Image description

জনবহুল স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে আগুন দেয়ার ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিকভাবে এমন ঘটনা ঘটছে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির মধ্যেই এসব ঘটনাকে অনেকে আগুন সন্ত্রাস হিসেবে দেখছেন। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এসব ঘটনার ছবি ও ভিডিও প্রচার এবং এ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিদেশে পালিয়ে থাকা দলটির নেতাদের নির্দেশেই দুর্বৃত্তরা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। নাশকতাকারী এসব দুর্বৃত্তদের খুঁজে বের করতে তৎপরতা শুরু করেছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
শুক্রবার থেকে রোববার বিকাল পর্যন্ত রাজধানীর ১৫টি স্থানে ২২টি ককটেল বিস্ফোরণ এবং ৯টি বাস ও ১টি পিকআপে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

পরিস্থিতি সামলাতে রাজধানী জুড়ে বাসা-বাড়ি, আবাসিক হোটেল ও মেসে ব্লক রেইড শুরু করেছে পুলিশ। বসানো হয়েছে দুই শতাধিক চেকপোস্ট। এরই মধ্যে যাত্রাবাড়ীতে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, আজিমপুরে বাসে আগুন দেয়ার সময় এক যুবলীগ নেতাকে হাতেনাতে এবং ধানমণ্ডিতে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা সন্দেহে আরেক আওয়ামী লীগ নেতাকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি এভাবে চললে দুর্বৃত্তরা বড় নাশকতা করতে পারে। তাই তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। না হলে জননিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকে এই নাশকতার শুরু। ওইদিন দুপুর ২টায় মালিবাগ ফরচুন শপিং মল ও সোহাগ কাউন্টারের সামনে পর পর দু’টি ককটেল বিস্ফোরণের মধ্যদিয়ে শুরু হয় নাশকতা। এরপর সন্ধ্যা ৬টার দিকে মহাখালী ফ্লাইওভার ও আগারগাঁও বেতার ভবনের সামনে তিনটি বিস্ফোরণ ঘটে। সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটে যাত্রাবাড়ীতে। থানার প্রধান ফটক ও চৌরাস্তার ট্রাফিক বক্সের সামনে পর পর চারটি ককটেল বিস্ফোরণে ইবাদুর রহমান নামে এক অটোরিকশাচালক আহত হন। রাত সাড়ে ৮টা থেকে ১১টার মধ্যে বাবুবাজার ব্রিজের নিচে মাজার, মগবাজার চৌরাস্তা জামে মসজিদ, বঙ্গবাজার, গুলিস্তান, সাইন্স ল্যাব ও রামপুরা বিটিভি ভবনের সামনে আরও ছয়টি বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা।

শনিবার দ্বিতীয় দফায় হামলা হয়। সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে মিরপুর-১ নম্বরে অভিজাত পরিবহন ও পল্লবী-১১ নম্বরে শিকড় পরিবহনের দু’টি চলন্ত বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। পল্লবী থানার ওসি হাসান বাছির জানান, যাত্রীবেশে বাসে উঠে আগুন লাগিয়ে নেমে যায় তারা। প্রায় একই সময় মধ্য বাড্ডা ইউলুপের নিচে আলিফ পরিবহনের একটি স্টাফ বাসে আগুন দেয়া হয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার সামনে জব্দ করে রাখা একটি পিকআপে আগুন দেয়া হয়। এদিন সন্ধ্যায় যাত্রাবাড়ী মোড়ে সামাদ সুপার মার্কেটের সামনে আরও চারটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। এতে বিল্লাল নামে এক রিকশাচালক আহত হন। যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ রাজু বলেন, ফ্লাইওভারের ওপর থেকে ককটেলগুলো ছোড়া হয়েছে।

গতকাল বিকাল পর্যন্তও থামেনি নাশকতা। দুপুর সোয়া ১টার দিকে হাইকোর্টের সামনের সড়কে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। এ ছাড়া, মৎস্য ভবন মোড়ে দুপুর দেড়টায় ও শিল্পকলা একাডেমি’র সামনে বিকালে আরও একটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা। এর আগে শনিবার গভীর রাতে শাহবাগে তিন নেতার মাজারের পাশে এবং কমলাপুর রেলস্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফরমের নির্জন অংশে আরও দু’টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। সবমিলিয়ে শুক্রবার ১৩টি, শনিবার ৬টি ও রোববার ৩টি সহ মোট ২২টি ককটেল বিস্ফোরণ এবং ১০টি বাস ও ১টি পিকআপে আগুনের ঘটনা ঘটেছে।

ককটেল বিস্ফোরণের পাশাপাশি শুক্রবার রাতেই কাফরুল থানার সামনে মিরপুর সুপার লিংক পরিবহন, কলেজগেট ও চিটাগাং রোড হাইওয়েতে তিনটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয়া হয়। ফায়ার সার্ভিসের দু’টি ইউনিট গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। শনিবার ৬টি যানবাহনে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। মিরপুর-১১-তে জমজম টাওয়ারের সামনে শিকড় পরিবহনের একটি চলন্ত বাসে আগুন দেয়া হয়। এ ছাড়া, মিরপুর-১ অভিজাত পরিবহন, রাত ৮টার দিকে প্রগতি সরণিতে ১টি, মাতুয়াইল এলাকায় ১টি, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার সামনে ১টি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেয়া হয়। শনিবার দিবাগত রাতে ঢাকার বাইরে ময়মনসিংহ ও রাজবাড়ীতে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। আর শনিবার পল্লবীতে একটি বাসে আগুন দেয়া হয়।

পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, এই ঘটনার পর নড়ে চড়ে বসেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও প্রবেশমুখে ২১০টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। নাশকতাকারীদের খুঁজতে রাজধানী জুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাজধানীর চার প্রবেশমুখে চলছে কঠোর তল্লাশি। পুলিশ, ডিবি ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের যৌথ দল প্রতিটি বাস, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল থামিয়ে তল্লাশি করছে। ফ্লাইওভারের উপর থেকেও নজরদারি করা হচ্ছে, যাতে উড়াল সড়ক থেকে ককটেল ছুঁড়ে কেউ পালাতে না পারে। একইসঙ্গে শুরু হয়েছে বাসাবাড়ি, মেস ও আবাসিক হোটেলে ব্লক রেইড। পল্টন, গুলিস্তান, মহাখালী, মিরপুর-১, মিরপুর-১১ ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকার শতাধিক হোটেল-মেসে শনিবার রাতভর অভিযান চালানো হয়। বৈধ কাগজপত্র না থাকা, ভুয়া নামে রুম ভাড়া নেয়া এবং সন্দেহজনক চলাফেরার কারণে আটক করা হয়েছে অনেককে। অনেক বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে অবিস্ফোরিত ককটেল, পেট্রোলভর্তি বোতল ও সরকারবিরোধী লিফলেট। ডিএমপি কন্ট্রোলরুম থেকে সব থানাকে বেতার বার্তায় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ইউনিফর্মের পাশাপাশি সাদা পোশাকে বিপুলসংখ্যক গোয়েন্দা সদস্য মাঠে কাজ করছে। পুলিশ বলছে, এই নাশকতার ধরন একেবারেই নতুন। যাত্রীবেশে বাসে উঠে আগুন দিয়ে নেমে যাওয়া এবং থানার সামনেই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে চ্যালেঞ্জ ছোড়া হচ্ছে।

তাই শুধু রাস্তায় নয়, অনলাইনেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত আওয়ামী লীগ নেতা যাত্রাবাড়ী ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। শনিবার ভোরে তার ভাড়া বাসা থেকে ৪টি অবিস্ফোরিত ককটেল, বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম ও লিফলেট উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেছেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বার্তার পর দলীয় গ্রুপে রাজধানীতে আতঙ্ক তৈরির নির্দেশনা আসে। থানা ও গণপরিবহনকে টার্গেট করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, এই নাশকতার পেছনে তিনটি স্তর কাজ করছে। একটি অর্থায়ন, দ্বিতীয়টি বোমা তৈরি ও তৃতীয়টি মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন। গ্রেপ্তার হওয়া নেতা দ্বিতীয় স্তরের। মূল পরিকল্পনাকারীদের ধরতে অভিযান চলছে। পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ফাঁসির রায় ও দেশে ফেরার গুজবকে কেন্দ্র করে পলাতক নেতাকর্মীরা প্রমাণ করতে চায় তারা মাঠে আছে। এ জন্য থানার সামনে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পুলিশকে চ্যালেঞ্জ করার কৌশল নেয়া হয়েছে।

ওদিকে, চলমান পরিস্থিতিতে যানবাহনের জন্য পরিবহন মালিক সমিতি জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেছেন, যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতিসাধন বা ভাঙচুর এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই পরিবহনগুলো রাস্তার দুই পাশে অথবা অনিরাপদ ও নির্জন স্থানে পার্কিং করা যাবে না। তিনি আরও বলেন, সকল প্রকার যানবাহন দৈনিক চলাচল শেষে বাধ্যতামূলকভাবে নিজ নিজ ডিপো, নির্ধারিত গ্যারেজ অথবা টার্মিনালে নিরাপদ পাহারায় রাখার জন্য দেশের সকল স্তরের মালিক ও শ্রমিকদের নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল বলেছেন, আওয়ামী লীগের চলমান কর্মসূচি ও অপতৎপরতায় জনগণ ও সরকার মোটেও শঙ্কিত নয়। নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের তথাকথিত লকডাউন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এ অপতৎপরতা চালানো হয়েছে। ককটেলবাজির ঘটনায় মোটরসাইকেলসহ আসামিদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এমনকি হাইকোর্ট ফটক ও যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় জড়িতদের ইতিমধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অন্যান্য ঘটনায় জড়িতদেরও শনাক্ত করার কাজ চলছে। জনগণ ও সরকার এসব অপতৎপরতায় মোটেও শঙ্কিত নয় এবং দেশবাসী ইতিমধ্যে এদের বর্জন ও প্রত্যাখ্যান করেছে।