একটি এলএ কেস। ১৪ একর ২৬ দশমিক ৩৮ শতক জমির প্রস্তাব। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ একর জমি পরে বাদ। আর তাতেই সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ ব্যয় কমেছে ১১০ কোটি টাকা। নরসিংদীর সাসেক ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রকল্পের একটি ভূমি অধিগ্রহণ মামলার (এলএ কেস) নথি পর্যালোচনায় জমির প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ, অ্যালাইনমেন্ট এবং স্থাপনার পরিমাপ নিয়ে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যুগান্তরের অনুসন্ধানে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রস্তাবিত জমির মধ্যে আগে অধিগ্রহণ করা জমি, শিল্পকারখানা এবং সরকারি জমিও অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) প্রাথমিক প্রস্তাবে জমির পরিমাণ ছিল ১৪ একর ২৬ দশমিক ৩৮ শতক। তদন্তের পর তা কমে ১১ একর ১৩ দশমিক ৪৬ শতক হয়। পরবর্তী যাচাই ও অ্যালাইনমেন্ট সংশোধনের পর চূড়ান্তভাবে অধিগ্রহণে রাখা হয় ৯ একর ৮৫ দশমিক ১৫ শতক। ফলে শুরুতে প্রস্তাব করা জমির প্রায় সাড়ে ৪ একর বাদ পড়ে। নথি অনুযায়ী, এতে অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকারের ১১০ কোটি ৩৯ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৪ টাকা ব্যয়ের সম্ভাবনা কমেছে। একটি এলএ কেস থেকেই এমন চিত্র বেরিয়ে আসে। এ রকম ৮টি এলএ কেস রয়েছে নরসিংদী অংশে। অধিগ্রহণের নামে এই টাকাই মূলত ভাগবাঁটোয়ারার নীলনকশা করে জমি অধিগ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
এই প্রক্রিয়ায় ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা পুনঃপরীক্ষা ও অপ্রয়োজনীয় জমি বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন নরসিংদীর তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগম। তাকে বদলি করে সরিয়ে দেওয়ার জন্য একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। একপর্যায়ে জেলার একজন ভিআইপির টেলিফোনের পর তাকে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বাদ প্রায় সাড়ে ৪ একর : এলএ কেস ০৯/২১-২২-এর জন্য সওজ প্রথমে ১৪ একর ২৬ দশমিক ৩৮ শতক জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব দেয়। পরে জমির প্রয়োজনীয়তা ও যৌথ তদন্তের ফিল্ডবহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে (রাজস্ব) আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তের পর ৩ একর ১২ দশমিক ৯২ শতক জমি বাদ পড়ে। জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ একর ১৩ দশমিক ৪৬ শতক। পরবর্তী যাচাইয়ে আরও কমে চূড়ান্ত অধিগ্রহণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ একর ৮৫ দশমিক ১৫ একর। অর্থাৎ প্রাথমিক প্রস্তাবের সঙ্গে চূড়ান্ত প্রয়োজনীয়তার পার্থক্য প্রায় সাড়ে ৪ একর।
কারারদি মৌজার নথিতে গুগল আর্থে তৈরি খসড়া অ্যালাইনমেন্ট নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। দেখা যায়, কোথাও রাস্তার প্রস্থ ১৬০ ফুট, কোথাও ১৮০ ফুট পর্যন্ত দেখানোর তথ্য রয়েছে। এসব এলাকার মধ্যে সিএনজি স্টেশন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, দোকানপাট ও বহুতল ভবন রয়েছে। তদন্তে দেখা যায়, এসব স্থাপনার অনেকগুলো সওজের আগে অধিগ্রহণ করা জমির অ্যালাইনমেন্ট থেকে প্রায় ১০ ফুটের মধ্যে রয়েছে। এ কারণে আগে অধিগ্রহণ করা জায়গা ব্যবহার করে রাস্তার উন্নয়ন করা সম্ভব কি না, তা পুনরায় যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। এরপর গত ৭ জানুয়ারির তদন্ত প্রতিবেদনে অপ্রয়োজনীয় জমি বাদ দিয়ে সওজের আগে অধিগ্রহণ করা জায়গায় রাস্তার উন্নয়নের সুপারিশ করা হয়।
সরকারি জমি ও লিজগ্রহীতার নাম : তদন্তে আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিসিক শিল্পনগরীর সরকারি জমি ও অবকাঠামো বিসিকের নামে ফিল্ডবহিতে অন্তর্ভুক্ত না করে সংশ্লিষ্ট লিজগ্রহীতা শিল্পমালিকদের নামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ অভিযোগের গুরুত্ব রয়েছে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে। সরকারি জমি ও অবকাঠামোর মালিকানা সঠিকভাবে উল্লেখ না হলে পরবর্তী সময়ে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দাবিকে ঘিরে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই এসব জমির মালিকানা, লিজের ধরন এবং স্থাপনার প্রকৃত মালিকানা যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে-সরকারি জমি ও স্থাপনার পরিচয় ফিল্ডবহিতে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে তা যাচাই করা হয়েছিল কি না।
স্থাপনার পরিমাপ নিয়েও প্রশ্ন : জমির পাশাপাশি স্থাপনার পরিমাপ নিয়েও অভিযোগ পাওয়া গেছে। দক্ষিণ নোয়াদিয়া, ব্রাহ্মণদী, লামপুর, শাষপুর, কুমড়াদি, মুনসেফচর ও কামারগাঁওসহ কয়েকটি মৌজায় বিভিন্ন অবকাঠামোর পরিমাপ যৌথ তদন্তের ফিল্ডবহিতে বাস্তবতার তুলনায় বেশি দেখানো হয়েছে বলে তদন্তে অভিযোগ উঠে এসেছে। স্থাপনার আয়তন ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পরিমাপের ক্ষেত্রে ভুল বা অসংগতি থাকলে ক্ষতিপূরণের হিসাবেও তার প্রভাব পড়তে পারে। এলএ কেসটিতে পরবর্তী যাচাইয়ে বিপুল পরিমাণ জমি বাদ পড়া এবং ১১০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা সম্ভাব্য ব্যয় কমে যাওয়ার তথ্যটি এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ।
মাহমুদার বদলি রহস্য : জমির প্রয়োজনীয়তা পুনঃপরীক্ষা ও অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহমুদা বেগমের ভূমিকা ছিল বলে নথিতে প্রতীয়মান হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এ সময় তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে একাধিকবার বদলির উদ্যোগ নেওয়া হয়। মোট চার দফা তাকে বদলির চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে জেলার একজন ভিআইপির টেলিফোনের পর তাকে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
এখন বড় প্রশ্ন : এলএ কেস ০৯/২১-২২-এর নথি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। প্রথমত, ১৪ একর ২৬ দশমিক ৩৮ শতক জমির প্রাথমিক প্রয়োজন কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল? দ্বিতীয়ত, আগে অধিগ্রহণ করা জমি, সরকারি জমি ও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জমি প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণ কী? তৃতীয়ত, জমি ও স্থাপনার পরিমাপ প্রথম পর্যায়েই যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-প্রাথমিক প্রস্তাব থেকে চূড়ান্ত অধিগ্রহণের পরিমাণ থেকে সাড়ে ৪ একর জমি বাদ পড়ার বিষয়টি কম নয়। এই পরিবর্তনের ফলে ১১০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ ব্যয় কমেছে।
তাই শুধু এই একটি এলএ কেস নয়, একই প্রকল্পের অন্য অধিগ্রহণ মামলাগুলোতেও প্রাথমিক প্রস্তাব, গুগল আর্থের অ্যালাইনমেন্ট, মাঠপর্যায়ের পরিমাপ এবং চূড়ান্ত অধিগ্রহণের পরিমাণ পাশাপাশি রেখে যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হতে পারে। আর মাহমুদা বেগমকে বদলির অভিযোগের সঙ্গে এসব সিদ্ধান্তের কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, থাকলে কার স্বার্থে-সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
জানতে চাইলে নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান কেয়া বলেন, আসলে আমি যোগদান করার পর থেকেই যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়সহ একাধিক তদন্ত চলছে। ভূমি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে দীর্ঘ প্রতিবেদন দিয়েছে শুনেছি কিন্তু এখনো অফিশিয়ালি কিছুই জানি না। চলমান অধিগ্রহণের কাজ শেষ করতেও বিষয়টি জানা দরকার। তবে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি তদন্ত কমিটি উত্থাপন করেছে তার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। উত্থাপিত অভিযোগগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে। সরকারি টাকা অপচয়ের কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। একই জমি পুনরায় অধিগ্রহণের আওতায় নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।