Image description
অধিকাংশই ছিল সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র

দেশে চলমান তীব্র বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিংয়ের সময়ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে প্রত্যাশিত মাত্রায় বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়নি। অথচ ২০২৫-২৬ সালের মধ্যেই উৎপাদনে আসতে পারত—এমন অন্তত ৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র দায়মুক্তি আইনের আওতায় অনুমোদিত হওয়ার যুক্তিতে বাতিল করা হয়েছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশের নির্মাণকাজ ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। অনেক প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণও চলছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে এসব প্রকল্পের অনুমোদন বাতিল হয়ে যায়।

নথি অনুযায়ী, এনআরবি কোম্পানির ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার ফেঞ্চুগঞ্জ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০১৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ক্রয় কমিটির অনুমোদন পায়। কেন্দ্রটি ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চালু হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। মালয়েশিয়ার এডরা পাওয়ার হোল্ডিংস ও বাংলাদেশের ইউনিভিশন পাওয়ার লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার গজারিয়া এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি এলওআই (লেটার অব ইনটেন্ট) ইস্যু করা হয়। কেন্দ্রটি ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে উৎপাদনে আসার কথা ছিল। একইভাবে কনফিডেন্স গ্রুপের ৬৬০ মেগাওয়াট মিরসরাই এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এলওআই ইস্যু করা হয় ২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি। এর সম্ভাব্য বাণিজ্যিক উৎপাদনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৯ সালের জানুয়ারি। অন্যদিকে আনলিমা পাওয়ারের ৪৫০ মেগাওয়াট মেঘনাঘাট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এলওআই দেওয়া হয় ২০১৯ সালের ২৫ জুন। কেন্দ্রটি ২০৩০ সালের জুনে চালু হওয়ার লক্ষ্য ছিল।

এ প্রকল্পগুলোসহ বাতিল হওয়া ৩৬টি প্রকল্পের অধিকাংশই ছিল সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র। নথি অনুযায়ী, রহিমআফরোজ ও চীনা কোম্পানি শানফেং লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত দেবীগঞ্জ পঞ্চগড় ২০ মেগাওয়াট সৌর পার্ক, প্যারামাউন্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মৌলভীবাজার সোলার পাওয়ার লিমিটেডের মালিকানাধীন মৌলভীবাজার সিলেট ১০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিঙ্গাপুরভিত্তিক এভান্টাস সিঙ্গাপুর হোল্ডিংস প্রাইভেট লিমিটেডের প্রতিষ্ঠান পদ্মা সোলার লিমিটেডের মালিকানাধীন পঞ্চগড় ৫০ মেগাওয়াট সৌর পার্ক, জার্মানি কোম্পানি আইবি ভোগ্ট জিএমবিএইচের মালিকানাধীন সোনাগাজী সোলার পাওয়ার লিমিটেডের বারয়েরহাট চট্টগ্রাম ৫০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিঙ্গাপুরভিত্তিক হিরো ফিউচার এনার্জি এশিয়া পিটিই লিমিটেড ও পানামাভিত্তিক বিজনেস রিসার্চ ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন ইনকরপোরেটেড মালিকানাধীন তেরখাদা খুলনা ৫০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিঙ্গাপুরভিত্তিক সিকলেক্ট এনার্জি লিমিটেডের চুয়াডাঙ্গা ৫০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, দেশীয় প্রতিষ্ঠান বি আর পাওয়ারজেন লিমিটেডের মাদারগঞ্জ জামালপুর ১০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, ভারতের ভগবতী প্রোডাক্টস লিমিটেডের সোনাগাজী ফেনী ৩০ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র, দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক দাইহান গ্রিন এনার্জি কোম্পানি লিমিটেড ও হাই কোরিয়া কোম্পানি লিমিটেডের মালিকানাধীন ঈশ্বরদী পাবনা ৭০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, জুলস পাওয়ার লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মুক্তাগাছা সোলারটেক এনার্জি লিমিটেডের মালিকানাধীন মুক্তাগাছা ময়মনসিংহ ৫০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, এটিএন সলিউশনস লিমিটেড, উত্তর আয়ারল্যান্ডভিত্তিক এ জে পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড ও চীনভিত্তিক এএসকে নিউ এনার্জি কোম্পানি লিমিটেডের মালিকানাধীন ডিমলা নীলফামারী ৫০ মেগাওয়াট গ্রিড-টাইড সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, কেএআই বাংলাদেশ অ্যালুমিনিয়াম লিমিটেড ও আলটেক অ্যালুমিনিয়াম ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মালিকানাধীন কক্সবাজার ১০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, চীনের ফুজিয়ান ইয়ংফু পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশি এয়ার ওয়েভস প্রাইভেট লিমিটেড ও মনি ট্রেডার্স লিমিটেডের মালিকানাধীন লামা বান্দরবন ৭০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ওরিয়ন গ্রুপের দুই সহযোগী প্রতিষ্ঠান এনারগন রিনিউবেল লিমিটেড (বিডি) ও পিডব্লিউআর এনার্জি ট্রেডিং এলএলসি মালিকানাধীন গজারিয়া ১৩০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়ার কথা ছিল।

চীনা কোম্পানি গ্রিন প্রগ্রেস রিনিউয়েবল বি ভি এবং দেশীয় কোম্পানি আইআরবি অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের কনসোর্টিয়ামের মালিকানাধীন বোচাগঞ্জ-পীরগঞ্জ১০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, চীনের হাংজহু বয়লার কোম্পানি লিমিটেড ও দেশীয় ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের মালিকানাধীন ঘোড়াধাপ জামালপুর ১৮০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, দেশীয় প্রতিষ্ঠান সিদ্দিক ফেব্রিক্স লিমিটেড-ইনটেক এনার্জিস এবং সাউদিয়া জার্মান পাওয়ার প্লান্ট লিমিটেডের মালিকানাধীন ব্রাক্ষণবাড়িয়া ১১ মেগাওয়াট বর্জ্যবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, বেইজিং এনার্জি ও এনাম মেডিকলের যৌথ উদ্যোগে সোনাগাজী ১০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, ব্রিটিশ কোম্পানি রিনিউবেল এনার্জি ইউকে লিমিটেড, ভারতীয় আবাসন প্রতিষ্ঠান বাদল কনস্ট্রাকশন ও দেশীয় সোলার প্রতিষ্ঠান জি-টেক সলিউশন লিমিটেডের মালিকানাধীন বাসাইল টাঙ্গাইল ১০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, চীনের হায়ানার্জির পার্টনার প্রতিষ্ঠান সাসটেইনেবল এনার্জি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মালিকানাধীন আশাশুনি সাতক্ষীরা ১০০ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র, হংকংয়ের প্রতিষ্ঠান জেটি নিউ এনার্জি কোম্পানি লিমিটেডের মালিকানাধীন চকরিয়া ২২০ মেগাওয়াট বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান মাহিন এবং শ্রীলঙ্কাভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা বিদুল্লাঙ্কা পিএলসির মালিকানাধীন নোয়াখালী ১০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাংলাদেশের নিউটেক সোলার এনার্জি বিডি লিমিটেড এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ডি এইচ ইউরো হাইটেক কোং লিমিটেডের চকরিয়া ৩০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জুলস পাওয়ারের মালিকানাধীন কক্সবাজার সদর ৫০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন গত জুনে শুরু হওয়ার কথা ছিল।

এ ছাড়া জাপানের সুমিটোমো করপোরেশন এবং বাংলাদেশের পার্কার বাংলাদেশ লিমিটেডের মালিকানাধীন বড়পুকুরিয়া ২০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, দেশীয় প্রতিষ্ঠান কেএআই বাংলাদেশ অ্যালুমিনিয়াম লিমিটেড ও অলটেক অ্যালুমিনিয়াম ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মাছুয়াখালী কক্সবাজার ১০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, চীনা প্রতিষ্ঠান জিজি ক্লিন এনার্জি, দেশীয় ক্যাসিওপিয়া ফ্যাশন ও ক্যাসিওপিয়া অ্যাপারেলসের মালিকানাধীন গৌরীপুর ময়মনসিংহ ১০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, ডরিন কোম্পানির মংলা বাগেরহাট ১০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, প্যারাগন বাংলাদেশ, রায়জান এনার্জি (ইংল্যান্ড) এবং সেন্টার ফর রিনিউয়েবল এনার্জি সার্ভিসেস লিমিটেডের মালিকানাধীন নেত্রকোনা ৫০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিঙ্গাপুরভিত্তিক সানগ্রো রিনিউয়েবলস এনার্জি ইনভেস্টমেন্ট পিটিই লিমিটেড এবং থিয়া এনার্জি লিমিটেডের মালিকানাধীন গোয়লন্দ রাজবাড়ী ১০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র আগামী ডিসেম্বরে এবং সৌদি আরবের এসিডব্লিউএ পাওয়ার কোম্পানির মালিকানাধীন রামপাল ৩০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২৭ সালের জুনে উৎপাদনে আসার কথা ছিল।

জ্বালানি সংকটের কারণে সম্প্রতি দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। বিভিন্ন সময়ে দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে। সংকটকালীন সময়ে জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে প্রাপ্ত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ পরিমাণ ছিল ৬৫০ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর একটি অংশও যদি নির্ধারিত সময় অনুযায়ী উৎপাদনে আসত, তাহলে দিনের বেলায় বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই কমে আসত।

সূত্রমতে, দায়মুক্তি আইনের আওতায় অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পগুলো পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অনুমোদন বাতিল করা হয়। তৎকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট। প্রকল্পগুলোর এলওআই ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত ইস্যু করা হয়েছিল। এই ৩৬টি প্রকল্পের মধ্যে অন্তত ১৫টি কোম্পানি জমি কিনেছিল, সরকারি কর-ফি পরিশোধ করেছিল এবং বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কাজে অর্থও ব্যয় করেছিল।

বাতিল হওয়া প্রকল্পগুলোর পরিবর্তে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে ৫৫টি গ্রিড সংযুক্ত সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। প্রায় ৫ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে আহ্বান করা এ দরপত্রে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি। তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১১টি প্রকল্পের জন্য দরপত্র জমা পড়ে, যার সম্মিলিত সক্ষমতা ছিল প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন প্রকল্পে সভরেন গ্যারান্টি না থাকাই বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহের প্রধান কারণ ছিল। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে এ ধরনের গ্যারান্টি গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সভরেন গ্যারান্টি না দেওয়ায় নতুন দরপত্র নিয়ে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।

২০০৯-১০ সালে দেশে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট ও ব্যাপক লোডশেডিংয়ের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালে ‘দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ বা বহুল আলোচিত দায়মুক্তি আইন প্রণয়ন করে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, জ্বালানি আমদানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। আইনের আওতায় সরকার প্রচলিত সরকারি ক্রয় আইন ও উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সরাসরি আলোচনা বা বিশেষ পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্প অনুমোদন করতে পারত। পাশাপাশি আইনের একটি ধারায় এসব সিদ্ধান্ত আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগও সীমিত করা হয়েছিল। এ কারণেই আইনটি দায়মুক্তি আইন নামে পরিচিতি পায়।

বিভিন্ন সময়ে আইনটির আওতায় কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি আমদানি এবং বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। আওয়ামী সরকারের দাবি ছিল, এসব উদ্যোগের ফলে স্বল্প সময়ে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘ লোডশেডিং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

তবে শুরু থেকেই আইনটি নিয়ে বিতর্ক ছিল। অভিযোগ ছিল, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া প্রকল্প অনুমোদনের ফলে অনেক ক্ষেত্রে ব্যয় বেড়েছে এবং জবাবদিহি কমেছে। এ ছাড়া অলস বা আংশিক অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর হাইকোর্ট আইনটির দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা ৬(২) ও ৯ অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার ২৮ নভেম্বর অধ্যাদেশ জারি করে আইনটি বাতিল করে। তবে আইন বাতিলের আগে সম্পাদিত বিদ্যমান চুক্তিগুলো কার্যকর থাকবে বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়।

আইন বাতিলের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়মুক্তি আইনের আওতায় অনুমোদিত বিভিন্ন প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে পাইপলাইনে থাকা এই ৩৬টি জীবাশ্ম ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের এলওআই বাতিল করা হয়।

তবে বাতিল হওয়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়নে সম্প্রতি সুপারিশ জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, এসব প্রকল্পে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। বাতিলকৃত এসব সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন করার পাশাপাশি এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার তাগিদ দেয় সংস্থাটি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম কালবেলাকে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দায়মুক্তি আইন বাতিল করা হয়েছিল। তবে দায়মুক্তি আইনের কারণে সেগুলো বাতিলের কথা বলা হলেও মূলত সে আইন দ্বারাই এসব কেন্দ্রকে প্রোটেকশন দেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, এ কেন্দ্রগুলোর চুক্তিতে লুণ্ঠনমূলক ও অযৌক্তিক মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে আমি মনে করি, কেন্দ্রের মালিকদের সঙ্গে নেগোশিয়েশনে যাওয়া উচিত ছিল, ব্যয় কমানোর একটা সুযোগ দেওয়া যেতে পারত। যদিও প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ায় এটা করা এখন আর সম্ভব নয়। যেহেতু অনেকেই জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন খরচ করেছিল, তারা এখন সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারে।

সার্বিক প্রসঙ্গে বিপিডিবির আইপিপি সেলের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল হক কালবেলাকে বলেন, যেসব কেন্দ্রের সঙ্গে পিডিবির চুক্তি হয়নি, স্বাভাবিকভাবেই তারা উৎপাদনে আসতে পারবে না। তবে চুক্তির বাইরে যেসব কেন্দ্র অবকাঠামোগত কাজ শুরু করেছিল, সেগুলোর জন্য আমরা ওপেন টেন্ডার ডেকেছি, কিছু দরপত্র জমাও পড়েছে। এ ক্ষেত্রে দায়মুক্তি আইন বাধা সৃষ্টি করবে না।