Image description

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মুনাফার নির্ধারিত একটি অংশ বিভিন্ন সামাজিক কাজে ব্যয় বাধ্যতামূলক হচ্ছে। এই ব্যয় হবে প্রতিষ্ঠানের কর-পূর্ব মুনাফার কমপক্ষে ১ শতাংশ হারে। তবে সামাজিক কাজে ব্যয়ের জন্য নির্ধারিত তহবিল থেকে কোনো রাজনৈতিক দলকে অর্থ দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কাজেও ব্যয় করা যাবে না।

দেশে দায়িত্বশীল ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি টেকসই সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) নীতিমালা, ২০২৬’ তৈরি করেছে। এরই মধ্যে নীতিমালার খসড়ার ওপর অংশীজনের মতামত চাওয়া হয়েছে। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট অংশীজন মতামত দিতে পারবেন।

আগে বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানি নিজস্ব উদ্যোগে সিএসআর কার্যক্রম পরিচালনা করলেও জাতীয় পর্যায়ে কোনো সমন্বিত সিএসআর কাঠামো ছিল না। সামাজিক দায়বদ্ধতায় (সিএসআর) ব্যয় বাধ্যতামূলক করতে এই নীতিমালা করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এই নীতিমালায় একটি ‘জাতীয় সিএসআর সমন্বয় কমিটি’ গঠনের কথাও বলা হয়েছে। তবে প্রধান সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কাঠামোর অভাবে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সিএসআর কার্যক্রমে যে ভিন্নতা ও পরিকল্পনাহীনতা ছিল, তা দূর করে একটি স্বচ্ছ, সমন্বিত ও সুনির্দিষ্ট জাতীয় সিএসআর কাঠামো প্রতিষ্ঠা করাই এই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য।

জানা যায়, দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০০৯ সাল থেকেই সিএসআর কার্যক্রমে অর্থ ব্যয় করতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করে আসছিল। ২০২২ সালে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি সিএসআর নীতিমালা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই নীতিমালায় ব্যাংকের জন্য নির্দিষ্ট কোনো হার বলে দেওয়া হয়নি। বিদ্যমান নিয়মে কোনো ব্যাংক নিট লোকসানে থাকলে সিএসআর খাতে কোনো ব্যয় করতে পারে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সিএসআরকে উৎসাহ দিতে এ খাতে ব্যয় করা অর্থে কর ছাড় দিয়েছে ২০১০ সালে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের খসড়া নীতিমালায় বলা হয়, সরকার পাঁচ বছর পরপর নীতিমালার পুনর্মূল্যায়ন করবে। আগে সিএসআরের অগ্রাধিকার, তদারকি, ব্যয় ও ফলাফল মূল্যায়নে জাতীয় সমন্বয় ছিল না। নতুন নীতিমালায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি ও ব্যবসায়িক সংগঠনের সমন্বয়ে ‘জাতীয় সিএসআর সমন্বয় কমিটি’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। নীতিমালার ১০(১) অনুসারে, আওতাভুক্ত প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে প্রতি অর্থবছর তার পূর্ববর্তী অর্থবছরের কর-পূর্ব মুনাফার ন্যূনতম ১ (এক) শতাংশ সিএসআর কার্যক্রমে ব্যয় করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠান চাইলে বেশিও ব্যয় করতে পারবে। নীতিমালায় সিএসআর প্রকাশের ক্ষেত্রে অসত্য, বিভ্রান্তিকর ও প্রমাণবিহীন ‘পরিবেশবান্ধব’ বা ‘কার্বন নিরপেক্ষ’ দাবি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সিএসআর প্রকল্প পরিচালনার মোট ব্যয়ের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ যুক্তিসংগত প্রশাসনিক ব্যয় হিসেবে গ্রহণ করা যাবে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে বার্ষিক সিএসআর রিপোর্ট প্রস্তুত করে নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে এবং অনিয়ম রোধে অভিযোগ ও প্রতিকার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

নীতিমালাটিকে সময়োপযোগী বলছেন অর্থনীতিবিদরা। বাধ্যতামূলক ব্যয়ের হার বাস্তবায়নে নতুন, ক্ষুদ্র ও আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানের জন্য নমনীয়তা প্রয়োজন। সিএসআর যেন নিয়মিত কর প্রদান, শ্রমিকের অধিকার বা পরিবেশগত দায় পালনের বিকল্প না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করছেন তারা।

তবে কিছু জায়গায় আপত্তি তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, ব্যয়ের হারের ক্ষেত্রে কর-পূর্ববর্তী মুনাফা থেকে না হয়ে কর-পরবর্তী মুনাফা থেকে হওয়া উচিত। এ ছাড়া সবার জন্য বাধ্যতামূলক করাটা কিছুটা কঠোর নীতি হয়ে যাবে বলেও মনে করছেন তারা।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন কালবেলাকে বলেন, সার্বিকভাবে নীতিমালাটি সময়োপযোগী ও বেশ বিস্তৃত। করপূর্ব মুনাফার ন্যূনতম ১ শতাংশ সিএসআরে ব্যয়, পৃথক হিসাব, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন, অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ, পরিবীক্ষণ, ফলাফল মূল্যায়ন ও তথ্য প্রকাশের বিধান ইতিবাচক। এতে বিচ্ছিন্ন অনুদানের পরিবর্তে সিএসআরকে পরিকল্পিত ও উন্নয়নমুখী করার সুযোগ তৈরি হবে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অনুদানকে সিএসআর হিসেবে গণ্য না করার বিধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে এটি মানলেও, পরোক্ষভাবে কোনো ফাউন্ডেশন, অনুষ্ঠান, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান বা প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে অর্থ ব্যবহারের ঝুঁকি থাকবে। তাই শুধু নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয়। কঠোর নজরদারিও করতে হবে।

নীতিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সিএসআর ব্যয়ের স্বচ্ছতা, ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন এবং জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশ। কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, কোথায় হয়েছে—এর পাশাপাশি কারা উপকৃত হয়েছেন এবং কী স্থায়ী পরিবর্তন এসেছে, তা যাচাই করা জরুরি।

বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক এবং বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক কালবেলাকে বলেন, প্রাথমিকভাবে খসড়া নীতিমালা দেখে আমাদের মনে হয়েছে যে করপূর্ব মুনাফা থেকে দেওয়ার নীতি না করে করপরবর্তী মুনাফা থেকে করা উচিৎ। এছাড়া সবার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করাটাও কঠোরতা। অনেক ছোট কোম্পানি রয়েছে যারা সিএসআরকি জানেই না। তবে আমাদের বিশেষজ্ঞ টিম এটিকে আরও যাচাই বাছাই করছে। আগামী সপ্তাহে এর উপর আমরা মতামত দিব।

আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহ: নতুন নীতিমালায় সবার জন্যই সিএসআর বাধ্যতামূলক করার নীতি রাখা হয়েছে। নীতিমালার ৬.২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনাকারী পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানি, সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান; সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান; বহুজাতিক ও বিদেশি কোম্পানি; নির্দিষ্ট আর্থিক সীমার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সিএসআরে অর্থ ব্যয় বাধ্যতামূলক। কোন প্রতিষ্ঠান সিএসআর নীতিমালার আওতাভুক্ত হবে এবং তাদের আর্থিক সীমা কত হবে, তা নির্ধারণ করা হবে ২০২২ সালের জাতীয় শিল্পনীতি অনুযায়ী।

তবে নীতিমালায় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং নির্দিষ্ট আর্থিক মানদণ্ড পূরণ না করা ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) প্রতিষ্ঠানের জন্য সিএসআর ব্যয় বাধ্যতামূলক না রেখে স্বেচ্ছাভিত্তিক রাখা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো তাদের মুনাফা থেকে মোট ৩৪৫ কোটি টাকা সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে, যা তার আগের বছর ২০২৪ সালে ছিল ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ২০২৩ সালে ছিল ৯২৪ কোটি টাকা ও ২০২২ সালে ব্যাংকগুলো সিএসআর ব্যয় করেছিল ১ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা।

অগ্রাধিকার দিতে হবে: বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী বর্তমানে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট সিএসআর ব্যয়ের মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ৩০ শতাংশ করে মোট ৬০ শতাংশ; পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন খাতে ২০ শতাংশ এবং আয়-উৎসারী কাজ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্রীড়া, সংস্কৃতিসহ অন্যান্য খাতে বাকি ২০ শতাংশ খরচ করতে পারে। তবে নতুন নীতিমালায় এ ধরনের কোনো ভাগ করা হয়নি। নীতিমালায় বিচ্ছিন্ন অনুদানের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী সুফল প্রদানকারী খাতে সিএসআর ফান্ড ব্যয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, ঝরে পড়া রোধ, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি শিক্ষা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে ব্যয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষা, পুষ্টি কর্মসূচি এবং জটিল ও মারাত্মক রোগের চিকিৎসা সহায়তা; পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু মোকাবিলা; নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন; দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান; বিশেষ জনগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী কল্যাণ; জাতীয় জরুরি প্রয়োজন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং গবেষণা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতের মতো সামাজিক কাজে ব্যয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ, ক্রীড়া উন্নয়ন এবং জাতীয় উন্নয়নমুখী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণায় ব্যয় করতে হবে তহবিলের অর্থ।

নির্ধারিত অর্থ পুরোপুরি ব্যয় না হলে তার কারণ, পরিমাণ এবং ব্যবহারের পরিকল্পনা বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে পরের অর্থবছরে ব্যবহার করার সুযোগও রাখা হয়েছে।

ব্যয় করা যাবে না যে খাতে: নীতিমালার ৭ম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আট ধরনের ব্যয় সিএসআর ফান্ড থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাণিজ্যিক বা আইনি সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে করা কোনো ব্যয়কে সিএসআর হিসেবে গণ্য করা হবে না বলে জানানো হয়। খসড়া নীতিতে বলা হয়, কোনো রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রদত্ত অর্থ সিএসআর হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ ছাড়া যে কোনো প্রচলিত আইন বা বিধিমালা মানার জন্য প্রয়োজনীয় কোনো খরচকে সিএসআর ফান্ড থেকে করা যাবে না। প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন পরিচালনা সংক্রান্ত খরচ; পণ্য বা সেবার সরাসরি প্রচার ও বাজারজাতকরণের ব্যয়; কোনো আইন ভঙ্গের কারণে প্রদত্ত জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ; প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন, বোনাস ও চাকরিগত সুবিধা; মালিক, পরিচালক বা সংশ্লিষ্টদের ব্যক্তিগত সুবিধা, উপহার ও প্রাতিষ্ঠানিক আতিথেয়তার ব্যয় এবং আইন বা জনস্বার্থবিরোধী যেকোনো কার্যক্রমে সিএসআর ফান্ডের টাকা ব্যয় করা যাবে না।

সমন্বয় কমিটি: ‘জাতীয় করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) নীতিমালা, ২০২৬’-এর ১৮.২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সিএসআর সমন্বয় কমিটি গঠনের প্রস্তাবিত করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এই জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে। কমিটিতে অর্থ মন্ত্রণালয়; জাতীয় রাজস্ব বোর্ড; শিল্প মন্ত্রণালয়; শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়; পরিবেশবিষয়ক মন্ত্রণালয়; বাংলাদেশ ব্যাংক; বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন; বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ; বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ; রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো; ও ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা সদস্য হিসেবে থাকবেন। এই কমিটি প্রধানত জাতীয় পর্যায়ে সিএসআর কার্যক্রমে সমন্বয় সাধন, সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সুপারিশ প্রদান করবে।