Image description

► চারিত্রিক বৈকল্যের শিকাররা হত্যায় জড়িত - ডা. মো. গোলাম রাব্বানী

► অপরাধীদের সংশোধনে নজরদারি বাড়াতে হবে - ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল

► অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে - ড. মো. তৌহিদুল হক

সামাজিক অবক্ষয় বা পচনের কারণেই দেশের কিশোররা বিপথে চলে যাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন। কয়েকজন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন, সামাজিক অবক্ষয়, পচনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদকাসক্তি ও অর্থের লোভ। সব মিলিয়ে এদের দ্বারা পূর্বপরিকল্পনা থেকে হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। অনেকে প্রতিশোধ নিতে বা হিংসাত্মক আচরণ থেকেও এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে।

সম্প্রতি কুমিল্লার স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের (১৩) হাতে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নিতেই শিশুটিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটি জানিয়েছেন। এ ঘটনায় সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীকে (১৫) আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া আবদাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থীকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

এর আগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় এ বছরের ১৮ এপ্রিল ১১ বছরের শিশু হোসাইনকে তারই সমবয়সি কিশোর অপরাধীরা নির্মমভাবে হত্যা করে। পুলিশ জানায়, ফতুল্লা রেলস্টেশনসংলগ্ন একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে নিয়মিত আড্ডা দেওয়া ও মাদক সেবনকারী    কয়েকজন কিশোর হোসাইনকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে হত্যা করে। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে সুযোগসুবিধার প্রশ্নে, অর্থনৈতিক বিচারে বা জীবনযাপনের ধরনের প্রশ্নে যারা নিজেদের জীবন সঠিকভাবে পরিচালনার পরামর্শ থেকে পিছিয়ে থাকে- সেই কিশোরদের বড় একটি অংশই অপরাধপ্রবণতায় জড়িয়ে যায়। এ কিশোররা মাদকাসক্ত থাকে এবং অন্যের কাছে কোনো মূল্যবান উপকরণ থাকলে তা কেড়ে নেওয়ার জন্য হয় সেই ব্যক্তি অপহরণ করে অথবা হত্যা করে।

কখনো তাকে আহত করে মূল্যবান সামগ্রীটি ছিনিয়ে নেয়, চুরি বা ছিনতাই করে। এগুলো করতে গিয়েই এ কিশোররা কাউকে হত্যা বা আহত করে। এ ঘটনাগুলো যে এই কিশোর অপরাধীদের কাছে খুব মর্মান্তিক- এমন নয়। এ অপরাধীরা অপরাধকে নিজেদের বেঁচে থাকার এক ধরনের লড়াই বলে মনে করে। কিশোর অপরাধীরা এমন না করতে পারলে হয় তাদের মাদকের অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে না, বা মাদক নিতে পারবে না। আর এমনটি না হলে তার প্রতিদিনের বেঁচে থাকার জন্য যে অর্থ প্রয়োজন- তা অন্য কোনোভাবে সংগ্রহ করতে পারবে না। 

এ ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংগুলো বিভিন্নজনের ছত্রছায়ায় বা তার জীবনযাত্রার ধরনের কারণেই অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে। অন্যের মূল্যবান জিনিস চুরি বা ছিনতাই করেই কিশোর অপরাধীদের জীবনজীবিকা চলে। এ ক্ষেত্রে এ অপরাধীরা তার এলাকার বড় অপরাধীদের আশ্রয়প্রশ্রয় পায়। এভাবেই তারা সমাজে বিভিন্নভাবে অস্থিরতা তৈরি করে সাধারণ মানুষকে মর্মান্তিক অবস্থার মধ্যে এবং বিভিন্ন পরিবারকে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির মুখে ফেলে। 

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. গোলাম রাব্বানী বলেন, শিশু অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি সামাজিক অবক্ষের জন্য হয়েছে। সমাজের প্রতিটি জায়গায় ঘুণ ধরেছে। জাতিগতভাবে বাঙালিরা মধ্যবিত্ত পরিবারের। এ দেশে একটি পারিবারিক, সামাজিক ঐতিহ্য ছিল। বড়দের শ্রদ্ধা ও সমবয়সিদের বন্ধু-ভাই মনে করা হতো। ছোটদের সন্তানতুল্য মনে করা হতো। একসময় প্রতিবেশীরা আমাদের শাসন করতেন। আমরা পিতার মতো তার শাসন মেনে নিতাম। এখন সমাজে কিশোর অপরাধীদের জন্ম হয়েছে। প্রায়ই দেখা যায় ৫-৭ জন মিলে অপরাধ করছে। এদের পরিচিত বড় ভাইয়েরা ছোটদের দিয়ে অপরাধ করায়। 

এ কিশোর অপরাধীদের মধ্যে যাদের চারিত্রিক বৈকল্য আছে তাদের বড়রা আশ্রয় দিয়ে অপরাধ করায়। যারা অপ্রতিমকে হত্যা করেছে তাদের লক্ষ্য ছিল শিশুটির হাতে থাকা আইফোনটি বিক্রি করে টাকা উপার্জন করার। অপ্রতিমের কাছ থেকে যখন এ কিশোর অপরাধীরা ফোনটি ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল তখন ছেলেটি বাধা দিতে গিয়ে নির্মম পরিণতির শিকার হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা বর্তমানে দেশে হরহামেশাই ঘটছে। এ ক্ষেত্রে এ ঘটনা প্রতিরোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ববোধ বাড়াতে হবে। 

সাধারণ জনগণকে একে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। অভিভাবকদের সন্তানকে ধর্মীয় মূল্যবোধ শেখাতে হবে। এতে সন্তানরা মানুষের সঙ্গে কীভাবে ভালো আচরণ করতে হবে তা বুঝতে শিখবে। মানবিকতাবোধ জাগ্রত করলে আইনের শাসন স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠা হবে। অভিভাবকরা নিজ দায়িত্ববোধ পালন করলে খুব বেশি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার এ অপরাধ দমনের প্রয়োজন হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, শিশু অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। 

আমাদের সমাজব্যবস্থায় পরস্পরের প্রতি যে আস্থা ও বিশ্বাস সেই জায়গাটি এখন অনেক ক্ষীয়মাণ। আস্থার সেই জায়গা আর নেই। এখানে মানুষের মধ্যে হিংসাত্মকবোধ জাগ্রত হওয়ার হার বেশি। ফলে অভিভাবকদের তাদের সন্তানের জন্য এখন আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কারা তার বন্ধু- এ বিষয়গুলো জানতে হবে। সন্তানের একা বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদেরকে আরও বেশি সজাগ থাকতে হবে। বাইরের কাজের ক্ষেত্রে সন্তানের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করতে হবে। কারণ শিশুদের বাইরে ঘুরতে যাওয়া ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সময় নিখোঁজের ঘটনাগুলো বেশি ঘটে। 

তবে বর্তমান জীবনব্যবস্থার কারণে এবং কর্মব্যস্ততার জন্য এবং জীবনজীবিকার কারণে চাইলেও সব সময় সন্তানের সঙ্গী হওয়া অনেক সময় অভিভাবকদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। এজন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা নিরাপদ হতে হবে। সেখানে কারও প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ, কাউকে হত্যা করা, কাউকে আহত করা, চুরি বা দখল করা এ ধরনের অপরাধগুলোর পরিবর্তে আমাদের মধ্যে সংবেদনশীল সংস্কৃতির চর্চা থাকতে হবে। এটি বাস্তবায়নে সবার সম্মলিত দায়িত্ববোধ এবং সরকারের আরও বেশি কঠোর ভূমিকায় যেতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, পূর্বপরিকল্পনা থেকে শিশু হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। অনেকে প্রতিশোধ নিতে, হিংসাত্মক আচরণ থেকে এ ধরনের ঘটনা ঘটায়। বিকৃত আচরণ থেকে অনেকে একটি শিশুকে নির্যাতন করে হত্যা করছে।

একটি কিশোরের মেলামেশার ক্ষেত্রে কিছুটা স্বাধীনতা থাকা স্বাভাবিক। এ বয়সে বাচ্চাদের খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এজন্য কোনো শিশু নির্যাতনের ঘটনায় একতরফাভাবে অভিভাবকদের দায়ী করাও ঠিক হবে না। শিশুরা যাতে স্বাধীনভাবে তার বন্ধু ও বড়দের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারে- তা নিশ্চিত করতে হবে। তারা ঘুরবে, মাঠে খেলবে। এর জন্য চমৎকার একটি পরিবেশ শিশুদের দিতে হবে। কিন্তু এ পরিবেশটা আমরা তৈরি করতে পারছি না। 

কিশোর গ্যাং দেশে দীর্ঘদিনের একটি আলোচ্য বিষয়। সমাজবিজ্ঞানীরাও বিষয়টি নিয়ে এখন চিন্তিত। এই বয়সি শিশুরা একটি অপরাধ চক্রে জড়িয়ে খুন পর্যন্ত করছে। দেশের আইন অনুযায়ী কিশোরদের অপরাধের জন্য তাদের সংশোধন কেন্দ্রে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে অনেকেরই ভুল সংশোধন হয় না। অনেকে সেখানে গিয়েও অপরাধ শেখে। সংশোধন কেন্দ্রে সংশোধন প্রক্রিয়া নতুনভাবে সাজাতে হবে। তাদের ঠিকভাবে সংশোধন হচ্ছে কি না এজন্য প্রতি সপ্তাহে নজরদারি থাকতে হবে।