তাকবির হোসাইন
যে সময়ে গুগল স্কলার, এআই, অনলাইন জার্নাল, ইমেইল কিংবা ডিজিটাল লাইব্রেরি ছিল না, সেই সময়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে এসেছিলেন নিজ নিজ ফিল্ডে প্রতিষ্ঠিত গবেষক, অভিজ্ঞ শিক্ষক ও দক্ষ অ্যাকাডেমিক অ্যাডমিনিস্ট্রেটররা। বিদেশের একটি বই বা পুরোনো ডকুমেন্ট সংগ্রহ করতেও যাঁদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হতো, তাঁরাই সীমিত রিসোর্সের মধ্যে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। অথচ ২০২৬ সালে জ্ঞান ও গবেষণা যখন কয়েক সেকেন্ডের দূরত্বে, তখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব নিয়ে এত প্রশ্ন কেন?
ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্যদের প্রোফাইল পাশাপাশি রাখলে বিস্মিত হতে হয়। একজন ১৭ বছর ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অ্যাকাডেমিক রেজিস্ট্রার ছিলেন। একজন পিএইচডির পর প্রায় ১৮ বছর শিক্ষকতা, রিসার্চ ও কলেজ পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়ে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। একজনের ছিল প্রায় ১৩ বছরের পোস্ট পিএইচডি অ্যাকাডেমিক কাজ, গুরুত্বপূর্ণ বই, আন্তর্জাতিক শিক্ষকতা ও ডিন হিসেবে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা। আরেকজন ২২ বছরের পোস্ট পিএইচডি শিক্ষকতা, রিসার্চ ও অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের পর একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে এসেছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ১৯২১ সালের ১ জুলাই। তার প্রায় সাত মাস আগে, ১৯২০ সালের ১ ডিসেম্বর, স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগকে প্রথম উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ইউনিভার্সিটি অব প্যারিস, ইউনিভার্সিটি অব হাইডেলবার্গ ও কলেজ দ্য ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষা ও রিসার্চ করেন। বিশপ বার্কলে স্কলার হিসেবে ওয়েন্স কলেজ, ম্যানচেস্টারে কাজ করেন। পরে ১৯০৩ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অ্যাকাডেমিক রেজিস্ট্রার ছিলেন। তিনি ১৯১৭ সালের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনেরও সদস্য ছিলেন। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার আগেই উচ্চশিক্ষা, পরীক্ষা পদ্ধতি, এডুকেশন পলিসি, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমন্বয় এবং অ্যাকাডেমিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সম্পর্কে তাঁর দীর্ঘ বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই। একই দিনে অধ্যাপক ইত্রাত হোসেন জুবেরি প্রথম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন। সেন্ট জনস কলেজ, আগ্রা ও এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার পর তিনি ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরা থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি করেন। সপ্তদশ শতকের ধর্মীয় কবিতা নিয়ে তাঁর থিসিস অনুমোদিত হয় ১৯৩৫ সালে। পরে তিনি বেঙ্গল সিনিয়র এডুকেশন সার্ভিসে যোগ দেন এবং ইসলামিয়া কলেজে ইংরেজির সিনিয়র প্রফেসর ও প্রিন্সিপাল হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত মার্টন কলেজ, অক্সফোর্ডে অ্যাডভান্সড রিসার্চ করেন। তিনি অক্সফোর্ডের কার্নেগি ফেলো নির্বাচিত প্রথম পাকিস্তানি এবং রয়্যাল সোসাইটি অব লিটারেচারের ফেলো ছিলেন। অর্থাৎ পিএইচডির প্রায় ১৮ বছর পর দীর্ঘ শিক্ষকতা, রিসার্চ, আন্তর্জাতিক ফেলোশিপ ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর। এর আগে ১৯৬৫ সালে ইতিহাসবিদ ড. আজিজুর রহমান মল্লিককে প্রজেক্ট ডিরেক্টর এবং ১৯৬৬ সালে প্রথম উপাচার্য করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্স ও মাস্টার্স করার পর তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৫৩ সালে সোয়াস, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে ইতিহাসে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। বাংলার মুসলমানদের সামাজিক ও শিক্ষাগত ইতিহাস এবং ব্রিটিশ পলিসি নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত পার্লামেন্টারি পেপারস, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেকর্ড এবং বিভিন্ন অপ্রকাশিত আর্কাইভাল ডকুমেন্ট ব্যবহার করেন। তাঁর সেই রিসার্চ পরে British Policy and the Muslims in Bengal, 1757 to 1856 নামে গুরুত্বপূর্ণ বইয়ে পরিণত হয়। দেশে ফিরে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও কলা অনুষদের ডিন হিসেবে কাজ করেন। ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসও পড়িয়েছেন। প্রায় ১৩ বছরের পোস্ট পিএইচডি রিসার্চ, শিক্ষকতা, বই প্রকাশ ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার পর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার দায়িত্ব পান।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট। অধ্যাপক ড. মফিজউদ্দিন আহমেদ একই বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪২ সালে কেমিস্ট্রিতে বিএসসি অনার্স ও ১৯৪৪ সালে এমএসসি করার পর তিনি পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৪৮ সালে কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রি বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়ে পরে রিডার, প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান হন। স্ট্রাকচারাল কেমিস্ট্রি, ন্যাচারাল প্রোডাক্টস কেমিস্ট্রি এবং অর্গানিক রিঅ্যাকশন মেকানিজম নিয়ে তাঁর রিসার্চ ছিল। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই অর্গানিক কেমিস্ট্রির বই লিখেছিলেন। তিনি হল প্রভোস্ট ও স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব নেওয়ার সময় তাঁর পেছনে ছিল ২২ বছরের পোস্ট পিএইচডি শিক্ষকতা, রিসার্চ ও অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অভিজ্ঞতা।
এই চারজনের সাবজেক্ট ও ক্যারিয়ার এক ছিল না। কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের প্রোফাইলে দীর্ঘমেয়াদি ও ভিজিবল অ্যাকাডেমিক কাজের প্রমাণ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পাওয়ার আগেই তাঁরা রিসার্চ করেছেন, বই লিখেছেন, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, বিভাগ, অনুষদ ও কলেজ পরিচালনা করেছেন এবং উচ্চশিক্ষার সিস্টেম কাছ থেকে বুঝেছেন। তাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এমন সময়ে, যখন রেডিমেড ক্যাম্পাস, ডিজিটাল ডেটাবেজ, রিসার্চ সফটওয়্যার কিংবা কয়েক মিনিটে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিসি দেখার সুযোগ ছিল না। তারপরও তাঁরা শুধু অফিস পরিচালনা করেননি। তাঁরা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরি করেছেন।
এই ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনা করলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যাগুলো আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়, বিভাগ, ভবন, প্রফেসর ও পিএইচডির সংখ্যা বাড়িয়েছি। কিন্তু একই হারে গবেষক, চিন্তক, অ্যাকাডেমিক লিডার ও ইনস্টিটিউশন বিল্ডার তৈরি করতে পারিনি। এই ব্যবধানের একটি অংশ ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিংয়েও দেখা যায়। টাইমস হায়ার এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংস ২০২৬ এ ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮০১ থেকে ১০০০ ব্যান্ডে। র্যাঙ্কিং কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণের একমাত্র মাপকাঠি নয়। আবার নেতৃত্বের দুর্বলতা সরাসরি প্রমাণ করার মাপকাঠিও নয়। তবে রিসার্চ কোয়ালিটি, টিচিং এনভায়রনমেন্ট, ইন্টারন্যাশনাল আউটলুক ও ইন্ডাস্ট্রি কানেকশনে আমাদের সীমাবদ্ধতার একটি তুলনামূলক চিত্র এটি সামনে আনে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্বলতার প্রভাব শুধু র্যাঙ্কিংয়ে আটকে থাকে না। এর প্রভাব পড়ে দেশের মানবসম্পদ তৈরির দক্ষতার ওপরও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২৪ অনুযায়ী উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ১৩ শতাংশের বেশি। এই পরিস্থিতির জন্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয়কে দায়ী করা যাবে না। দেশে পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন জব তৈরি না হওয়া, দুর্বল ইনভেস্টমেন্ট, সীমিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার সমস্যাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে ইউনিভার্সিটি যে গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে এবং জব মার্কেট যে নলেজ, টেকনিক্যাল স্কিল, প্রবলেম সলভিং, কমিউনিকেশন ও রিসার্চ ক্যাপাসিটি চাইছে, তার মধ্যেও বড় গ্যাপ রয়েছে।
আমাদের কারিকুলাম এখনো অনেক ক্ষেত্রে মুখস্থ ও পরীক্ষানির্ভর। রিসার্চ ল্যাব, ফান্ডিং ও মেন্টরশিপ সীমিত। ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে ডিপার্টমেন্টের কানেকশন দুর্বল। অনেক শিক্ষার্থী ডিগ্রি শেষ করেও একটি রিয়েল প্রবলেম নিয়ে কাজ করা, ডেটা অ্যানালাইসিস করা, ভালো রিপোর্ট লেখা কিংবা নিজের সাবজেক্টের নলেজ বাস্তবে ব্যবহার করার পর্যাপ্ত সুযোগ পায় না। ফলে আমরা ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়াচ্ছি, কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী গবেষক, ইনোভেটর, দক্ষ প্রফেশনাল ও প্রবলেম সলভার তৈরি করতে পারছি না। এই ব্যর্থতা শুধু শিক্ষার্থীর নয়। এটি কারিকুলাম, শিক্ষক নিয়োগ, রিসার্চ কালচার, ফান্ডিং, ইন্ডাস্ট্রি কানেকশন, অ্যাকাডেমিক লিডারশিপ এবং পুরো এডুকেশন সিস্টেমের সম্মিলিত ব্যর্থতা।
এই জায়গাতেই উপাচার্যের নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উপাচার্য নির্বাচনের সময় কি দেখা হয় একজন প্রার্থীর অরিজিনাল রিসার্চ কনট্রিবিউশন কী? তিনি কতজন তরুণ গবেষক তৈরি করেছেন? কোনো শক্তিশালী রিসার্চ গ্রুপ গড়েছেন কি না? আন্তর্জাতিক রিসার্চ ফান্ড এনেছেন কি না? তাঁর নেতৃত্বে কোনো বিভাগ, অনুষদ, ল্যাব কিংবা অ্যাকাডেমিক প্রোগ্রাম বাস্তবে এগিয়েছে কি না? শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি কী ধরনের অ্যাকাডেমিক কালচার তৈরি করেছেন? নাকি অনেক ক্ষেত্রে সিনিয়রিটি, রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক এবং নির্দিষ্ট পক্ষের প্রতি আনুগত্য অ্যাকাডেমিক যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে?
শুধু পিএইচডি থাকলেই কেউ ভালো উপাচার্য হয়ে যান না। আবার কেউ নিজ বিভাগ কিংবা বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন বলেও তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না। আসল প্রশ্ন হলো, তাঁর গবেষণা কতটা রিগোরাস ও অরিজিনাল ছিল, মূল্যায়ন কতটা স্বাধীন ও স্বচ্ছ ছিল এবং ডিগ্রির পর তাঁর অ্যাকাডেমিক অবদান কী। একইভাবে নির্দিষ্ট বছর চাকরি ও কয়েকটি প্রমোশনের পর পাওয়া প্রফেসর টাইটেলও নেতৃত্বের যথেষ্ট প্রমাণ হতে পারে না। একজন প্রফেসর যদি বছরের পর বছর রিসার্চে নিষ্ক্রিয় থাকেন, কোনো শক্তিশালী রিসার্চ গ্রুপ তৈরি না করেন এবং তরুণ গবেষকদের গড়ে তুলতে না পারেন, তাহলে শুধু সিনিয়রিটির কারণে তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অ্যাকাডেমিক লিডার হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান কি না, সেই প্রশ্ন করা প্রয়োজন।
উপাচার্য কোনো ক্যাম্পাস ম্যানেজার নন। তাঁর কাজ শুধু ভবন নির্মাণ, বাজেট অনুমোদন, নিয়োগপত্রে সই কিংবা অনুষ্ঠান উদ্বোধন করা নয়। শিক্ষক নিয়োগের মান, রিসার্চ ফান্ডিং, কারিকুলাম, অ্যাকাডেমিক ফ্রিডম, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ তাঁর সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত। তাই উপাচার্যের পদ চাকরিজীবনের শেষ পুরস্কার বা রাজনৈতিক পুনর্বাসনের চেয়ার হতে পারে না। এই দায়িত্ব এমন একজন অ্যাকাডেমিক লিডারের পাওয়া উচিত, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সমস্যা বুঝবেন, ভবিষ্যতের লক্ষ্য ঠিক করবেন এবং সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও আগের কাজের প্রমাণ দেখাতে পারবেন।
উপাচার্য নিয়োগের আগে প্রার্থীর পূর্ণ সিভি, রিসার্চ রেকর্ড, সুপারভিশন, প্রশাসনিক অর্জন এবং চার বছরের অ্যাকশন প্ল্যান প্রকাশ করা দরকার। প্রার্থীদের নিয়ে পাবলিক অ্যাকাডেমিক হিয়ারিং হওয়া উচিত। সার্চ কমিটিতে স্বাধীন দেশি ও আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিদ থাকা প্রয়োজন। দায়িত্ব শেষে প্রতিশ্রুতির সঙ্গে অর্জন মিলিয়ে পাবলিক ইভ্যালুয়েশনও থাকা উচিত। কারণ শুধু একজন উপাচার্যকে দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। যে সিস্টেম তাঁকে নির্বাচন করে, সেই সিস্টেমকেও জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। নিয়োগের ভিত্তিই যদি আনুগত্য হয়, তাহলে দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন, নাকি তাঁকে নিয়োগ দেওয়া পক্ষের কাছে, এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
প্রথম উপাচার্যদের সবাই নিখুঁত ছিলেন, এমন দাবি নয়। তাঁদের সময়, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোও আজকের মতো ছিল না। কিন্তু তাঁদের ক্যারিয়ার আমাদের একটি পরিষ্কার বেঞ্চমার্ক দেয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব দেওয়ার আগে একজন মানুষের মধ্যে গভীর অ্যাকাডেমিক প্রস্তুতি, রিসার্চের প্রমাণ, প্রশাসনিক সক্ষমতা, সততা এবং প্রতিষ্ঠান গড়ার ভিশন থাকা প্রয়োজন। প্রায় ৫০ থেকে ১০০ বছর আগে সীমিত সুযোগের মধ্যেও আমরা এমন মানুষ খুঁজে পেয়েছিলাম। আজ এআই, গুগল স্কলার, স্কোপাস, অনলাইন লাইব্রেরি ও আন্তর্জাতিক রিসার্চ নেটওয়ার্ক থাকার পরও যদি আমাদের অ্যাকাডেমিক লিডারশিপ দুর্বল ও অস্বচ্ছ হয়, তাহলে সমস্যাটি শুধু রিসোর্সের নয়। সমস্যাটি আমাদের প্রায়োরিটি, সিলেকশন সিস্টেম, জবাবদিহি ও অ্যাকাডেমিক কালচারের।
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ভবন, বিভাগ ও ডিগ্রির সংখ্যা দিয়ে বড় হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় বড় হয় সেই মানুষদের দিয়ে, যাঁরা নতুন জ্ঞান তৈরি করেন, শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে শেখান, দেশের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করেন এবং প্রতিষ্ঠানকে নিজের পদ, ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে বড় মনে করেন।