Image description

পাহাড় থেকে সমতল। প্রায় দুই বছর ধরে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করছে আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী চক্র। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও খাগড়াছড়িতে প্রযুক্তির জাল বিস্তারের এমন তিনটি ঘটনা উদঘাটনের পর এ চক্রের নেটওয়ার্ক নিয়ে নতুন সন্দেহ তৈরি হয়েছে। সাইবার অপরাধে জড়িত ৭১ বিদেশি এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ জন চীনের। তিন ঘটনাতেই চীনাদের সম্পৃক্ততা মিলেছে। এর ফলে দেশে সক্রিয় এ নেটওয়ার্কে চীনা নাগরিকরাই মূল চালিকাশক্তি বলে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এমন আরও নেটওয়ার্ক দেশে সক্রিয় থাকতে পারে। অবৈধ ভিওআইপি বা ভুয়া ই-কমার্সের আড়ালে এটি শুধু ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো মিশন। এখন সেটিই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনটি ঘটনার যোগসূত্র, তাদের আরও কোনো ঘাঁটি আছে কিনা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি মাফিয়াদের সঙ্গে কানেকশন নিয়ে তদন্ত চলমান পুলিশের বিশেষায়িত বিভিন্ন ইউনিটের।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপকমিশনার মোহাম্মদ শামীম হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে উদ্ধার করা মোবাইল-ল্যাপটপ ও উচ্চক্ষমতার ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক রিপোর্ট আমরা খুবই সিরিয়াসলি যাচাই-বাছাই করে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। গ্রেপ্তার বিদেশিদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাদের গোপন পরিকল্পনার বিষয় আমরা উদঘাটন করতে পারব।’

পুলিশ কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী চক্র প্রথম গোপন ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে। গত বছরের ১৪ নভেম্বর পুলিশ ও বিটিআরসি খাগড়াছড়ির রামগড় পৌরসভার এক বাসা থেকে দুই চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করে। জব্দ করা হয় উচ্চক্ষমতার আধুনিক ভিওআইপি (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম।

খাগড়াছড়ির রামগড় সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওবাইন আগামীর সময়কে বললেন, ‘দুই চীনা নাগরিক চট্টগ্রাম শহরের উত্তর খুলশী আবাসিক এলাকায় এক ফ্ল্যাটে প্রায় এক বছর ধরে ছিলেন। সেখান থেকে আসিফ নামে এক বাংলাদেশির মাধ্যমে রামগড়ে বাসা ভাড়া নেন। ওই বাসায় সার্ভার স্টেশন স্থাপন করা হচ্ছিল। সেখানে ইন্ডিয়ান মোবাইল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি সচল থাকে। আমাদের ধারণা, বাংলাদেশ-ভারত দুই অংশকেই টার্গেট করে তারা কাজ শুরু করতে চেয়েছিল। না হলে শহর ছেড়ে অজপাড়াগাঁয়ে গিয়ে ভিওআইপি বসাবে কেন? তাদের যে প্রযুক্তি, সেগুলো দিয়ে অনলাইন জালিয়াতিতেও যুক্ত হওয়া সম্ভব ছিল।’

ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপনের এ কর্মকাণ্ড নিয়ে নড়েচড়ে বসে পুলিশ। রামগড় থানার তখনকার ওসি বর্তমানে রাঙামাটির জুরাইছড়ি থানায় কর্মরত মুহাম্মদ মঈন উদ্দীন আগামীর সময়কে বললেন, ‘যেখানে ভিওআইপি সার্ভার স্টেশন স্থাপন করা হচ্ছিল সেখান থেকে ভারত সীমান্তের দূরত্ব মাত্র ১০০ গজ। বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় ঢাকা থেকে এসবির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা থানায় এসে চীনা নাগরিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। চীনের দূতাবাসের প্রতিনিধিদলও থানায় আসে। দূতাবাসের কর্মকর্তারা পুলিশকে তখন জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার দুজন চীনা নাগরিক আগে আরেকটি দেশে একই ধরনের ক্রাইম করে এখন বাংলাদেশে আসেন। তবে পুরোপুরি জাল বিস্তারের আগেই আমরা তাদের প্রচেষ্টা ভণ্ডুল করে দিই।’

টেলিকম ও সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করা পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বললেন, সিমবক্সের মাধ্যমে অবৈধ আন্তর্জাতিক কল পরিচালনা করলে দেশের নিরাপত্তা নিয়ে চরম হুমকি তৈরি হয়। কারণ এই অবৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে আসা কোনো কলের ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা অরিজিনাল কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) ন্যাশনাল গেটওয়েতে সংরক্ষিত থাকে না। ফলে যেকোনো সীমান্ত এলাকায় বসে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্র যদি যোগাযোগ রক্ষা করে, সেটি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের ‘প্রযুক্তিজাল’ বিস্তারের চেষ্টার দ্বিতীয় ঘটনা উদঘাটন হয়েছে কক্সবাজারে। গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে শহরের কলাতলী এলাকায় হোটেল সি-প্যালেসে অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৪০টি ল্যাপটপ, বিদেশি পুলিশের ব্যবহৃত যোগাযোগ সরঞ্জামসহ চীনের ছয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। রামু থানায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

রামু থানার ওসি এ কে ফজলুল হক বললেন, ‘আড়াই মাস ধরে হোটেলে অবস্থান করছিলেন ছয় চীনা নাগরিক। তারা কক্সবাজারে সার্ভার স্টেশন স্থাপনের চেষ্টায় ছিলেন। চট্টগ্রামের খুলশীতে গ্রেপ্তার হওয়া ৬৩ বিদেশি আর কক্সবাজারের ছয়জনের কর্মকাণ্ড একই। তারা একটি চক্র। মামলা এখন সিআইডি তদন্ত করছে।’

সর্বশেষ গত ১০ সেপ্টেম্বর রাতে নগরীর খুলশী থানার জালালাবাদ কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার একটি সাততলা ভবন থেকে গ্রেপ্তার হয় ৬৩ বিদেশি নাগরিক। এদের মধ্যে চীনের পাঁচজন। আছে পাকিস্তান, লাওস, নেপাল, ভিয়েতনামের নাগরিকও। এ ঘটনায় করা মামলা তদন্ত করছে সিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিট।

তদন্ত কর্মকর্তারা বলছিলেন, এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া চীনা নাগরিকরা প্রত্যেকে প্রথমে চট্টগ্রামে এসে খুলশীতে অবস্থান করেন। খুলশীর জাকির হোসেন রোডে চীনাপণ্য বিক্রির একটি আউটলেট তাদের যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। সেখান থেকে চীনা নাগরিকদের সঙ্গে বাংলাদেশি দোভাষী বা দালালদের সম্পর্ক তৈরি করে দেওয়া হয়। খাগড়াছড়িতে গ্রেপ্তার আসিফকে ওই আউটলেট থেকেই চীনা নাগরিকদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। খুলশীর ঘটনায় যুক্ত ছিল মহসিন ও রাকিব। মহসিন খুলশীর বাসাটি ভাড়া করে দিয়েছিলেন। আর রাকিব ভাড়ার চুক্তি করেছিলেন মালিকের সঙ্গে। মহসিন এরই মধ্যে কোকেন উদ্ধারের এক মামলায় খুলশী থানায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।