মুসলমানদের কাছে পবিত্রতম নগরী মক্কা। কাবাঘর ও মসজিদুল হারামকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই শহর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংঘাতেরও সাক্ষী। ইতিহাসে একাধিকবার অবরোধ, হামলা ও সহিংসতার মুখে পড়েছে মক্কা। কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাবাঘর, কখনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর দখলে গেছে মসজিদুল হারাম। এবার সেই দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতিদের চলমান সংঘাত।
সৌদি আরবের দাবি, হুতিরা মক্কার দিকে একটি ড্রোন পাঠিয়েছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ভাষ্য, মঙ্গলবার মক্কার দক্ষিণে ড্রোনটি শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়। পবিত্র নগরীর নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই সেটি ভূপাতিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে রিয়াদ। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি বলেছেন, দুই পবিত্র মসজিদ ও হাজিদের নিরাপত্তা তাদের জন্য ‘রেড লাইন’।
তবে সৌদি আরবের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুতিরা। হুতি নেতা আবদেল-মালিক আল-হুতি সৌদির দাবিকে ‘জঘন্য মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছেন। তার অভিযোগ, সৌদি আরব পবিত্র স্থানগুলোকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে এবং ইয়েমেনের বিরুদ্ধে মুসলিমদের উসকে দিচ্ছে।
গত কয়েক শতকে নানা রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতে একাধিকবার আক্রান্ত হয়েছে এই নগরী।
প্রথম অবরোধ (৬৮৩ খ্রিস্টাব্দ)
ইসলামের প্রথম দিকের রাজনৈতিক সংঘাতের সময় মক্কা অবরুদ্ধ হয়। দ্বিতীয় ফিতনার সময় ৬৮৩ সালে উমাইয়া বাহিনী মক্কা ঘেরাও করে। সংঘাতের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয় কাবাঘর। পরে ৬৯২ সালেও উমাইয়া সেনাপতি আল-হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ মক্কা অবরোধ করেন। সে সময় কাবার ওপর গোলাবর্ষণ করা হয়। পরে কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করা হয়।
কারমাতিদের হামলা (৯৩০ খ্রিস্টাব্দ)
মক্কার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাগুলোর একটি ঘটে ৯৩০ সালে। কারমাতি নেতা আবু তাহির আল-জান্নাবির বাহিনী হজের সময় মক্কায় ঢুকে হাজিদের ওপর হামলা চালায়। কারমাতিরা ছিল একটি উগ্র ইসমাইলি শিয়া সম্প্রদায়, যারা আব্বাসীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। ঐতিহাসিক বর্ণনায় এ হামলায় বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হওয়ার কথা পাওয়া যায়। হামলাকারীরা কাবা থেকে হাজরে আসওয়াদ খুলে নিয়ে যায়। প্রায় দুই দশক সেটি তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। পরে পবিত্র এই পাথরটি মক্কায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
মসজিদুল হারাম দখল (১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ)
আধুনিক ইতিহাসে মক্কার সবচেয়ে আলোচিত সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে ১৯৭৯ সালে। ২০ নভেম্বর জুহাইমান আল-ওতাইবির নেতৃত্বে কয়েকশ সশস্ত্র ব্যক্তি মসজিদুল হারামে ঢুকে সেটি দখল করে নেয়। তারা মুসল্লিদের জিম্মি করে সৌদি রাজপরিবারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দেয়।
মসজিদুল হারামে সশস্ত্র হামলাকারীরাজুহাইমান আল-ওতাইবির নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহীরা সৌদি রাজপরিবারকে দুর্নীতিগ্রস্ত, পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুসারী এবং ইসলামি আদর্শ থেকে বিচ্যুত বলে মনে করত। তারা বিশ্বাস করত জুহাইমানের জামাতা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল-কাহতানি হলেন প্রতীক্ষিত ‘ইমাম মাহাদী’ এবং তাকে পবিত্র কাবার সামনে শাসক হিসেবে ঘোষণা করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।
প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে মসজিদুল হারাম ঘিরে অভিযান চলে। শেষ পর্যন্ত সৌদি বাহিনী মসজিদের নিয়ন্ত্রণ নেয়। সরকারি হিসাবে, ওই অভিযানে ১৫৩ জন নিহত এবং ৫৬০ জন আহত হন।
ইরানি হাজিদের সঙ্গে সংঘর্ষ (১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দ)
১৯৮৭ সালের ৩১ জুলাই হজের সময় মক্কায় ইরানি হাজিদের একটি রাজনৈতিক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরানি হাজিরা হজের সময় ‘বারাআত মিনাল মুশরিকিন’ বা ‘মুশরিকদের থেকে বিচ্ছিন্নতার ঘোষণা’ নামে কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগানের পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ঐক্যের আহ্বান জানানো হতো। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় সৌদি আরব ইরাককে সমর্থন করায় দুই দেশের সম্পর্ক তখন তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ ছিল।
ইরানি হাজিদের সঙ্গে সংঘর্ষ১৯৮৭ সালে মিছিলটি মসজিদুল হারামের দিকে এগোলে সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী তা ঠেকানোর চেষ্টা করে। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়, এতে গুলির পাশাপাশি পদদলনের ঘটনাও ঘটে। সৌদি সরকারি হিসাবে এতে ৪০২ জন নিহত হন। যার মধ্যে ২৭৫ জন ইরানি, ৮৫ জন সৌদি ও ৪২ জন অন্যান্য দেশের নাগরিক।
এটি সাধারণত ‘মক্কা হত্যাকাণ্ড’ বা ইংরেজিতে ‘মক্কা ম্যাসাকার’ নামে উল্লেখ করা হয়। ইরানি সূত্র ও কিছু বর্ণনায় এটি ‘জুমার হত্যাকাণ্ড’ বা ‘ফ্রাইডে ম্যাসাকার’ নামেও পরিচিত।
মসজিদুল হারামের কাছে বোমা হামলা (১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ)
১৯৮৯ সালের ১০ জুলাই মসজিদুল হারামের বাইরে দুটি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। হামলায় একজন হাজি নিহত এবং ১৬ জন আহত হন। সৌদি কর্তৃপক্ষ পরে কুয়েতি নাগরিকসহ ১৬ জন বিদেশিকে এই হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। সৌদি আদালত তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেয় এবং পরে তা কার্যকর করা হয়।
হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে তখনও বিতর্ক ছিল। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, কুয়েতি শিয়া একটি গোষ্ঠী মক্কায় আতঙ্ক ছড়ানো এবং পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা দিতে সৌদি সরকারের অক্ষমতা তুলে ধরার উদ্দেশ্যে হামলাটি চালিয়েছিল। সৌদি কর্মকর্তারা এ ঘটনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতারও অভিযোগ করেন। তবে তেহরান তা অস্বীকার করে এবং হামলাটিকে ইরানকে ফাঁসানোর ষড়যন্ত্র বলে দাবি করে।
মক্কার দিকে ক্ষেপণাস্ত্রের দাবি (২০১৭ খ্রিস্টাব্দ)
মক্কাকে ঘিরে আধুনিক সময়ের আরেকটি বড় ঘটনা ঘটে ২০১৭ সালে। বর্তমান সময়ের মতো তখনো সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি ছিল, হুতিরা মক্কার দিকে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। সৌদি আরব জানায়, মক্কার কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই সেটি প্রতিহত করা হয়। হুতিরা অবশ্য মক্কাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার অভিযোগ অস্বীকার করে।
তথ্যসূত্র: সৌদি পিডিয়া, ওয়াশিংটন পোস্ট, ইউপিআই, আরব নিউজ, উইকিজিরো