চার হাজার দুইশর বেশি ইউনিয়ন পরিষদকে (ইউপি) নির্বাচন উপযোগী হিসাবে চিহ্নিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এগুলোতে ছয় থেকে সাত ধাপে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। প্রথম ধাপের ভোট হতে পারে নভেম্বরের মাঝামাঝি। তফসিল ঘোষণা হতে পারে অক্টোবরে। এই ধাপে পাঁচ থেকে সাতশ ইউপিতে ভোট করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। আগামী বছরের মে মাসের মধ্যে নির্বাচন উপযোগী সব ইউপির ভোট শেষ করতে চায় কমিশন। এসব পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে শিগগিরই শিক্ষাসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও বিভাগের সঙ্গে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বসতে যাচ্ছে ইসি। রোববার বিকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কার্যালয়ে নির্বাচন কমিশনারের রুদ্ধদ্বার অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে এসব আলোচনা হয়। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি কমিশন। আজ আবারও নির্বাচন কমিশনারদের অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ইসির নির্ভরযোগ্য সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রথম ধাপের ইউপি নির্বাচনের ভোট মধ্য নভেম্বরে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ করতে বেশকিছু পরিকল্পনা রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। শিগগিরই বিষয়গুলো জানানো হবে।’
ইসি সূত্রে আরও জানা যায়, প্রথম ধাপের নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইনের সংশোধন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে ওই সংশোধনী বিল আকারে উত্থাপন করেনি সরকার। কমিশন মনে করছে, প্রথম ধাপের তফসিল ঘোষণার আগে জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসছে না। ফলে শিগগিরই এ আইনের সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাশ হচ্ছে না। অপরদিকে সংসদ কার্যকর এবং শক্তিশালী বিরোধী দল মাঠে থাকায় রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে অধ্যাদেশ আকারে এ সংশোধনী সরকার পাশ করবে কিনা-তা নিয়েও সন্দিহান কমিশন। এই অবস্থায় প্রথম ধাপের নির্বাচনের আগে ইসির প্রস্তাবিত আইনের সংশোধনী পাশ করা না হলে সরকারকে চিঠি দেওয়ার চিন্তা করছে কমিশন। ওই চিঠিতে বাকি ধাপের ভোট শেষ হওয়ার আগে সংশোধনী পাশ না করার অনুরোধ করা হতে পারে। রোববার নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে এ বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনাও হয়েছে।
ইসির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘আইনের সংশোধনী পাশ না হলে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সার্বক্ষণিক শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার আইনগত সুযোগ নেই। কারণ হিসাবে তারা বলেন, স্থানীয় সরকার আইনগুলোতে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা কর্মকর্তা/কর্মচারীর পদকে লাভজনক পদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালার অনুচ্ছেদ ১১.১৭(ক) ও (খ) এর মতে, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক-কর্মচারী একই সঙ্গে একাধিক পদে বা চাকরিতে বা আর্থিক লাভজনক কোনো পদে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। লাভজনক পদ বলতে যেসব পদকে বোঝানো হয়েছে সেসব পদে স্থানীয় সরকারের কোনো পদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এছাড়া রিট পিটিশন নং ৬৩৬৬/২০০৯-এর মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ পৌরসভার মেয়র পদকে লাভজনক পদ হিসাবে ব্যাখ্যা করেনি। এমনকি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক স্থানীয় সরকারের অন্যান্য পদকে লাভজনক পদ হিসাবে ব্যাখ্যা করা এখতিয়ারবহির্ভূত হিসাবে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।’
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘আমরা সব নির্বাচনের জন্য একই আইন চাই। এক নির্বাচনে এক ধরনের আইন, আরেক নির্বাচনে অন্য ধরনের আইন প্রণয়ন করা হলে বৈষম্য তৈরি হবে। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্নের সৃষ্টি হবে।’
জানা গেছে, নির্বাচন কর্মকর্তা ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তথ্য যাচাই করে ইউনিয়ন পরিষদের তালিকা তৈরি করেছে ইসি সচিবালয়। দেশের চার হাজার ৫৮০টির মধ্যে চার হাজার দুইশর বেশি ইউপি নির্বাচন উপযোগী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে ভোট আয়োজনের উপযোগী ইউপির সংখ্যা তিন হাজার নয়শর বেশি। প্রায় পাঁচশ ইউনিয়ন পরিষদের ভোট করার মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। এবার কমিশন এক উপজেলার নির্বাচন উপযোগী সবকটি ইউপিতে একইদিনে ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা করছে। প্রথম ধাপে পাঁচ থেকে সাতশ ও দ্বিতীয় ধাপে নয়শ থেকে এক হাজার ইউপিতে ভোটগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা চলছে। শেষের দিকের ধাপগুলোতে তুলনামূলক কম সংখ্যক ইউপি রাখা হচ্ছে।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা, রোজা, পাবলিক পরীক্ষা, বৃষ্টি মৌসুম-এসব দিক বিবেচনায় রেখে কোন ধাপের ভোট কখন হবে, তা নির্ধারণে আমরা আলোচনা-পর্যালোচনা করছি। ভৌগোলিক অবস্থান ও যাতায়াত ব্যবস্থা বিবেচনায় কোন ইউপি কোন ধাপে পড়বে তা নির্ধারণ করা হচ্ছে।’
ইসি সূত্রে আরও জানা গেছে, ভোটের ধাপ নির্ধারণের আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে শিগগিরই বৈঠকে বসতে চায় ইসি। আন্তঃমন্ত্রণালয় ওই বৈঠকে ইসির সম্ভাব্য নির্বাচনি ধাপ ও পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি তাদের মতামতও নেওয়া হবে।
এদিকে এই নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় একই দলের একাধিক নেতাকর্মী প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে অন্তর্কোন্দল হওয়ার প্রকট সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যেও সহিংসতার শঙ্কা রয়েছে। এসব বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে একই জেলার সবকটি উপজেলায় একই ধাপে ভোটগ্রহণ হবে না। একেক ধাপে একটি জেলার এক বা একাধিক উপজেলার ভোট হতে পারে। তবে ৬৪ জেলায় একই ধাপে ভোট হবে না। কারণ হিসাবে কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছে ইসি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে রিজার্ভ ফোর্স থাকবে তাদের নির্বাচনি এলাকায় মোতায়েনের সুবিধার্থে এক জেলার এক বা দুই উপজেলায় একই ধাপে ভোটগ্রহণের চিন্তা করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে বুধবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকে বসছে কমিশন।
ভোটকেন্দ্রের সিসি ক্যামেরা জটিলতা : ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। রোববার অনলাইনে নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। সভায় মাঠপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়ে ডিসি ও ইউএনওরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সিসি ক্যামেরা বসিয়েছিলেন। কোথাও কোথাও ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমেও এ কাজ করানো হয়। কোথাও ভাড়ায় সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়। নির্বাচনের পর বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের সিসি ক্যামেরা খুলে ফেলা হয়েছে। বৈঠকে ডিসি ও ইউএনওদের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সিসি ক্যামেরার তথ্য সংগ্রহের পরামর্শ দেন ওই কর্মকর্তারা।