ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তফসিল এখনো ঘোষণা হয়নি। এর মধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলার গ্রামগঞ্জে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও মেম্বার (সদস্য) প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে।
গণসংযোগ, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, উঠান বৈঠক এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে নিজেদের প্রার্থিতার জানান দিচ্ছেন তাঁরা। সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখা যাচ্ছে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে; পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন, ইসলামী ফ্রন্ট, সিপিবিসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও মাঠ গোছাচ্ছেন। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
চট্টগ্রামের ১৯৪টি ইউনিয়নেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা চলছে। বিভিন্ন ইউনিয়নে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী ফ্রন্টসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয়।
ফটিকছড়ি ও ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ধর্মপুর ইউনিয়নে অন্তত ১৫ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বিএনপি নেতা এস এম ইউসুফ, মো. হাশেম, জামায়াত নেতা জাফর আলম ও ইসলামী ফ্রন্টের এ কে এম বখতিয়ার রয়েছেন। নারায়ণহাট ইউনিয়নে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত পাঁচজন প্রার্থী আলোচনায় রয়েছেন। বোয়ালখালী উপজেলার ৯টি ইউনিয়নেও চেয়ারম্যান পদে আগ্রহী শতাধিক ব্যক্তি মাঠে রয়েছেন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভা নির্বাচনে তাঁদের দলের একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন। সবার সঙ্গে বসে একক প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। কেন্দ্র থেকে যেভাবে নির্দেশনা আসবে, সেভাবেই তাঁরা কাজ করবেন।
দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আজিজুল হক চেয়ারম্যান বলেন, দলীয়ভাবে একক প্রার্থী দেওয়া হবে। কেউ দলীয় সিদ্ধান্ত না মানলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বোয়ালখালী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. খোরশেদ আলম জানিয়েছেন, প্রতিটি ইউনিয়নে জামায়াতের প্রার্থী দেওয়া হবে।
রাজশাহীর ইউনিয়নগুলোতে বিএনপির একাধিক নেতা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাগমারার গনিপুর ইউনিয়নে অন্তত ছয়জন নেতা আগ্রহী। একই উপজেলার গোয়ালকান্দি ইউনিয়নেও অন্তত ছয়জন প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্থানীয় নেতাদের ভাষ্য, দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ সামলানো বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেন, সমন্বয়ের মাধ্যমে একজন প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। তিনি জানান, সিটি করপোরেশনের মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার পদেও একজন
করে প্রার্থী দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মণ্ডল বলেন, সব পৌরসভা ও ইউনিয়নে মেয়র-চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে।
বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ৩৫২টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এর মধ্যে ১৭৩টির পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এসব ইউনিয়নে প্রথম ধাপেই নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। বিভাগের ইউনিয়নগুলোতে চার হাজারের বেশি সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী মাঠে রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী মোখলেছুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ভোট দিতে না পারায় সাধারণ মানুষ এবার ভোটের অপেক্ষায় রয়েছেন। বরিশালের বাকেরগঞ্জ, মুলাদী ও উজিরপুরের ১৯টি ইউপিতে এরই মধ্যে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে নাগরিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
বরিশাল বিভাগে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী এবং তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে একক প্রার্থী মনোনীত করা হবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল (বরিশাল বিভাগের দায়িত্ব) অ্যাডভোকেট মুয়াজ্জেম হোসেন হেলাল বলেন, বরিশাল বিভাগের ইউনিয়নগুলোতে জামায়াতের চেয়ারম্যান প্রার্থীরা মাঠে কাজ করছেন।
সিলেটের ১৩ উপজেলায় ১০৬টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এসব ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীর সংখ্যা গড়ে ছয় থেকে সাতজন। ওসমানীনগরের গোয়ালাবাজার ইউনিয়নে ১০ জন এবং সাদিপুর ইউনিয়নে আটজন প্রার্থী তৎপর রয়েছেন। জকিগঞ্জের ৯টি ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী অর্ধশত। বিএনপির প্রার্থীরাই সংখ্যায় বেশি। তবে জামায়াত, এনসিপি, জাতীয় পার্টিসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও মাঠে রয়েছেন।
সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে একজনকে দলীয় সমর্থন দেওয়া হবে। একাধিক প্রার্থী হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রংপুরের বিভিন্ন উপজেলায়ও তফসিলের আগেই নির্বাচনী আমেজ তৈরি হয়েছে। চায়ের দোকান, হাটবাজার, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সম্ভাব্য প্রার্থীদের উপস্থিতি বাড়ছে। রংপুর আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস জানিয়েছে, এবার ৫৮টি উপজেলার ৫৩৫টি ইউনিয়নে নির্বাচন হবে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ গণসংযোগ করছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছেন। ভোটাররা অবশ্য আগের প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে এলাকায় যাঁরা কাজ করেছেন এবং বিপদে পাশে ছিলেন, তাঁদের গুরুত্ব দিতে চান।
ময়মনসিংহের নান্দাইল, ঈশ্বরগঞ্জ ও গৌরীপুরেও একই চিত্র। নান্দাইলের ১৩টি ইউনিয়নে শতাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে নেমেছেন। তরুণ প্রার্থীদের তৎপরতা বিশেষভাবে চোখে পড়ছে। নান্দাইলের চণ্ডীপাশা ইউনিয়নের যুবদল নেতা শাকিল মাহমুদ বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও এলাকার উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে তিনি মাঠে আছেন।
খুলনার ৯টি উপজেলার ৬৮টি ইউনিয়নে সহস্রাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী তৎপর রয়েছেন। বিএনপির একাধিক প্রার্থীর পাশাপাশি জামায়াত ও সিপিবির সম্ভাব্য প্রার্থীরাও মাঠে আছেন। যাঁর যাঁর এলাকার ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন তাঁরা। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।
খুলনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. মনিরুজ্জামান মন্টু বলেন, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হলেও সবচেয়ে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে সমর্থন দেওয়া হবে।
নারায়ণগঞ্জের ৩৯টি ইউনিয়নেও গণসংযোগ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার, সোনারগাঁও, বন্দর ও নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় তৎপরতা বেশি। নির্বাচন কমিশন আগামী নভেম্বর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন খবরে আগ্রহ আরো বেড়েছে।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে একটি পৌরসভা ও আটটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত উপজেলায় শতাধিক সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও মেয়র প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। তাঁদের বড় অংশ বিএনপির সমর্থক। প্রবাসী সম্ভাব্য প্রার্থীরাও দেশে এসে মতবিনিময় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুল খয়ের বলেন, তফসিল ঘোষণার পর প্রার্থীদের অবশ্যই নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলতে হবে। আচরণবিধি লঙ্ঘন হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তফসিল ঘোষণার আগেই বিভিন্ন জেলার ইউনিয়নগুলোতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের এমন তৎপরতায় নির্বাচনী আলোচনা জমে উঠেছে। তবে শেষ পর্যন্ত কারা প্রার্থী হবেন এবং দলীয় সমর্থন কার ভাগ্যে জুটবে, তা নির্ধারণ হবে তফসিল ঘোষণার পর। ফলে প্রার্থীদের আগাম তৎপরতার পাশাপাশি দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সমীকরণও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।