এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাংগঠনিক প্রতিযোগিতায় নামছে সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। স্থানীয় নির্বাচনে দুই দলই নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি, জনপ্রিয়তা ও তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ কার কেমন তা সরাসরি যাচাই করতে চাইছে। ফলে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন-সব স্তরের নির্বাচনই দুই দলের জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে উঠছে।
এবার স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকবিহীন হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হলেও রাজনৈতিক নেতারাই যেহেতু এ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে থাকেন, তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে একেবারে নির্দলীয় বলা যাবে না। বরং বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায় থেকে একক প্রার্থী সমর্থন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করে নির্বাচনি মাঠে নেমে গেছে। বিএনপিও স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়িয়েছে এবং একক প্রার্থী নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয় থাকছে না; বরং দুই দলের তৃণমূল সংগঠন কতটা সক্রিয়, প্রার্থী বাছাইয়ে নেতৃত্ব কতটা কার্যকর এবং ভোটারদের সঙ্গে কার বেশি যোগাযোগ-তারও পরীক্ষা হবে। জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দল থেকে একজনকে সমর্থন দেওয়া হবে। নির্বাচন ঘিরে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়ালে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, দলের পক্ষ থেকে কারা প্রার্থী হবেন, তা স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হবে। এক্ষেত্রে তৃণমূলের মতামত ও প্রার্থীদের যোগ্যতা বিবেচনা করা হবে। দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রতিটি নির্বাচনে দল থেকে একজন মাত্র একক প্রার্থী দেওয়া হবে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সম্প্রতি ঢাকায় দলীয় এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য তাঁরা সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও সিটি করপোরেশনে প্রার্থী মনোনয়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। একক প্রার্থী নির্ধারণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব : অরাজনৈতিক এ নির্বাচনে এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার জন্য বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দফায় দফায় স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে চলেছেন। বৈঠকে তৃণমূলের মতামত ও গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়ে একক প্রার্থী নির্ধারণের কথা বলা হচ্ছে। বৈঠক থেকে তৃণমূল নেতাদের বলা হচ্ছে, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে প্রার্থী হলে দল কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংসদ নির্বাচনে বড় জয় নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও গ্যাস-বিদ্যুৎ ও সারাসংকট, আইনশৃঙ্খলার আশানুরূপ উন্নতি না হওয়াসহ বিভিন্ন ইস্যুতে কিছুটা বেকায়দায় সরকার। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে মাঠে তৎপর বিরোধী দল। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় জয় না পেলে ক্ষমতাসীনদের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। তাই মাঠ থেকে বড় জয় তুলে আনতে সময় থাকতেই প্রস্তুতি ও কৌশল নির্ধারণ করছে বিএনপি।
দলটির নেতারা আশঙ্কা করছেন, স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে তাদের বেগ পেতে হতে পারে। এ জন্য মাঠের নেতাদের আগেভাগে সতর্ক করে কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে ক্ষমতাসীন হিসেবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করাটাও বিএনপির জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন দলটির অনেক দায়িত্বশীল নেতা। প্রায় সব ইউনিয়ন পরিষদেই চেয়ারম্যান পদে বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছে।
দীর্ঘদিন দলীয়ভাবে ইউপি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় স্থানীয় নেতাদের মধ্যে এবার নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। তবে এ আগ্রহকে দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে রেখে একক প্রার্থী নিশ্চিত করাই নেতৃত্বের অন্যতম বড় কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একাধিক দলীয় নেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে ভোট ভাগ হওয়ার পাশাপাশি নির্বাচনের পরও স্থানীয় সংগঠনে বিভক্তি তৈরি হতে পারে। ক্ষমতাসীন দলের তৃণমূল সংগঠনে এমন বিভাজন দীর্ঘমেয়াদে দলীয় কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
জামায়াতের কৌশল-প্রার্থী আগে : স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াত তুলনামূলকভাবে আগেভাগেই প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে। দলটির সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের যাচাইবাছাইয়ের কাজও করা হচ্ছে। জামায়াতের জন্য স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে নিজেদের নতুন রাজনৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠার বড় সুযোগ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করতে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনি ফলাফলকে তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।
তাই স্থানীয় নির্বাচনে জোটের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তির পরীক্ষা দিতে চাইছে দলটি। এ ক্ষেত্রে জামায়াতের কৌশলের একটি বড় দিক হচ্ছে তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনা। বিশেষ করে সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনে তরুণ প্রার্থীদের গুরুত্ব দেওয়ার কথা দলটির নেতাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো তুলনামূলকভাবে শৃঙ্খলাভিত্তিক। দলটি দীর্ঘ সময় সাংগঠনিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে থাকার পর এখন নতুন করে প্রশিক্ষণ, সাংগঠনিক সফর ও কর্মী উন্নয়নের দিকে জোর দিচ্ছে।
সংগঠন বিস্তারের লড়াই : রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপি ও জামায়াত-দুই দলের কাছেই স্থানীয় নির্বাচন আগামী দিনের রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় স্থানীয় নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক পদে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকে। এর মাধ্যমে দলগুলো নতুন স্থানীয় নেতৃত্ব তৈরি, কর্মীদের সক্রিয় করা এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ পায়। জামায়াত ইতোমধ্যে স্থানীয় নির্বাচনকে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে দেখছে।
বিএনপিও স্থানীয় নির্বাচনকে মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি আনার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ পর্যন্ত শুধু কে কতটি চেয়ারম্যান, মেয়র বা জনপ্রতিনিধির পদ পেল-তার হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং কোন দল তৃণমূলের নেতাদের বেশি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল, কারা ভোটারদের সঙ্গে বেশি কার্যকর যোগাযোগ তৈরি করতে পারল এবং কার সাংগঠনিক কাঠামো নির্বাচনি প্রতিকূলতা সামলে বেশি কার্যকর থাকল-সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।