে পুরো শহরবাসীকে।

রোববার সকালে হঠাৎ বৃষ্টির কারণে কাজে ও স্কুলে বের হওয়াদেরকে চরম বিপাকে পড়তে হয়। এজি চার্চ স্কুলে শরৎ উৎসব হওয়ার কথা থাকলেও তা বাতিল করা হয়। কারণ, অভিভাবকদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, রাস্তার পানির কারণে শিক্ষার্থীরা স্কুলে পৌঁছাতে পারবে না।

জলাবদ্ধতার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি বিভাগের পরীক্ষাও বাতিল করতে হয়।

দুপুরের পর নিউ মার্কেট, ধানমন্ডি, জিগাতলা, মালিবাগ, রাজারবাগ, শান্তিনগর, শুক্রাবাদ, আজিমপুর, মিরপুর, মগবাজার, গ্রিন রোড, বংশাল ও আরামবাগের মতো এলাকাগুলোতে পানি জমে থাকে।

 

যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, মতিঝিল, কমলাপুর ও গুলিস্তানের মতো ব্যস্ত সড়কেরও ছিল একই দশা। গাড়ি চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাধ্য হয়ে মানুষ নোংরা পানি ভেঙে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছান।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, শহরের অন্তত ১২৯টি জায়গায় নিয়মিত পানি জমে থাকে। এর মধ্যে ৭৯টি দক্ষিণ সিটির এবং ৫০টি উত্তর সিটির এলাকায়।

এসব জায়গার মধ্যে উত্তর সিটির ১৫টি এবং দক্ষিণ সিটির ৩৩টি এলাকাকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ বা ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নগরবাসীর কাছে এই সমস্যা যেন এক বার্ষিক নাটকে পরিণত হয়েছে-প্রতিবছর শুধু আশ্বাসই আসে, কিন্তু ভোগান্তি কমে না।

পুরান ঢাকার জেলখানা রোডে হাঁটু পানিতে বাইক নষ্ট হওয়ার পর ক্ষোভ প্রকাশ করে রাহুল সাহা নামের এক পথচারী বলেন, ‘জন্মের পর থেকেই এই কষ্ট দেখে আসছি। কত শত প্রকল্প করা হলো, অথচ বর্ষা এলেই পরিস্থিতি যেমন ছিল তেমনই রয়ে যায়।’

 

চাপের মুখে পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থা

বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পুরান ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মূলত ঢালু জায়গার ওপর নির্ভর করে তৈরি। সাধারণ নিয়মে বৃষ্টির পানি এসব স্লুইস গেট দিয়ে গড়িয়ে বুড়িগঙ্গায় গিয়ে পড়ার কথা।

কিন্তু বর্ষার সময় নদীতে পানি বাড়লে নদী শহরের চেয়ে উঁচুতে চলে আসে, তখন গেটগুলো বন্ধ রাখতে হয়। তখন শহরের পানি নামাতে পাম্প মেশিনের ওপর নির্ভর করতে হয়, যেগুলো আগে থেকেই দুর্বল ও অপর্যাপ্ত।

২০২১ সালের আগে শহরের পানি সরানোর মূল দায়িত্বে ছিল ঢাকা ওয়াসা। সংস্থাটি ২০১৫ সালে একটি মহাপরিকল্পনা (মাস্টার প্ল্যান) তৈরি করলেও, খাল ও ড্রেনেজের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের কাছে চলে যাওয়ার পর সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন হয়নি।

কোনো নতুন সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়াই গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে দুটি সিটি করপোরেশন আলাদা আলাদা প্রকল্প চালিয়ে আসছে। হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও বহু এলাকায় জলাবদ্ধতা কমার বদলে আরও বেড়েছে।

প্রকৌশলী রাজিব খাদেম জানান, ওয়াসা থেকে সিটি কর্পোরেশন ড্রেনের দায়িত্ব পেলেও স্লুইস গেট চালানোর মতো জনবল ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এখন অতিরিক্ত লোকবল, বাজেট ও গেট মেরামতের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। পাশাপাশি ‘ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং’ (আইডব্লিউএম) স্লুইস গেটগুলোর কারিগরি অবস্থা পরীক্ষা করে দেখছে।

তবে সমস্যা শুধু স্লুইস গেটে আটকে নেই। ঢাকা দক্ষিণ সিটির তথ্য বলছে, পানি নিষ্কাশনের আটটি প্রধান পয়েন্টে ৩টি করে মোট ২৪টি বড় পাম্প আছে। কিন্তু প্রতি তিনটির একটি পাম্প দীর্ঘদিন ধরে পুরোপুরি নষ্ট। বাকি দুটি পাম্পও পুরো শক্তিতে কাজ করতে পারছে না।

দুটি সিটি করপোরেশনের ড্রেন পরিষ্কারের ৫টি মেশিনের মধ্যে একটি ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী। তা ছাড়া, সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ২৬টি খালের অনেক অংশ ভরাট হয়ে পানি চলাচলের ক্ষমতা হারিয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন জানায়, তারা ১ থেকে ৫ নম্বর জোনে জলাবদ্ধতার আসল কারণ বের করতে আইডব্লিউএমকে গবেষণা করার দায়িত্ব দিয়েছে।

 

এই গবেষণার ওপর ভিত্তি করে ড্রেনেজ ব্যবস্থা আধুনিক করা, নষ্ট স্লুইস গেট মেরামত করা, পাম্পের ক্ষমতা বাড়ানো, পানি সরানোর পথ ছোট করা এবং নতুন পানি টানার পাম্প বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে পরবর্তী ভারি বৃষ্টি আসার আগেই এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়ে ঢাকাবাসী কোনো স্বস্তি পাবে কি না–সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।