Image description

নতুন দুজনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দাবি করল, ঢাকার সড়কে প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর জন্য এই ‘ছিনতাইকারী’রাই দায়ী। র‌্যাব যাদের গ্রেপ্তার করেছিল, তারা নয়।

আজ বুধবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সংবাদ সম্মেলন করে আরও জানায়, গ্রেপ্তার খোকন ও রাজীব মাতব্বর অভিযোগ স্বীকার করেছেন। তাদের দেওয়া তথ্যে উদ্ধার করা হয়েছে রনজিলা পারভীনের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া ব্যাগটি।

সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত নন।

রনজিলা পারভীন (৫৬) বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিক ছিলেন। তার বাড়ি গাবতলী উপজেলারেই তরফসরতাজ গ্রামে।

নিজের চোখের চিকিৎসার জন্য স্বামী আবদুল মতিনকে নিয়ে গত ২৯ আগস্ট ঢাকায় এসেছিলেন রনজিলা। ভোরে কল্যাণপুরে নেমে রিকশায় ফার্মগেটের ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে যাওয়ার সময় মানিক মিয়া এভিনিউতে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন তারা।

আবদুল মতিনের বর্ণনা অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে রনজিলার ব্যাগ ধরে টান দিয়েছিলেন। এতে চলন্ত রিকশা থেকে পড়ে যান রনজিনা।

রনজিনাকে দ্রুত শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাকে বাঁচানো যায়নি। এরপর আবদুল মতিন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা দুই ছিনতাইকারীকে আসামি করে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।

পরদিন দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার এবং ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধারের দাবি করে র‌্যাব। পরে আরেকজনকেও গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে দেখা মোটরসাইকেলের জন্য আটক মোটরসাইকেলের রঙ না মেলায় তা নিয়ে প্রশ্ন উঠে।

তার দুৃই সপ্তাহ পর পুলিশ ‘প্রকৃত’ ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানাল।

এবার রনজিনার ব্যাগও উদ্ধার

সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, তারা সিসি ক্যামেরার ভিডিও পর্যালোচনা এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করেন। এরপর ঢাকা ও সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে খোকন ও রাজীবকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় রাজীব মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন এবং খোকন পেছনে বসে রনজিলার ব্যাগ ধরে টান দিয়েছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে খোকন তা স্বীকারও করেন।

খোকনের দেওয়া তথ্যে রাজধানীর মিরপুর থানার বড়বাগ এলাকা থেকে রনজিলার ব্যাগটি উদ্ধার করা হয় বলে জানায় ডিবি পুলিশ। ওই ব্যাগে তার ব্যবহৃত পোশাক, টিকিটের অংশ, চশমার খাপ ও কিছু ওষুধ ছিল। এরপর মিরপুর-১ এলাকা থেকে রনজিলার মোবাইল ফোনও উদ্ধার করা হয়।

রাজীবকে গ্রেপ্তার করা সভারের বিরুলিয়া থেকে। ঘটনার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি তার দেওয়া তথ্যে দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয় বলে জানান পুুিলশ কর্মকর্তা শফিকুল।

রাজীবের কাছ থেকে ৬২২টি ইয়াবা উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে ডিবি। শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজীবের বিরুদ্ধে অস্ত্র, দস্যুতা, চুরি, মারামারির অভিযোগে আটটি মামলা রয়েছে। খোকনের বিরুদ্ধে রয়েছে মাদকের তিনটি মামলা।

এদেরকেই প্রকৃত অপরাধী হিসেবে দেখিয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রনজিলার ব্যাগ, মোবাইল ফোন, পরনের পোশাক, ওষুধ ও টিকিটের অংশসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। এসব আলামত ও ভিডিও ফুটেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে আপনারাও বিষয়টি বুঝতে পারবেন।’

খোকনকে চিনেছেন রনজিনার স্বামী

ডিবি জানিয়েছে, রনজিলার স্বামী ঘটনার সময় ছিনতাইকারীকে এক ঝলক দেখেছিলেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তার মনে থাকা সেই চেহারার বর্ণনা তদন্তকারীদের জানান।

গ্রেপ্তারের পর খোকনকে তিনি শনাক্ত করেন বলে ডিবি জানিয়েছে।

মোটরসাইকেলটিও আলাদা

শফিকুল ইসলাম বলেন, র‌্যাব তখন ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল। তবে সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে সেটি মিলিয়ে দেখার পর পার্থক্য পাওয়া যায়। ভিডিও ফুটেজে যে মোটরসাইকেল দেখা গেছে, তার রং এবং র‌্যাব যে মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছিল, তার রং ভিন্ন।

র‌্যাবের উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটি ভাড়ার ছিলো বলেও জানিয়েছিলো র‌্যাব।

কিন্তু ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি রাজীবের নিজের বলে জানিয়েছে ডিবি। এটি ভাড়া করা হয়নি। মোটরসাইকেলের পাশাপাশি খোকনের পরনের শার্ট, হাতে থাকা ঘড়ি ও মাথার ক্যাপও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিবি।

র‌্যাবের গ্রেপ্তার তিনজন ‘জড়িত নন’

শফিকুল ইসলাম বলেন, র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরবর্তী তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে রনজিনার মৃত্যুর ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

ঘটনার পরদিন দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার এবং ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধারের দাবি করেছিল র‌্যাব। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা ছিলেন মোশারফ হোসেন ওরফে পনি গাজী এবং তার সহযোগী সেড্রিক। পরে রাকিব নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তখন র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনে মোশাররফ হোসেন পনি চিৎকার করে বলেছিলেন, এ ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন।

ডিবি কর্মকর্তা শফিকুল বলেন, র‌্যাব যে ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করেছিল, তাদের মধ্যে একজনের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা ছিল। এছাড়াও অন্য গ্রেপ্তারদেরও মামলা রয়েছে। তাদের রনজিনা হত্যামামলা থেকে বাদ দেওয়া হবে। তবে অন্য মামলায় আইনি প্রক্রিয়া চলবে।