আগের চেয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থীরা আরো বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন বিসিএসে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যই যেন বিসিএসে উত্তীর্ণ হওয়া। এ জন্য অনেক শিক্ষার্থী পড়ালেখা শেষ হওয়ার আগে থেকে বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লাইব্রেরি এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের অধিকাংশের আগ্রহ প্রবল হলেও বিসিএস অনেকটাই ‘সোনার হরিণ’। অন্যদিকে কয়েক বছর ধরে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় ও তিনটি জেলার শিক্ষার্থীদের কাছে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে বিসিএস।
গত দুটি বিসিএসের চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আওয়ামী আমলের বিসিএসে বেশ কয়েকটি জেলা বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও ঢাকা জেলার প্রার্থীরা সর্বাধিক এগিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীরা এগিয়ে। উল্টো চিত্র মেয়েদের ক্ষেত্রে।
একাডেমিক পরীক্ষায় মেয়েরা ভালো করলেও বিসিএসে ছেলেদের চেয়ে পিছিয়ে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি দীর্ঘ ১৫-১৬ বছর বিসিএসের ভাইভা নিয়েছি। সেখানে দেখেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভালো করছে। আর বুয়েটে তো ভালো শিক্ষার্থীরাই ভর্তি হয়। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ও একই মানের।
তবে বিজ্ঞানের বা কৃষির শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা রিটেনে ভালো মার্ক পাওয়ায় এগিয়ে যায়। আর জেলার ক্ষেত্রে ঢাকা ও চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা উন্নত। ময়মনসিংহ ঢাকার কাছে হওয়ায় ওই জেলারও বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ঢাকায় পড়ে। আবার এই তিন জেলায় লোকসংখ্যাও বেশি। যেহেতু জনসংখ্যার অনুপাতে কোটা হয়, সে জন্য এই জেলাগুলো স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে যায়। আর বিসিএসে কেন জানি মেয়েদের অংশগ্রহণ কম। অথচ তারা একাডেমিক পরীক্ষায় ভালো করে। যেহেতু শেষ পর্যন্ত মেয়েরা কম অংশ নেয়, চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণও হয় কম।’
সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) সূত্র জানায়, ৪৩তম বিসিএসের ফল প্রকাশ হয় ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি। ওই বিসিএসে ক্যাডার পদে মোট দুই হাজার ১৬৩ জন প্রার্থীকে সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে পুরুষ এক হাজার ৭৪২ জন, আর নারী মাত্র ৪২১ জন। সেরা ১০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবেচেয়ে বেশি ৬৬০ জন সুযোগ পেয়েছেন। এরপর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ থেকে ১৯৩ জন, বুয়েট থেকে ১৭৩ জন, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৯৪ জন, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৯১ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৮৭ জন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৮০ জন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭২ জন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৫ জন এবং রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬২ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন।
৪৩তম বিসিএসে ময়মনসিংহ জেলা থেকে সবচেয়ে বেশি ১০৪ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। এরপর চট্টগ্রাম থেকে ৯৮ জন, ঢাকা থেকে ৮২ জন, কুমিল্লার ৭৬ জন, বগুড়ার ৬৮ জন, দিনাজপুরের ৬২ জন, টাঙ্গাইলের ৬২ জন, যশোরের ৬১ জন, রাজশাহীর ৫৯ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ৫৬ জন, সিরাজগঞ্জের ৫৪ জন, নরসিংদীর ৫১ জন, সাতক্ষীরার ৫১ জন, রংপুরের ৫১ জন সুযোগ পেয়েছেন। বিভাগ হিসেবে সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগ থেকে ৫০ জন সুযোগ পেয়েছেন। ঢাকা বিভাগ থেকে ৪৭১ জন, রাজশাহী বিভাগ থেকে ৩২১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে ৩৬৯ জন, খুলনা বিভাগ থেকে ২৯৩ জন, বরিশাল বিভাগ থেকে ১৪৯ জন, রংপুর বিভাগ থেকে ২৯৩ জন ও ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে ২১৭ জন সুযোগ পেয়েছেন।
আবার ৪১তম বিসিএসের ফল প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর। ওই বিসিএসে দুই হাজার ৫১৬ জনকে সুপারিশ করে পিএসসি। এর মধ্যে এক হাজার ৮৪৪ জন পুরুষ ও ৬৭২ জন নারী। ওই বিসিএসের তথ্য বিশ্লেষণেও দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবচেয়ে বেশি ৭৪৪ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ থেকে ২৫৪ জন এবং বুয়েট থেকে ১৫৪ জন সুযোগ পেয়েছেন। এরপর সেরা ১০-এর মধ্যে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হচ্ছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১৩ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১০ জন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৪ জন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৮ জন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৮ জন, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭১ জন এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন।
৪১তম বিসিএসে সবচেয়ে বেশি ১৩৪ জন সুযোগ পেয়েছেন চট্টগ্রাম জেলার শিক্ষার্থীরা। এরপর ময়মনসিংহ জেলা থেকে ১১৮ জন আর ঢাকা জেলা থেকে ১০০ জন শিক্ষার্থী সুযোগ পান। অন্যান্য জেলার মধ্যে কুমিল্লার ৮৯, রাজশাহীর ৮৩, টাঙ্গাইলের ৭৫, রংপুরের ৭৩, সিরাজগঞ্জের ৬৫, বগুড়ার ৬৪, চাঁদপুরের ৫৯, পাবনার ৫৮, ঝিনাইদহের ৫৭, বরিশালের ৫৬, সাতক্ষীরার ৫৪, খুলনার ৫২, দিনাজপুরের ৫২, কিশোরগঞ্জের ৫১ ও নেত্রোকোনা জেলার ৫১ জন শিক্ষার্থী সুযোগ পেয়েছেন। ওই বিসিএসেও বিভাগ হিসেবে সিলেট বিভাগ থেকে সবচেয়ে কম ৮৯ জন সুযোগ পেয়েছেন। ঢাকা বিভাগ থেকে ৫২৩, রাজশাহী বিভাগ থেকে ৩৭৪, চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে ৪৬২, খুলনা বিভাগ থেকে ৩৭২, বরিশাল বিভাগ থেকে ১৩০, রংপুর বিভাগ থেকে ৪১৬ ও ময়মনসিংহ বিভাগ থেকে ২৩৯ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন।
৪৩তম বিসিএসে দেখা যায়, উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে ৮০.৫৪ শতাংশ পুরুষ ও ১৯.৪৬ শতাংশ নারী। আর ৪১তম বিসিএসে প্রার্থীদের মধ্যে ৭৩.২৯ শতাংশ পুরুষ ও ২৬.৭১ শতাংশ নারী।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪৭ লাখ ৫৬ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ২৫ লাখ ৪২ হাজার, নারী ২২ লাখ ১৪ হাজার। অর্থাৎ মোট শিক্ষার্থীর ৪৮ শতাংশ নারী। দেশের বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে ফলাফলে শীর্ষ অবস্থান দখল করছেন নারী শিক্ষার্থীরা। একইভাবে গত বেশ কয়েক বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলেও দেখা যায়, পাসের হার ও জিপিএ ৫ প্রাপ্তিতে মেয়েরা এগিয়ে।
তবে বিসিএসগুলোর ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বেশি এগোচ্ছে। কিন্তু প্রকৌশলে ডিগ্রিপ্রাপ্ত এসব শিক্ষার্থীর প্রকৌশলসংক্রান্ত পদ খুব সীমিত। তারা প্রকৌশলের চেয়ে প্রশাসন ক্যাডার ও পররাষ্ট্র ক্যাডার বেশি পছন্দ করছেন। এমনকি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরাও কৃষিসংক্রান্ত পেশায় না থেকে অন্য ক্যাডার পছন্দ করছেন। বিসিএসে এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
৪১তম বিসিএসে উত্তীর্ণদের মধ্যে মানবিক বিভাগের প্রার্থী ২৩.৩৭ শতাংশ, বিজ্ঞান বিভাগের ৩৬.২১ শতাংশ, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের প্রার্থী ৮.৯৮, প্রকৌশল বিভাগের ১৬.৯৩, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ১১.৮০ এবং অন্যান্য ২.৭০ শতাংশ সুযোগ পেয়েছেন। প্রার্থীদের মধ্যে ২৩ থেকে ২৭ বছরের শিক্ষার্থীরা বেশি উত্তীর্ণ হন। ওই দুই বিসিএসে ২৩ থেকে ২৫ বছরের শিক্ষার্থী ৩৯.৯০ শতাংশ ও ২৫ থেকে ২৭ বছরের ২৭.৯৪ শতাংশ উত্তীর্ণ হয়েছেন।
৪৩তম বিসিএসে মানবিক বিভাগের ২৩.৯০ শতাংশ, বিজ্ঞানের ৩৮.১৪, ব্যবসায় শিক্ষার ৮.১৮ শতাংশ, প্রকৌশল বিভাগের ২৩.৭, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ৪.৬২ ও অন্যান্য বিভাগের ২.৮ শতাংশ শিক্ষার্থী সুযোগ পেয়েছেন। ওই বিসিএসেও প্রাধান্য রয়েছে ২৩ থেকে ২৭ বছর বয়সীদের। ২৩ থেকে ২৫ বছরের শিক্ষার্থী ৩৭.৬৮ এবং ২৫ থেকে ২৭ বছরের ৩২.২৭ শতাংশ উত্তীর্ণ হয়েছেন।