Image description

কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গতকাল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন রফিকুল ইসলাম (৫৪) নামের এক বন্দি। দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সকাল ৯টা ২৫ মিনিটের দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। রফিকুল ইসলামের মতো অনেক রোগী দেশের বিভিন্ন কারাগারে অসুস্থ হন। কিন্তু কারাগারে চিকিৎসক না থাকার কারণে প্রাথমিক চিকিৎসা, হাসপাতালের সমস্ত নিয়ম-কানুন মেনে রোগীকে যানজটের শহরের হাসপাতালে নিয়ে আসতে আসতে অনেক বন্দি সড়কেই মৃত্যুবরণ করেন। দেশের কারাগারগুলোতে চিকিৎসাব্যবস্থা ও জনবলের তীব্র সংকটে চরম মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। গত ৫ বছরে ১৭৩৬ জন বন্দি কারা হেফাজতে মারা গিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারা হাসপাতালগুলোর বেহাল দশার কারণে বন্দিদের মৌলিক মানবাধিকার চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বন্দি হলেও তাদের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

দেশের কারাগারগুলোতে যে পরিমাণ বন্দির ধারণক্ষমতা রয়েছে তার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি বন্দি রাখা হয়েছে। বলতে গেলে কারাগারগুলো বন্দিতে গিজগিজ করছে। দ্বিগুণের বেশি হওয়ায় ঘুম, খাওয়া, ওয়াশরুমসহ নানা সমস্যায় পড়তে হয় বন্দিদের। এরমধ্যে কারাগারগুলোতে চিকিৎসা ব্যবস্থা নাজেহাল। দেশের ৭৫টি কারাগারের বন্দি ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার। কিন্তু বর্তমানে বন্দি আছেন এক লাখের বেশি।

৭ই সেপ্টেম্বর ঢামেকে আলী আকবর মণ্ডল (৬৭) নামের এক বন্দি মারা যান। তিনি কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন। এর আগের দিন সকাল ৭টা ২৫ মিনিট থেকে ৯টা ৫ মিনিটের মধ্যে ঢামেকে তিনজন কারাবন্দির মৃত্যু হয়। তাদেরও কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তারা হলেন— আবুল বাশার (৫৮), আবদুল কাইয়ম (৬২) ও মো. শাহাদত হোসেন লিটন (৫২)। অধিকাংশ বন্দি কারাগারে অসুস্থ হন। কিন্তু সেখানে চিকিৎসা না পেয়ে তাদেরকে প্রশাসনিক অনুমোদন নিয়ে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। অনেক সময় যাতায়াতের জন্য এম্বুলেন্সও পাওয়া যায় না। অন্য যানবাহন দিয়ে হাসপাতালে নিতে হয়। 

কারা সূত্রগুলো জানিয়েছে, অধিদপ্তরে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ১৫১টি। অথচ বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র দু’জন চিকিৎসক। তাদের একজন মানিকগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং অন্যজন রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছেন। এই দুই কারাগার ছাড়া বাকি কারাগারগুলোতে অধিদপ্তরের নিজস্ব কোনো চিকিৎসক নাই। শুধুমাত্র দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল থেকে ৮৭ জন চিকিৎসক প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা করে বন্দিদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকেন। কিন্তু এসব চিকিৎসক বিশেষজ্ঞ না হওয়াতে অনেক বন্দি জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে সুচিকিৎসা পাচ্ছেন না। 

সরকারি হাসপাতাল থেকে যেসব চিকিৎসক যান তারা শুধু বন্দিদের প্রাথমিক চিকিৎসা করে থাকেন। অথচ অনেক বন্দি যক্ষ্মা, টাইফয়েড, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও হৃদরোগসহ আরও অনেক জটিল রোগে আক্রান্ত। হৃদরোগের বন্দিরা বেশি ঝুঁকিতে পড়েন। তাদের অনেককে হাসপাতালে নেয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেন। অন্যদিকে কারাগারে ল্যাব টেকনিশিয়ানের অনুমোদিত ১৩টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত মাত্র পাঁচজন। ডিপ্লোমা নার্সের ১০১টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে রয়েছেন ৩১ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ নার্স মাত্র দু’জন। ফার্মাসিস্টের ৭৬টি অনুমোদিত পদের মধ্যে এখনো ৯টি শূন্য।

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগারে মোট এক হাজার ৭৩৬ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫৫ জন নারী এবং এক হাজার ৬৮১ জন পুরুষ। এ সময়ে ৬৪৬ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে নেয়ার পথে। চলতি বছরের ১৮ই আগস্ট পর্যন্ত ১২২ জন বন্দি কারা হেফাজতে মারা গেছেন। ২০২৫ সালে কারা মৃত্যু হয় ১৮৭ জনের। তাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩৬ জন। নারী ৮ জন। নিহতদের মধ্যে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান ৫১ জন কারাবন্দি। ২০২৪ সালে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ৩১৮ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮৯ জন। এদের মধ্যে নারী ১০ জন।

অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান ১২৯ জন। ২০২৩ সালে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ৩৭৫ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন ২৩২ জন। তাদের মধ্যে পাঁচজন নারী। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান ১৪৩ জন। ২০২২ সালে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ২২৩ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কারাবন্দি নিহত হয়েছেন ১৩৯ জন। এ ছাড়া ওই বছর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান ৮৪ জন। ২০২১ সালে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ৩০০ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন ২০৫ জন। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান ৮৯ জন।

কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের প্রতিটি কারাগারে হাসপাতাল থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। মাত্র ২৩টিতে এম্বুলেন্স রয়েছে। ৫৩টি কারাগারে এম্বুলেন্স নেই। তাই অসুস্থ বন্দিদের অনেক ক্ষেত্রেই বিকল্প ব্যবস্থায় হাসপাতালে নিতে হয়।

গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বিশেষায়িত কারা হাসপাতালের জন্য প্রায় ১৪ বছর আগে কেনা হয় এক্স-রে মেশিন, অপারেশন থিয়েটারের যন্ত্রপাতি, এন্ডোস্কোপি, ইসিজি মেশিনসহ অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ না হওয়ায় কাশিমপুর বিশেষায়িত হাসপাতালটি চালু করা যায়নি। এতে এই হাসপাতালসহ কয়েকটি কারা হাসপাতালের জন্য প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা অধিকাংশ চিকিৎসা সরঞ্জাম বছরের পর বছর বাক্সবন্দি হয়ে থেকে কার্যত নষ্ট হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, টেকনোলজিস্ট ও প্রশিক্ষিত জনবল না থাকায় কাশিমপুর কারা হাসপাতালটি চালু করা যায়নি। চট্টগ্রাম, কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার ও খুলনা কারাগারের জন্যও এক্স-রে মেশিন, অপারেশন থিয়েটারের যন্ত্রপাতির সেট, ইসিজি মেশিন, এন্ডোস্কোপি মেশিনসহ প্রায় ৩ কোটি টাকার বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ দেড় দশকেও সেগুলো চালু করা সম্ভব হয়নি। অধিকাংশ যন্ত্রপাতি এখন ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। খুলনায় কারা হাসপাতালের জন্য ১ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়। কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ৬১ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়। কিন্তু জনবলের অভাবে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

কারা অধিদপ্তরের মুখপাত্র জেলার মাসুদ হাসান মানবজমিনকে বলেন, কারাগারে প্রতিদিনই বন্দিরা মারা যাচ্ছেন নানা রোগে। চিকিৎসকসহ অন্যান্য জনবলের ঘাটতি রয়েছে কারা হাসপাতালগুলোতে। এম্বুলেন্স সমস্যাও রয়েছে। সেগুলো নিয়ে অধিদপ্তর কাজ করছে।