শরীয়তপুরের জাজিরায় ডিভোর্সপ্রাপ্ত এক নারীকে বিয়ে করায় রতন সরদার (৪৫) নামে এক ব্যক্তিকে স্থানীয় সালিশে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা ও গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সেই ভয়ে গত ৯ দিন ধরে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন ওই ব্যক্তি। এ ঘটনায় বিচার চেয়ে জাজিরা থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।
ঘটনাটি ঘটেছে জাজিরা উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের মনাই ছৈয়াল কান্দি গ্রামে। রতন ওই গ্রামের মৃত রাজ্জাক সরদারের ছেলে।
থানায় দেওয়া অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একই গ্রামের রুবেল শিকদার (৪৪) ও রতন সরদার পরস্পরের পরিচিত। পারিবারিক কলহের জেরে ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর রুবেল তার স্ত্রী রুবিনা আক্তারকে ডিভোর্স দেন। পরে গত ৩ আগস্ট রুবিনাকে বিয়ে করেন রতন। বিয়ের পর থেকেই রুবেল ও তার লোকজন রতনের বিরুদ্ধে পরকীয়ার অপবাদ দিয়ে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করেন। এর জের ধরে গত ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মনাই ছৈয়াল কান্দি এলাকায় সাবেক ইউপি সদস্য মতিউর রহমান খানের বাড়ির উঠানে পাঁচ শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে সালিশ বৈঠক বসানো হয়। দীর্ঘ বৈঠকে তার বিরুদ্ধে পরকীয়াসহ কোনো অপরাধের প্রমাণ না মিললেও সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে ৯ সেপ্টেম্বর সূর্য ওঠার আগেই তাকে গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। স্থানীয় প্রভাবশালী ও সালিশিদের ভয়েই তিনি ৯ দিন ধরে বাড়িঘর ছেড়ে বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।
রতনের অভিযোগ, সালিশের নামে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এছাড়া রুবেলের পরিবারের কাছে তার জমি বন্ধক রাখার এক লাখ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। বাকি ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা এক মাসের মধ্যে তিন কিস্তিতে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
সালিশে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী জাহাঙ্গীর শিকদার (৫৭), রুবেল শিকদার (৪৪), সোহেল শিকদার (৩৭), দিহান শিকদার (২৫) এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আলী আশরাফ মাল (৭০), সাংগঠনিক সম্পাদক মোশারফ বেপারী (৬০), বড়কান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রাজ্জাক শেখ (৮০), সদস্য মতিউর রহমান খান (৬০), সদস্য লতিফ খান (৫৫) ও রাজ্জাক বেপারীসহ আরও কয়েকজনের নাম অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সালিশে থাকা জাজিরা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোশারফ বেপারী বলেন, পরকীয়ার প্রমাণসহ কোনো অপরাধই আমরা পাইনি। তারপরও সালিশের বেশিরভাগ প্রভাবশালী রতনকে জরিমানা করেছেন এবং গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, জরিমানার কারণ রতন রুবিনাকে বিয়ে করেছে। আমি একা প্রতিবাদ করে কী করব। আমি বলেছি, গ্রামের বিচারে সর্বোচ্চ জরিমানা ৩ লাখ টাকা। বেশিরভাগ সালিশের উদ্দেশ্য কী ছিল, আমি জানি না।
আরেক সালিশি ব্যক্তি রাজ্জাক বেপারী অবশ্য জরিমানার পক্ষে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, রতনের কারণেই রুবেলের বিয়ে ভেঙে গেছে, রুবেল জেল খেটেছে এবং আবার ডিভোর্সের বউ রতন বিয়ে করেছে। রুবেলকে কলঙ্কিত করেছে। তাই সালিশরা জুরি ভোটে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে। পরে রতন মাফ চাওয়ায় ৫০ হাজার টাকা কমানো হয়। এরপর তাকে গ্রামছাড়া করা হয়েছে।
রতনের প্রথম স্ত্রী হোসনে আরা বেগম (৩৮) বলেন, আমার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছে, এতে আমার সম্মতি ছিল। বিয়ে করায় আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমার স্বামীর কোনো অপরাধ নেই। তারপরও জাহাঙ্গীর শিকদার, রুবেল শিকদার, মোশারফ বেপারী, জামাল শেখ, লতিফ খানরা মিলে জোর করে আমার স্বামীকে জরিমানা করেছে এবং ঘরছাড়া করেছে। যারা আমার স্বামীর সঙ্গে জুলুম করেছে, তাদের বিচার চাই।
তবে রুবেল শিকদারের দাবি, তার সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ার কারণেই তার সংসার ভেঙেছে। তিনি বলেন, আমার স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া করে আমার সংসার তছনছ করে দিয়েছে রতন সরদার। আবার আমার স্ত্রীকে বিয়ে করেছে। পরকীয়া না করলে বউ থাকতে, আবার বিয়ে করল কেন? আমি আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তাই বৈঠকে সালিশরা রতনকে জরিমানা ও গ্রামছাড়া করেছে।
অভিযোগের বিষয়ে রতন সরদার বলেন, রুবিনা ও রুবেল শিকদারের ডিভোর্স হয়েছে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে। আর আমি তাকে বিয়ে করেছি গত মাসে। তাহলে আমি কী অপরাধ করেছি? আমি এলাকায় সঠিকভাবে চলি। এ কারণে রুবেলের পরিবার ও স্থানীয় সালিশরা আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে জুলুম করেছে। আমি এ ঘটনার সঠিক বিচার চাই।
এ বিষয়ে জাজিরা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালেহ আহাম্মদ বলেন, রতন সরদার একটি লিখিত অভিযোগ করেছেন। থানার এসআই হেমায়েতকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।