Image description
ঢেলে সাজনো হচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স

চলাচলের অনুমতি থাকা বিভিন্ন রুটে যাত্রী চাহিদা থাকলেও উড়োজাহাজের অভাবে ফ্লাইট চালাতে পারছে না বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বর্তমান বহরে থাকা কোনো উড়োজাহাজ ত্রুটিতে পড়লে প্রভাব পড়ছে নিয়মিত ফ্লাইট শিডিউলে। তবে এবার রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এ এয়ারলাইন্সে বহর বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

এরই মধ্যে মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা সংস্থা বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হলেও ফের বোয়িং থেকে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার নতুন চুক্তি হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, ইউরোপভিত্তিক উড়োজাহাজ নির্মাতা সংস্থা এয়ারবাস থেকে কেনা হচ্ছে ১০টি এয়ারক্র্যাফট। সংশ্লিষ্ট সূত্রে মিলেছে এসব তথ্য।

সূত্রগুলো বলছে, বোয়িংয়ের সঙ্গে নতুন করে ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হতে পারে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে। আগামী ২১ সেপ্টেম্বর ওই অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এরপর আগামী অক্টোবর মাসে ১০টি উড়োজাহাজ কিনতে এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয় ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সূত্র বলছে, বর্তমানে বিমানের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। গত এপ্রিলে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করা হয়। নতুন করে বোয়িংয়ের ১১টি ও এয়ারবাস থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কিনলে কয়েক বছরে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির বহরে উড়োজাহাজ হবে ৫৪টি। বোয়িং ও এয়ারবাসের সঙ্গে নতুন দুটি চুক্তি সম্পন্ন হলে বিমানের ইতিহাসে এটিই হতে পারে সবচেয়ে বড় বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ।

এর আগে গত এপ্রিল মাসে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকায় ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। চুক্তি অনুযায়ী, আটটি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স উড়োজাহাজ রয়েছে। এসব উড়োজাহাজ ২০৩১ সালের নভেম্বর থেকে সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে, যা শেষ হবে ২০৩৫ সালের অক্টোবরে। তবে নতুন করে ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজের মডেল, দাম, অর্থায়ন ও সরবরাহের সময়সূচি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।

অবশ্য এয়ারবাসের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সম্ভাব্য চুক্তিতে এয়ারবাসের চারটি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি উড়োজাহাজ এবং ছয়টি এ৩২১নিও ন্যারোবডি উড়োজাহাজ রয়েছে।

নতুন এ দুটি সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে বিমান বা সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট করে ঘোষণা না এলেও গত ৩১ আগস্ট ময়মনসিংহে এক অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেছিলেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও জার্মানি থেকে উড়োজাহাজ কেনা হবে।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক। সূত্র জানায়, ওই সাক্ষাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আধুনিকায়নে এয়ারবাস ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে বিমানের বহরে উড়োজাহাজ যুক্ত করতে পদক্ষেপ নেওয়া কথা জানানো হয় হাইকমিশনারকে।

অবশ্য বোয়িং থেকে আরও উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে গত ৩০ আগস্ট। ওইদিন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘আরেকটি অসাধারণ চুক্তি’ করেছেন। তাতে তিনি বলেন, বাংলাদেশ অতিরিক্ত বোয়িং উড়োজাহাজ কিনতে ‘বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার’ ব্যয় করবে এবং প্রাথমিক ক্রয়াদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে। পরে ট্রাম্প ওই ঘোষণা পুনঃপ্রচার করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি দিয়ে উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।

সার্জিও গোরের এক্স পোস্ট ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লেখা মার্কিন প্রেসিডেন্টের চিঠির পর গত ১ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছিলেন, বিমান খাতের প্রয়োজন বিবেচনা করেই বহর সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

গত ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে হুমায়ুন কবির বলেন, নতুন রুট চালু এবং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে বাংলাদেশের উড়োজাহাজের বহর বাড়ানো প্রয়োজন। বোয়িং কিংবা এয়ারবাস—যে কোনো কোম্পানি থেকে উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যবসায়িক বিষয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে এয়ারবাস কেনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত মাসেই এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করার প্রস্তুতি ছিল বিমানের। ওই সময়ে তা না হলেও এ চুক্তি অক্টোবরের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সূত্রটি বলছে, এয়ারবাস তুলনামূলক কম দামে উড়োজাহাজ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তা ছাড়া চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই এয়ারবাস উড়োজাহাজ সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু করার কথাও জানিয়েছে বিমানকে। চুক্তির অর্থের অন্তত ৮৫ শতাংশ যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের ঋণে হওয়ার কথা রয়েছে। এয়ারবাস উড়োজাহাজ সরবরাহের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল (এমআরও), পাইলট ও কেবিন ক্রু প্রশিক্ষণ, বহর পরিকল্পনা এবং কেবিন নকশার সুবিধাও দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।

হাইরিস্ক কার্গো স্ট্যাটাস প্রত্যাহার চায় বাংলাদেশ: ২০১৭ সালে নিরাপত্তা ঘাটতির অজুহাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের আকাশ পথে বিভিন্ন রপ্তানি চালানের ওপর হাইরিস্ক কার্গো অ্যান্ড মেইল (এইচআরসিএম) নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের দেশগুলোতে সরাসরি কার্গো বা পণ্যবাহী উড়োজাহাজ পাঠানোর ক্ষেত্রে বাড়তি নিরাপত্তা স্ক্রিনিং ও কঠোর নজরদারির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, যা বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে ধীর ও ব্যয়বহুল করে তুলেছে। যদিও দেশের এয়ারপোর্টগুলোতে নিরাপত্তা কার্যক্রম বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হচ্ছিল। সর্বশেষ গতকাল বিমানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে ফের এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেই এইচআরসিএম স্ট্যাটাস প্রত্যাহারে উদ্যোগ নিয়েছে। বিমানবন্দরে প্রয়োজন অনুযায়ী এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া অডিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর সন্তোষজনক রেটিং অর্জন করেছে। তাই সরকার চায়, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ওই স্ট্যাটাস প্রত্যাহারে উদ্যোগ গ্রহণ করুক।