Image description

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় মেট্রোরেলের তিন প্রকল্প একসঙ্গে অনুমোদন করা হয়েছে। প্রকল্প তিনটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। তিন প্রকল্পের মধ্যে দুটি হলো—জাপানের অর্থায়নে মেট্রোরেল লাইন-১ (বিমানবন্দর-কমলাপুর) ও লাইন-৫ নর্দার্ন (হেমায়েতপুর-ভাটারা) প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব। অন্য প্রকল্পটি হলো—এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও কোরিয়ার যৌথ অর্থায়নের এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন (গাবতলী-দাশেরকান্দি) প্রকল্প। তিন মেট্রোরেলসহ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) গতকাল বুধবার মোট ১২টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেক সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প সাতটি ও সংশোধিত প্রকল্প পাঁচটি। একনেক সভা শেষে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি মেট্রোরেল প্রকল্পের সার্বিক বিষয়ে ব্রিফ করেন।

জানা গেছে,গতকাল বুধবার একনেকের মূল এজেন্ডায় শুধু এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন (গাবতলী-দাশেরকান্দি) প্রকল্পটি উপস্থাপনের কথা ছিল। পরে এই প্রকল্পের সঙ্গে জাপানের অর্থায়নের সংশোধিত দুটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য একনেকে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

জাপানের অর্থায়নে ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এমআরটি লাইন-১ বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। জাপানের অর্থায়নের ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ১৩.১০ কিলোমিটার আন্ডরগ্রাউন্ডসহ ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।

দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেলের এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর) প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য একনেকে উপস্থাপন করা হয়। প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ছে ১১৭.৬৪ শতাংশ। ২০৩৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি এমআরটি করিডোর নির্মাণ ও চালু করা।

শিগিগর আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ রুট)। প্রকল্পের সবকিছু মোটামুটি প্রস্তুত। রাজধানীর গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে এ মেট্রোলাইন। হাতিরঝিল অংশের লাইন যাবে টানেল দিয়ে। আফতাবনগর থেকে বাকিটা হবে উড়াল। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। বাকি ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা যৌথভাবে দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের উন্নয়ন সহায়তা তহবিল (ইডিসিএফ)। প্রকল্পের মোট দৈর্ঘ্য রাজধানীর গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার।

নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে চলবে দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন

দেশে প্রথমবারের মতো বৈদ্যুতিক ট্রেন চালু করবে সরকার। এই ট্রেন চলবে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে। ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ রুটে এই বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর প্রকল্পে মোট প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি ব্যয় ৯৪২ কোটি টাকা। বাকি টাকা উন্নয়ন সহায়তা হিসেবে দেবে ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

দেশের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর উদ্যোগ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।

প্রকল্পটির আওতায় নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রুটের ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন বা ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। এজন্য ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় পাঁচ কোচের ১৬ সেট ইলেকট্রিক মালটিপল ইউনিট (ইএমইউ) সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক ট্রেনের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জয়দেবপুরে একটি আধুনিক ওয়ার্কশপ নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক অবকাঠামো স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে ৯৪২ কোটি ৯ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে এবং ২ হাজার ৮৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও ইউরোপীয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (ইআইবি) প্রকল্প ঋণ থেকে জোগান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এদিকে, ইলেকট্রিক ট্রেন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ রেলওয়ের বিদ্যুত্ নির্ভর ট্রেন পরিচালনার যাত্রা শুরু হবে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এতে ব্যস্ত নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর করিডোরে রেল পরিবহনের সক্ষমতা বাড়বে এবং ডিজেলনির্ভরতার পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয় ও কার্বন নিঃসারণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

মেট্রোরেলের কাজের পরিধি পরিবর্তন হওয়ায় ব্যয় বেড়েছে : জোনায়েদ সাকি

মেট্রোরেলের দুই প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, প্রকল্পের কাজের পরিধি ও স্কোপ ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর বিস্তারিত ফিজিবিলিটি স্টাডিতে বিভিন্ন স্থানে স্টেশনের অবস্থান পরিবর্তনসহ প্রকল্পের বিভিন্ন অঙ্গের পরিধি বেড়েছে। এর ফলে নির্মাণ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিনি বলেন, প্রকল্পের ঋণ জাপানি মুদ্রা ইয়েনে হলেও বাংলাদেশের জন্য ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মূল্যমানের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয়। এছাড়া মূল্যস্ফীতি, শ্রমের ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রকল্প ব্যয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট-ট্যাক্স বৃদ্ধিও মোট ব্যয় বাড়িয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ঋণের সুদহারে। প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির শুরুতে জাইকার ঋণের সুদের হার ধরা হয়েছিল শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। দীর্ঘসূত্রতার কারণে বর্তমানে সেই সুদের হার বেড়ে ৩ দশমিক ০৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগামী সময়ে প্রকল্প আরো বিলম্বিত হলে সুদের হার আরো বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।  তিনি আরো বলেন, মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটি প্রকল্পের অর্থায়ন, প্রযুক্তি, ব্যয় বৃদ্ধি ও অন্যান্য বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেছে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই প্রকল্পটি সংশোধিত আকারে একনেকে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় বাড়লেও ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার জন্য মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তার মতে, ঢাকার বিপুল জনসংখ্যার চাপ ও যানজট বিবেচনায় গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করতে মেট্রোরেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর মাধ্যমে যাতায়াতের সময় ও দূরত্ব কমার পাশাপাশি জ্বালানি সাশ্রয় এবং মানুষের কর্মঘণ্টা বাঁচবে।

একনেক সভায় ১২ প্রকল্প অনুমোদন :একনেক সভায় মোট ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়সংবলিত ১২টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সাতটি নতুন এবং পাঁচটি সংশোধিত প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ৪৮ হাজার ২৫৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার ৪৬৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকার সংস্থান করা হবে।

সভায় অনুমোদিত ১২টি প্রকল্পের মধ্যে সর্বোচ্চ পাঁচটি প্রকল্প সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের। এগুলো হলো—ঢাকা ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বা মেট্রোরেলের লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট), রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সড়ক জোনের আওতায় জেলা মহাসড়কসমূহ যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ প্রকল্প এবং মেট্রোরেলের লাইন-৫ (নর্দান রুট) ও লাইন-১-এর প্রথম সংশোধিত প্রকল্প।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন বাস্তবায়ন এবং বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ (১ম সংশোধন) প্রকল্প।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় বরিশাল সেনানিবাস স্থাপন (২য় পর্যায়) এবং খুলনা নৌ অঞ্চলে নৌ সদস্যদের আবাসন সুবিধাসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।

এছাড়া পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীনে খুলনা পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন (১ম সংশোধন) প্রকল্প, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে টেক্সটাইল ও চামড়া খাতের শ্রমিকদের কাজের উন্নত পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ক প্রকল্প এবং বিদ্যুত্ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অধীনে মনপুরা দ্বীপাঞ্চলে বিদ্যুত্ বিতরণ ব্যবস্থার আপগ্রেডেশন ও সম্প্রসারণ (১ম সংশোধিত) প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি, সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী কর্তৃক ইতিপূর্বে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়সংবলিত ১৫টি প্রকল্প সম্পর্কে একনেককে অবহিত করা হয়।