Image description

দীর্ঘ যাচাইবাছাইয়ের পরও নতুন পে-স্কেলে গুরুতর বৈষম্য ও অসঙ্গতি রয়েছে বলে মনে করছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। নতুন পে-স্কেলেও সেই আগের মতোই বৈষম্য রয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ। তারা বলেছেন, মূল বেতন ও বাড়িভাড়া যোগ করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্চতর গ্রেডের কর্মচারীর মোট প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা নিচের গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে কম। যা বাস্তবে বৈষম্যমূলক। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ বৈষম্য নিরসনের উদ্যোগ না নিলে আন্দোলনে নামার হুমকি দিয়েছেন পরিষদের নেতারা। সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা থাকলেও বাড়িভাড়া ভাতা, শিক্ষা ভাতা ও বৈশাখী ভাতায় বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন। অবশ্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেছেন, পে-স্কেলের কিছু বিষয়ের স্পষ্টীকরণের জন্য আরও ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।

তাদের অভিযোগ ও পে-স্কেলের বাস্তবতা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের বাড়িভাড়া ভাতা নির্ধারণে বেশি অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওপরের গ্রেডের কর্মচারীর তুলনায় নিচের কর্মচারী বেশি মোট বেতন-ভাতা পাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সরকার ঘোষিত নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী ১০ থেকে ১৫তম গ্রেডের কর্মচারীরা মূল বেতনের ৩৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া পাবেন। বিপরীতে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের জন্য বাড়িভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ। এতে কাছাকাছি দুই গ্রেডের কর্মচারীদের মধ্যে বাড়িভাড়া ভাতায় বড় পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।

হিসাব অনুযায়ী, ১৫তম গ্রেডের শুরুতে মূল বেতন ২২ হাজার ৮০০ টাকা। এর ৩৫ শতাংশ হিসাবে বাড়িভাড়া দাঁড়ায় ৭ হাজার ৯৮০ টাকা। অন্যদিকে ১৬তম গ্রেডের শুরুতে মূল বেতন ২১ হাজার ৯০০ টাকা। ৪৫ শতাংশ হিসাবে এই গ্রেডে বাড়িভাড়া দাঁড়ায় ৯ হাজার ৮৫৫ টাকা। অর্থাৎ ১৫তম গ্রেডের চেয়ে এক ধাপ নিচের ১৬তম গ্রেডের কর্মচারী বাড়িভাড়া হিসেবে ১ হাজার ৮৭৫ টাকা বেশি পাবেন। শুধু ১৫ ও ১৬তম গ্রেড নয়, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। 

প্রস্তাবিত হিসাবে ১৬তম গ্রেডে বাড়িভাড়া ৯ হাজার ৮৫৫ টাকা, ১৭তম গ্রেডে ৯ হাজার ৬৩০, ১৮তম গ্রেডে ৯ হাজার ৪৫০, ১৯তম গ্রেডে ৯ হাজার ২২৫ এবং ২০তম গ্রেডে ৯ হাজার টাকা। বিপরীতে ১৫তম গ্রেডে ৭ হাজার ৯৮০, ১৪তম গ্রেডে ৮ হাজার ২২৫, ১৩তম গ্রেডে ৮ হাজার ৪০০, ১২তম গ্রেডে ৮ হাজার ৪০৫ এবং ১১তম গ্রেডে ৮ হাজার ৭৫০ টাকা বাড়িভাড়া পাওয়া যাবে। কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের প্রশ্ন, ১২, ১৩, ১৪ ও ১৫তম গ্রেড উচ্চতর হলেও এসব গ্রেডের কর্মচারীরা ১৬, ১৭ ও ১৮তম গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনায় বাড়িভাড়া ভাতা কম পাবেন কেন? 

তাদের আশঙ্কা, মূল বেতন ও বাড়িভাড়া যোগ করে হিসাব করলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্চতর গ্রেডের কর্মচারীর মোট আর্থিক সুবিধা নিচের গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে কম হয়ে যেতে পারে। কর্মচারীদের আরও অভিযোগ, আট বছর পর উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রেও যদি আর্থিক সুবিধা প্রত্যাশিতভাবে না বাড়ে, তাহলে উচ্চতর গ্রেডের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হবে। শিক্ষা ভাতা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। কর্মচারীদের অভিযোগ, প্রায় ১১ বছর আগে যে শিক্ষা ভাতা ৫০০ টাকা ছিল, এখনো সেটি রয়েছে। দীর্ঘ সময়ের মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির পরও এ ভাতার সমন্বয় না হওয়ায় ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

বৈশাখী ভাতার হার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কর্মচারীরা। তাদের বক্তব্য, ভাতা না বাড়ানো হলে অন্তত বিদ্যমান সুবিধা কমানোর প্রয়োজন ছিল না।

বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের ব্যানারে সারা দেশে থাকা অন্তত ১৩টি সংগঠনের নেতারা করণীয় নির্ধারণে আজ বৈঠক ডেকেছেন। বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের সদস্যসচিব মো. মাহমুদুল হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এতদিন পরে একটি নতুন পে-স্কেল পেলাম। সেটাতেও বৈষম্য। এ বৈষম্য আগেও ছিল। নতুন বেতন কাঠামোতেও থেকে গেল। যা আমাদের জন্য মেনে নেওয়া কষ্টসাধ্য এবং অসম্মানের। এজন্য আমরা এ বৈষম্য নিরসনের দাবি জানিয়ে আসছি।

পে-স্কেলের গেজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাড়িভাড়া নির্ধারণে এলাকার শ্রেণিবিন্যাস নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কর্মচারীদের দাবি, পে-কমিশন ও সচিব কমিটির সুপারিশে সাভার উপজেলাকে ব্যয়বহুল এলাকা হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি অনুমোদিত হলেও চূড়ান্ত গেজেটে ‘সাভার উপজেলা’র পরিবর্তে শুধু ‘সাভার পৌরসভা’ উল্লেখ করা হয়েছে। এতে পৌরসভার বাইরে সাভার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কর্মরত কয়েক হাজার কর্মচারী বাড়িভাড়ার কাক্সিক্ষত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে অভিযোগ তাদের। 

কর্মচারীদের মতে, পে-স্কেলের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামোয় সামঞ্জস্য ও বৈষম্য কমানো। কিন্তু বাড়িভাড়া ভাতার বর্তমান প্রস্তাব বহাল থাকলে উল্টো গ্রেডভিত্তিক আর্থিক বৈষম্য তৈরি হতে পারে। তাই চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের আগে বাড়িভাড়া ভাতার হার, শিক্ষা ভাতা, বৈশাখী ভাতা এবং ব্যয়বহুল এলাকার শ্রেণিবিন্যাস পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তারা।