কক্সবাজারের টেকনাফের সীমান্ত পথে মিয়ানমারে পাচার হয়ে যাচ্ছে সার। এতে টেকনাফে সারের কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে। কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বিসিআইসি ডিলারসহ খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। কৃষকরা সারের জন্য আসছেন, আর না পেয়ে বাড়িতে খালি হাতে ফেরত যাচ্ছেন। কৃষকদের অনেককে বস্তা বগলে নিয়ে সারের এই দোকান থেকে ওই দোকানে ঘুরাঘুরি করতে দেখা গেছে। সার ডিলারের আশেপাশে ঘুরাঘুরি করা কৃষকদের মাঝে তা নিয়ে এক ধরনের হতাশা এবং ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
কৃষকরা জানায়, আগস্ট সেপ্টেম্বর মাসে জমিতে সার প্রয়োগ করতে হয়। উক্ত দুই মাসই সার প্রয়োগের উপযুক্ত সময়। ভরা এই মৌসুমে জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারলে ধান যেমন ভালো হবে না। তেমনি ফলনও আশানুরূপ হবে না বলে কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জানা যায়, চলতি আমন মৌসুমে ধানের চারা রোপণের পর থেকে শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি। মাঝে কয়েকদিন বৃষ্টি থামলেও আগস্ট মাসের পুরো সময়েই টানা বৃষ্টি ছিল। ওই সময়ে কৃষকদের অনেকে জমিতে সার প্রয়োগ করলেও বৃষ্টির পানিতে অনেকটা ভেসে গেছে। এতে করে সব ধানি জমিতে পুনরায় সার প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকার কর্তৃক ইউরিয়া সার বস্তা প্রতি ১ হাজার ৩৫০ টাকা, টিএসপি সার ১ হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০০ টাকা, এমওপি ১ হাজার টাকায় বিক্রির নির্দেশনা রয়েছে। সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো বিক্রি করছে ডিলাররা।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ইউরিয়া সার বস্তা প্রতি ১ হাজার ৬৫০টাকা, টিএসপি সার ১ হাজার ৬৫০ টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৪৫০ টাকা ও এমওপি সার ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ক্ষেত্রভেদে এর চেয়েও আরো বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ তুলছেন কৃষকদের অনেকেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষি অফিসের নির্দেশনার আলোকে ডিলার কর্তৃক বস্তার মুখ কেটে সার বিক্রি করা হচ্ছে। এরপরও বিভিন্নভাবে পাচারকারীদের হাতে সার পৌঁছে যাচ্ছে। এই সার আবার বিচ্ছিন্নভাবে মিয়নামারে পাচারের ঘটনাও ঘটেছে। কোস্ট গার্ড, বিজিবি, মিয়ানমারে পাচারের সময় টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বেশ কয়েকবার সারের চালান জব্দ করেছে। সম্প্রতি বিজিবি মিয়ানমারে পাচারকালে হাতে ১০-২০ কেজি বস্তাসহ সার জব্দ করেন। দেখা গেছে, ১০-২০ কেজি বস্তার সার সংগ্রহ করে পাচারকারীরা বস্তায় ভরে তা আবার নিজেরা সেলাই করে পাচার করে দিচ্ছে মিয়ানমারে। উক্ত ঘটনার পর থেকে কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনেকটা নড়েচড়ে বসেছেন বলে জানা গেছে। ঘটনাটির পর সার পাচার ও বিতরণে আরো কঠোর হওয়ার পাশাপাশি শক্ত মনিটরিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে। সূত্রে প্রকাশ, হ্নীলা, হোয়াইক্যং দুই ইউনিয়নে কিছুটা সারের সংকট থাকলেও উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নে কোনো ধরনের সারের সংকট নেই।
টেকনাফের জন্য ইতোমধ্যে ৭০ টন অতিরিক্ত সারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহে ওই সার পাওয়া গেলে সংকট আর থাকবে না বলে জানা গেছে। উপজেলার হ্নীলা পানখালী এলাকার কৃষক খলিল আহমদ জানিয়েছেন, চলতি আমন মৌসুমে ৪৫ কানি জমিতে ধানের চাষ করেছেন তিনি। চাষ করা জমিতে প্রয়োগের জন্য সারের দোকানে দোকানে ঘুরতে ঘুরতে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। ডিলাররা এ ধরনের সংকট সৃষ্টি করেছেন। তিনি সার না পাওয়ায় রীতিমতো উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
হোয়ব্রাং এলাকার কৃষক সরোয়ার আলম জানান, প্রায় চার একর জমিতে আমনের চারা রোপণ করেন। সারের জন্য তিনি শুধু ঘুরছেন আর ঘুরছেন। কিন্তু সার পাচ্ছেন না। একই এলাকার কৃষক হোছন জানান, ১০ কানি জমিতে চাষাবাদ করেছি। সারের জন্য ডিলারের কাছে গেলে ১০-১৫ কেজির ওপর সার দেয় না। যা চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
হ্নীলার মরিচ্যাঘোনা এলাকার কৃষক জহির বৈদ্য জানান, ১০ কানি জমিতে চাষাবাদ করে মাত্র ১০ কেজি সার পেয়েছেন বলে চরম দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ছোট লেচুয়াপ্রাং এলাকার কৃষক সিরাজ মিয়া জানান, পাঁচ কানি জমিতে আমনের চারা রোপণ করেছেন। তিনি এখনো কোনো সার না পেয়ে জমিতে সার প্রয়োগ করতে পারেননি বলে জানিয়েছেন।
হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কম্বনিয়াপাড়া এলাকার কৃষক আব্দুস শুক্কুর সার না পেয়ে জমি পরিত্যক্ত রাখার কথা জানিয়েছেন। ওই এলাকার কিষানি নুরুন্নাহার জানান, তিন কানি জমিতে আমন ধান ও এক কানি জমিতে ক্ষেত খামার করেছেন। তিনি এ পর্যন্ত ১৫ কেজি সার পেয়েছেন বলে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন।
উনছিপ্রাং রইক্ষ্যং এলাকার কৃষক আব্দু শুক্কুর জানান, দুই একর জমিতে তিনি চাষাবাদ করেছেন। সারের জন্য ডিলারের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, কিন্তু সার মিলছে না বলে অভিযোগ করেন।
রইক্ষ্যং পুটিবনিয়া এলাকার কৃষক কিউ চিং চা চাকমা জানান, তিনি এ বছর ছয় কানি জমিতে ধানের চারা রোপণ করেছেন। সংকটের কারণে জমিতে সার দিতে পারেননি। তিনি বেশ কয়েকবার হ্নীলায় এসেও সার না পেয়ে ফেরত গেছেন। কৃষক কিউ চিং চা চাকমা স্থানীয়ভাবে কেজি প্রতি ৪০-৪৫ টাকায় সার কিনে জমিতে প্রয়োগের কথা জানিয়েছেন।
কাঞ্জরপাড়া এলাকার কৃষক কামাল উদ্দিন বাচ্চু জানান, আট কানি জমিতে ধান লাগিয়ে সারের জন্য ডিলারের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এখনো সার পায়নি জানিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
লম্বাবিল তেচ্ছিব্রিজ এলাকার কৃষক শাহ আলম জানিয়েছেন, তিনিও এই মৌসুমে ২০ কানি জমিতে ধানের চারা রোপণ করেছেন। সারের জন্য হোয়াইক্যং ডিলার মোশতাকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তিনি এক কেজিও সার পায়নি বলে জানিয়েছেন।
সার নিয়ে টেকনাফে কৃষকদের মাঝে এক ধরনের হাহাকার চলছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম ওসমানগনী। কৃষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, টেকনাফের প্রকৃত কৃষকরা সময়মতো সার পাচ্ছে না। ডিলাররা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে কৃত্রিমভাবে সংকট করেছে।
তিনি বলেন, সরকারের ভাবমূর্তি যেন ক্ষুণ্ন করতে না পারে চোরাকারবারিরা ও মিয়ানমারে সার পাচারে জড়িতদের চিহ্নিত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
টেকনাফ উপজেলা কৃষি অফিসার হুমায়ুন কবির জানান, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রয়ের কোনো সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে সার ডিলার মালিকরা বৈঠক করে এ বিষয়ে তাদেরকে কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে। তিনি উচ্চমূল্যে সার বিক্রি এবং সংকটের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখবেন বলে জানান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিকের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হয়। মোবাইল রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সার মনিটরিং কমিটির সভাপতি এসএম অনীক চৌধুরী জানান, সার সংকটের বিষয়টি মোটেও সত্য নয়। তবে হ্নীলা-হোয়াইক্যংসহ টেকনাফ উপজেলায় নতুন করে ১১০ হেক্টর লবণ মাঠে ধানের আবাদ বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত ৭০ টন ইউরিয়া সারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। যা আগামী সপ্তাহে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চাহিদা অনুপাতে সার পেলে আর সমস্যা দেখা দিবে না বলে তিনি জানান।